ETV Bharat / state

জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতিতে ত্রুটি! জাপানে নিষিদ্ধ ভারতের আম, হতাশ মালদার চাষিরা

ভেপার হিট ট্রিটমেন্টে জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতিতে ত্রুটি থাকার অভিযোগ ৷ নিষেধাজ্ঞা নয়, ত্রুটিমুক্ত করার পরামর্শ বলে দাবি রফতানি সংগঠনের ৷

Malda Mangos
ভেপার হিট ট্রিটমেন্টে জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতিতে ত্রুটি থাকার অভিযোগে জাপানে নিষিদ্ধ ভারতের আম ৷ (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : June 1, 2026 at 6:44 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

মালদা, 1 জুন: চলতি মরশুমে জাপানে যাচ্ছে না ভারতে উৎপাদিত আম ৷ দীর্ঘ দু’দশক পর প্রযুক্তিগত ত্রুটির জেরে ভারতের আম আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে প্রথম সূর্যের দেশ ৷ জানা যাচ্ছে, কিছুদিন আগে জাপানের একটি প্রতিনিধিদল উত্তরপ্রদেশের রেহমানপুরে আমের কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে ৷ সেখানকার ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট পদ্ধতি তাঁরা খতিয়ে দেখেন ৷ সেখানেই আমের জীবাণুমুক্তকরণ বা ফিউমিগেশন পদ্ধতিতে তাঁরা কিছু ত্রুটি খুঁজে পান বলে অভিযোগ ৷

এরপরেই জাপানের ইয়াকোহামা প্ল্যান্ট প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন সিদ্ধান্ত নেয়, ভারতের দেওয়া পরিদর্শন শংসাপত্রে থাকা আম ওই দেশে আমদানি করা যাবে না ৷ জাপানের এই সিদ্ধান্তে নিশ্চিতভাবেই ক্ষতির মুখে পড়তে চলেছেন ভারতীয় আম উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা ৷ যদিও, ব্যবসায়ীদের তরফে দাবি করা হয়েছে, ব্যান নয়, জাপান সরকার কয়েকটি ক্ষেত্রে ত্রুটিমুক্ত পরিশোধন করার পরামর্শ দিয়েছে ৷ পরবর্তীতে সমস্ত ত্রুটি সংশোধন করে সে’দেশে আবার ভারতীয় আম রফতানি করা যাবে ৷

Malda Mango
ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট পদ্ধতিতে ত্রুটি থাকায় ভারতের আম আমদানি বন্ধ করল জাপান ৷ (নিজস্ব ছবি)

তবে, এবারই প্রথম নয়, 20 বছর আগে ফলের মাছি সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে ভারতীয় আম আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল জাপান ৷ পরবর্তীতে ভারত আমের পরিশোধন পদ্ধতি উন্নত করে ৷ তারপর 2006 সাল থেকে আবারও প্রথম সূর্যদয়ের দেশে ভারতীয় আম রফতানি শুরু হয়েছিল ৷ আশা করা হচ্ছে, এবারও তেমনটাই হবে ৷

ভারতে উৎপাদিত আমের মধ্যে মূলত আলফানসো, ল্যাংড়া, কেশর ও বাঙ্গানাপল্লি প্রজাতির আম জাপানে রফতানি করা হতো ৷ জাপানিদের মধ্যে এই চার প্রজাতির আমের চাহিদাও বেশ ভালো ৷ রফতানিকারকরা ভেবেছিলেন, চলতি মরশুম থেকে তাঁরা আরও কয়েকটি প্রজাতির আম জাপানের বাজারে উপস্থিত করবেন ৷ কিন্তু, বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতীয় ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট পদ্ধতি ৷

Malda Mango
ভারতের আমের জীবাণুমুক্তকরণ বা ফিউমিগেশন পদ্ধতিতে ত্রুটি থাকার অভিযোগ ৷ (নিজস্ব ছবি)

কী এই ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট পদ্ধতি ?

এই পদ্ধতিতে কোনও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না ৷ শুধুমাত্র গরম ও আর্দ্র বাতাসের মাধ্যমে আমের ভিতরে থাকা কোনও পোকা কিংবা লার্ভাকে সম্পূর্ণ নষ্ট করা হয় ৷ বিশেষ ধরনের গ্যাস ব্যবহার করে কোনও নির্দিষ্ট একটি জায়গায় ধোঁয়া তৈরি করা হয় ৷ সেই ধোঁয়ার মধ্যে আমকে 12 থেকে 48 ঘণ্টা পর্যন্ত রাখা হয় ৷ এই পদ্ধতিতে আমের কোনও ক্ষতি হয় না ৷ তার স্বাদও অপরিবর্তিত থাকে ৷ শুধুমাত্র ফ্রুট ফ্লাই, লার্ভা, ব্যাকটেরিয়া প্রভৃতি মেরে ফেলা হয় ৷

