আমিই প্রকৃত সেকুলার! দুর্গা অঙ্গনের শিলান্যাসে বিরোধীদের তোষণ-বাণের জবাব মমতার
ইউনেস্কোর হেরিটেজ সম্মানকে চিরস্থায়ী করতে নিউটাউনে বিশ্বের বৃহত্তম 'দুর্গা অঙ্গন'-এর শিলান্যাস করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷

Published : December 29, 2025 at 6:55 PM IST
কলকাতা, 29 ডিসেম্বর: তিনিই প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ ৷ সোমবার এমনটাই দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ আর তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য তিনি বেছে নিলেন নিউটাউনে 'দুর্গা অঙ্গন'-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুষ্ঠানকে ৷ এদিন ফের রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মমতা বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হল সর্বধর্ম সমন্বয় ৷
এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানান, এমন কোনও ধর্ম নেই যার অনুষ্ঠানে তিনি যান না । তাঁর প্রশ্ন, তিনি গুরুদ্বারে গেলে মাথা ঢেকে প্রবেশ করেন ৷ তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না ৷ তবে রোজার অনুষ্ঠানে গেলে কেন আপত্তি তোলা হয় ! এদিন দুর্গাঙ্গনের শিলান্যাসেও তিনি কাঁধ ও মাথা চাদর দিয়ে ঢেকেই অংশগ্রহণ করেন, যা তিনি হিন্দু সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবেই তুলে ধরেন । তাঁর কথায়, "অনেকে বলে আমি তোষণ করি, আমি তোষণ করি না ৷ কিন্তু আমিই প্রকৃত সেকুলার ৷ আমি সেকুলার সঠিক অর্থে । অর্থাৎ সর্বধর্ম সমন্বয় ।"

হিন্দু তীর্থক্ষেত্রের উন্নয়নের খতিয়ান
নিজেকে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করার পাশাপাশি, তাঁর সরকার হিন্দু তীর্থক্ষেত্রগুলির উন্নয়নে কী কাজ করেছে, তার দীর্ঘ খতিয়ানও এদিন পেশ করেন মুখ্যমন্ত্রী । তিনি বলেন, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের উন্নয়নের জন্য তাঁর সরকার 100 কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে এবং স্কাইওয়াক তৈরি করেছে । একইভাবে কালীঘাট মন্দিরকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে 130 কোটি টাকা খরচ করে স্কাইওয়াক-সহ পুরো এলাকার ভোলবদল করা হয়েছে । তাঁর সরকারের উদ্যোগেই তারকেশ্বর, কঙ্কালীতলা, ফুল্লরা, বক্রেশ্বর, পাথরচাপড়ি এবং ফুরফুরা শরিফের মতো তীর্থস্থানগুলির জন্য আলাদা উন্নয়ন পর্ষদ বা ডেভলপমেন্ট বোর্ড গঠন করা হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী ।
মমতার বক্তব্যে মহাকাল মন্দির, গঙ্গাসাগর
এদিন মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য এক সুখবর দেন । তিনি জানান, আগামী জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে উত্তরবঙ্গে মহাকাল মন্দিরের শিলান্যাস করা হবে । এর জন্য জমি দেখা এবং প্রস্তুত করার কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে । গঙ্গাসাগর মেলা নিয়ে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে ৷ তিনি জানান, কুম্ভমেলায় রেল ও বিমান যোগাযোগ থাকলেও গঙ্গাসাগরে জলপথ পেরিয়ে যেতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য । বারবার আবেদন সত্ত্বেও কেন্দ্র সেতু তৈরি করে দেয়নি । তাই রাজ্য সরকার একাই 1,700 কোটি টাকা খরচ করে মুড়িগঙ্গায় সেতু নির্মাণ করছে, যার শিলান্যাস আগামী 5 জানুয়ারি হবে ।
মনীষীদের হেরিটেজ রক্ষায় অবদানের উল্লেখ
বাংলার মনীষীদের হেরিটেজ রক্ষায় তাঁর সরকারের ভূমিকার কথাও এদিন তুলে ধরেন মমতা । তিনি জানান, সিমলা স্ট্রিটে স্বামী বিবেকানন্দের পৈত্রিক বাড়িটি যখন প্রোমোটিং হয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি জানতে পেরে রাতারাতি তা অধিগ্রহণ করেন এবং রামকৃষ্ণ মিশনের হাতে তুলে দেন । একইভাবে দার্জিলিং এবং বাগবাজারে ভগিনী নিবেদিতার বাড়ি জবরদখলমুক্ত করে তা সংস্কার করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন । বাগবাজারে মায়ের বাড়ি সংলগ্ন এলাকায় বস্তিবাসীদের জন্য ‘বাংলার বাড়ি’ তৈরি করে দিয়ে সেই স্থানটিও দর্শনার্থীদের যাতায়াতের উপযোগী করে তোলা হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী ।
