সোমবার গঙ্গাসাগরে মুখ্যমন্ত্রী, 1200 সিসি ক্যামেরায় রিয়েল টাইম নিরাপত্তার ব্যবস্থা মেলায়
মুড়িগঙ্গা নদীর উপর 1700 কোটি টাকা ব্যায়ে তৈরি হবে সেতু৷ সোমবার সেই সেতুর শিলান্যাস করবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷

Published : January 4, 2026 at 9:01 PM IST
সাগর (দক্ষিণ 24 পরগনা), 4 জানুয়ারি: মকর সংক্রান্তির পূণ্যস্নানকে কেন্দ্র করে সাজ সাজ রব গঙ্গাসাগরে। মেলা চলবে 8 জানুয়ারি থেকে 17 জানুয়ারি পর্যন্ত৷ পুণ্যস্নানের যোগ থাকছে 14 জানুয়ারি দুপুর 1টা 14 মিনিট থেকে 15 জানুয়ারি ওই একই সময় পর্যন্ত।
লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগম হবে৷ ভিনরাজ্য থেকে আসবেন পর্যটক এবং নাগা সন্ন্যাসীরা৷ ভিড় সামলাতেই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত দক্ষিণ 24 পরগনা জেলা প্রশাসনের আধিকারিকরা৷ সেই প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে আগামিকাল, সোমবার সাগরে আসছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷

মুখ্যমন্ত্রীর গঙ্গাসাগর সফর
সোমবার বিকেলেই গঙ্গাসাগরে পৌঁছনোর কথা মুখ্যমন্ত্রীর৷ এবারের সফরে তিনি মুড়িগঙ্গা সেতুর শিলান্যাস করবেন৷ সোমবার দুপুরে হেলিকপ্টারে করে সাগরে পৌঁছবেন মুখ্যমন্ত্রী। হেলিপ্যাড সংলগ্ন ময়দানেই আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দেবেন।
সেতুর শিলান্যাস ছাড়াও সাগর ও সংলগ্ন এলাকার উন্নয়নের জন্য একাধিক প্রকল্পের উদ্বোধন ও উপভোক্তাদের মধ্যে সরকারি পরিষেবা প্রদানের কর্মসূচিও রয়েছে তাঁর। সেই কর্মসূচির পর মুখ্যমন্ত্রী ভারত সেবাশ্রম সংঘে যেতে পারেন ও কপিল মুনি মন্দিরে পুজো দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। মঙ্গলবার, 6 জানুয়ারি তাঁর কলকাতায় ফেরার কথা।
গঙ্গাসাগর মেলার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা
রাজ্য প্রশাসনের কাছে গঙ্গাসাগর মেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা প্রতি বছরই এক বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবার প্রযুক্তির ব্যবহার কার্যত নজিরবিহীন। মেলা চত্বরে তৈরি করা হয়েছে একটি বিশাল সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম। এখান থেকেই লট নম্বর 8, কচুবেড়িয়া, ভেসেলের গতিপথ, বাস স্ট্যান্ড এবং মন্দির চত্বরের প্রতিটি কোণ মনিটর করা হচ্ছে।

মেলা প্রাঙ্গণ ও তার আশেপাশের এলাকায় মোট 1200টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। কন্ট্রোল রুমের বিশাল এলইডি স্ক্রিনে প্রতিটি ক্যামেরার ফুটেজ রিয়েল টাইমে ফুটে উঠছে। কোথাও ভিড় জমছে কি না, বা কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে কি না, তা মুহূর্তের মধ্যে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে এই কন্ট্রোল রুম থেকে।

শুধু স্থলপথ নয়, জলপথেও নজরদারির ব্যবস্থা এবার অত্যন্ত কড়া। মুড়িগঙ্গা নদীতে ভেসেল চলাচলের ওপর নজর রাখতে জিপিএস বা জিপিআরএস (GPRS) প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। কুয়াশার কারণে অনেক সময় ভেসেল দিকভ্রষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেই ঝুঁকি এড়াতে এবং কোন ভেসেল কোথায় আছে, তা জানতে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কন্ট্রোল রুম থেকেই দেখা যাচ্ছে জেটিতে কতগুলি ভেসেল দাঁড়িয়ে আছে বা মাঝনদীতে কতগুলি চলছে। মোট 21টিরও বেশি জেটি এবং ভেসেল ঘাটের ওপর সর্বক্ষণ নজর রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি আকাশপথে নজরদারির জন্য ড্রোনের ব্যবহারও করা হচ্ছে। ভিড়ের চরিত্র বুঝতে এবং দুর্গম এলাকায় নজর রাখতে এই ড্রোনগুলি বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।

প্রযুক্তিগত নজরদারির পাশাপাশি মেলায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুণ্যার্থীদের সুরক্ষায় কোনও খামতি রাখতে চাইছে না নবান্ন। মেলা চত্বরে মোতায়েন করা হচ্ছে প্রায় 15 হাজার পুলিশ কর্মী। এর পাশাপাশি বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, এনডিআরএফ এবং সিভিল ডিফেন্সের স্বেচ্ছাসেবকরাও প্রস্তুত রয়েছেন। সমুদ্রতটে স্নান করতে নেমে যাতে কোনও পুণ্যার্থী দুর্ঘটনার কবলে না-পড়েন, তার জন্য স্পিড বোট ও ডুবুরিদের সর্বক্ষণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও এবার বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মেলার দিনগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়, তাই যে কোনও আপতকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে পাঁচটি অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছে মেলা চত্বরে। এছাড়া কাকদ্বীপ ও সাগরের হাসপাতাল মিলিয়ে প্রায় সাড়ে শয্যা এবং অতিরিক্ত 200টি বেডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ পুণ্যার্থীদের দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজনে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে মুমূর্ষু রোগীকে তৎক্ষণাৎ বড় হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা যায়।

মুড়িগঙ্গা নদীর ওপর স্থায়ী সেতু
অবশেষে বাস্তবায়িত হতে চলেছে সাগরদ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। প্রশাসন সূত্রে খবর, মুড়িগঙ্গা নদীর ওপর 4 লেনের স্থায়ী সেতু নির্মাণের শিলান্যাস করবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের পূর্ত দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, কাকদ্বীপের লট-8 এবং সাগরদ্বীপের কচুবেড়িয়ার মধ্যে সংযোগকারী এই সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় চার কিলোমিটার (অ্যাপ্রোচ রোড মিলিয়ে প্রায় 5 কিলোমিটার)। প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় 1700 কোটি টাকা।

শুরুতে এই বাজেট 1000-1200 কোটি টাকার মধ্যে থাকলেও, সময়ের সঙ্গে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, নির্মাণ কাজ শেষ হতে আনুমানিক চার বছর সময় লাগতে পারে। যদিও সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী দ্রুততম সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ আগামী দু’বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার আশাপ্রকাশ করেছেন।

সাগরদ্বীপের 43টি গ্রামের প্রায় দু’লক্ষ মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ভেসেল পরিষেবা৷ যা জোয়ার-ভাঁটার ওপর নির্ভরশীল৷ ফলে ভাঁটার সময় বা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় মূল ভূখণ্ড থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন দ্বীপবাসী। সেতুটি নির্মিত হলে এই অনিশ্চয়তা দূর হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটনে গতি আসবে।