গোটা প্রক্রিয়াটি ফিউমিগেশন নামে পরিচিত ৷ কোনও কারণে এসব পোকামাকড় কোনও দেশে চলে গেলে, সেখানকার চাষ এবং পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে ৷ তাই জাপান সরকার যে কোনও ফল আমদানির ক্ষেত্রে এই ফিউমিগেশন নিয়ে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিয়ে থাকে ৷

Malda Mango
ক্ষতির আশঙ্কায় মালদার আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা ৷ (নিজস্ব ছবি)

মালদা ম্যাঙ্গো অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তথা ওয়েস্ট বেঙ্গল এক্সপোর্টার্স কো-অর্ডিনেশন কমিটির রাজ্য সম্পাদক উজ্জ্বল সাহা বলেন, "জাপান সরকারের এই নিষেধাজ্ঞায় নিশ্চিতভাবেই ভারতীয় আমচাষি ও রফতানিকারকদের ক্ষতি হল ৷ জাপান ভারতের সবচেয়ে বড় আমের বাজার না-হলেও, সে’দেশে আমের দাম ভালো পাওয়া যায় ৷ প্রতি কেজিতে অন্তত 350 টাকা দাম মেলে ৷ প্রতি বছর 50 থেকে 60 মেট্রিক টন আম সে’দেশে রফতানি করা হতো ৷ এতেই ক্ষতির পরিমাণটা বোঝা যায় ৷"

জাপানের বাজার ও নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি বলেন, "গত বছরই প্রথম মালদা থেকে ল্যাংড়া প্রজাতির অল্প আম জাপানে গিয়েছিল ৷ আমরা সেখানকার বাজার ধরার চেষ্টা শুরু করেছিলাম ৷ শুরুতেই সেই প্রয়াস মাঠে মারা গেল ৷ তবে, ভারতীয় আম আমদানিতে যে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হচ্ছে, তা পুরো সঠিক নয় ৷ জাপান আমাদের দেশকে কালো তালিকাভুক্ত করেনি ৷ শুধুমাত্র সতর্ক করেছে ৷ জাপান সরকারের সতর্কবার্তা পেয়েই অ্যাপেডা ও কোয়ারান্টিন বিভাগ যৌথভাবে কাজে নেমে পড়েছে ৷ যাতে অদূর ভবিষ্যতে জাপান সরকারের যাবতীয় শর্ত পূরণ করে সে’দেশে ভারতে উৎপাদিত আম রফতানি করা যেতে পারে ৷"

মালদার আমচাষি উত্তম চৌধুরী জাপান সরকারের এহেন কঠোর সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন ৷ তিনি বলেন, "জাপানের এই সিদ্ধান্ত অন্য দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়লে, চলতি মরশুমে মালদার আম রফতানিতে বড়সড় আঘাত আসতে চলেছে ৷ ইতিমধ্যে ইউরোপের কিছু দেশ থেকে এই জেলার আমের বরাত এসেছে ৷ শুনেছি, এবার আমেরিকাও মালদার আম কিনতে উৎসাহ দেখিয়েছে ৷ আমরা এখন শুধু দেশের বিভিন্ন রাজ্যে নয়, বিদেশের বাজারের দিকেও তাকিয়ে থাকি ৷ আশা করি, ভারত সরকার ত্রুটিমুক্ত ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট পদ্ধতি চালু করতে যাবতীয় পদক্ষেপ করবে ৷ মালদা জেলাতেও ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট পরিকাঠামো প্রয়োজন ৷ তাহলে এই জেলার আম সরাসরি বিদেশে পাঠানো যাবে ৷ বর্তমানে মুম্বই বা অন্য কোনও রাজ্যে সেই কাজ করতে হয় ৷"

আরেক আমচাষি বিমান মণ্ডলের কথায়, "দেশের বিভিন্ন রাজ্য-সহ বিদেশে জেলার আম রফতানি করতে, আমরা আম চাষের পুরনো পদ্ধতি ছেড়ে আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছি ৷ ফ্রুট ফ্লাই কিংবা ব্যাকটেরিয়া রোধে এখন ফ্রুট ব্যাগ চালু হয়েছে ৷ এতে চাষের খরচ বাড়লেও, আমরা জেলার আম চাষের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে কাজ করছি ৷ কিন্তু, রফতানি করার আগে আম জীবাণুমুক্ত করার পরিকাঠামো তৈরির বিষয়টি পুরোপুরি সরকার নিয়ন্ত্রিত ৷ আশা করি, উদ্ভুত সমস্যার সমাধান দ্রুত হয়ে যাবে ৷ দেশের আম আবার জাপানের বাজারে জায়গা পাবে ৷"