'দুর্গা অঙ্গন'-এর খুঁটিনাটি
দুর্গা অঙ্গন তৈরির প্রসঙ্গে তিনি জানান, এই প্রকল্পের জন্য ইতিমধ্যেই প্রচুর অনুদান জমা পড়েছে । তবে পরিকাঠামো, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং গাড়ি পার্কিং-সহ আনুষঙ্গিক ব্যবস্থার জন্য প্রায় 1,200 থেকে 1,300 কোটি টাকার প্রয়োজন হবে । মমতা বলেন, পর্যটন এবং তীর্থক্ষেত্রগুলির উন্নয়ন কেবল ধর্মীয় বিষয় নয়, এর সঙ্গে অর্থনীতির গভীর যোগ রয়েছে । দিঘায় রেললাইন চালু হওয়ার পর যেমন শত শত হোটেল তৈরি হয়েছে, তেমনই এই ধর্মীয় স্থানগুলিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে ।
সোমবার ইউনেস্কোর আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (Intangible Cultural Heritage) স্বীকৃতি পাওয়া বাংলার দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক স্তরে আরও মহিমান্বিত করতে নিউটাউনে 'দুর্গা অঙ্গন'-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । অ্যাকশন এরিয়া 1এ-তে প্রায় 17.28 একর জমির ওপর গড়ে উঠতে চলা এই প্রকল্পটি কেবল একটি স্থাপত্য নয়, বরং বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির এক স্থায়ী ঠিকানা হতে চলেছে বলে দাবি রাজ্যের । এদিনের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই প্রকল্প নিছক কোনও মন্দির তৈরি নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলার মর্যাদাকে চিরস্থায়ী করার এক সুপরিকল্পিত উদ্যোগ ।
প্রকল্পটির বিশালতা এবং স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে এদিন বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয় । মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রথমে 12 একর জমিতে এটি করার কথা ভাবা হলেও, পরবর্তীতে প্রকল্পের গুরুত্ব বুঝে জমির পরিমাণ বাড়িয়ে 17.28 একর করা হয়েছে । মূল মন্দির চত্বরটি প্রায় 2 লক্ষ বর্গফুট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হবে । মন্দিরের গর্ভগৃহের উচ্চতা হবে 54 মিটার । শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনেই সেখানে 108টি দেবদেবীর মূর্তি এবং 64টি সিংহ মূর্তি স্থাপন করা হবে ।
মূল মণ্ডপ ছাড়াও শিব, গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর জন্য আলাদা মণ্ডপ থাকবে । দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে 1008টি স্তম্ভ এবং সুসজ্জিত খিলান দিয়ে তৈরি হচ্ছে 20 ফুট চওড়া প্রদক্ষিণ পথ । পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই প্রকল্পটি ‘গোল্ড সার্টিফায়েড গ্রিন বিল্ডিং’ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে । চত্বরে প্রায় 1300টি গাছ লাগানো হবে এবং মাত্র 20 শতাংশ জায়গায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করা হবে, বাকি অংশ থাকবে প্রকৃতির খোলা হাওয়ায় । প্রতিদিন প্রায় 1 লক্ষ দর্শনার্থীর সমাগম সামলানোর ক্ষমতা থাকবে এই প্রাঙ্গণের ।
কেন 'দুর্গা অঙ্গন' প্রতিষ্ঠা
রাজ্যের প্রতিটি পাড়ায়, অলিতে-গলিতে ধুমধাম করে দুর্গাপুজো হওয়া সত্ত্বেও কেন সরকারি উদ্যোগে পৃথকভাবে এই 'দুর্গা অঙ্গন' তৈরি করা হচ্ছে, তার সপক্ষে জোরালো যুক্তি পেশ করেন মুখ্যমন্ত্রী । তাঁর ব্যাখ্যায় উঠে আসে উৎসবের ক্ষণস্থায়ী রূপ বনাম ঐতিহ্যের চিরস্থায়ী সংরক্ষণের প্রসঙ্গ । তিনি বলেন, পাড়া বা ক্লাবের পুজো নির্দিষ্ট কয়েকদিনের উৎসব । কিন্তু ইউনেস্কো যে বিরল সম্মান বাংলাকে দিয়েছে, তাকে কেবল বছরের পাঁচটা দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না ।
সেই সম্মানকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এবং বিশ্ববাসীর জন্য সংরক্ষিত রাখতেই এই স্থায়ী কাঠামোর প্রয়োজন ছিল । এই ‘দুর্গা অঙ্গন’ এমন একটি পরিসর হবে যেখানে বছরের 365 দিনই দেশ-বিদেশের মানুষ এসে বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসবের আমেজ অনুভব করতে পারবেন । এটি হবে বাংলার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মিলনস্থল, যা পর্যটকদের কাছে বাংলার বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের বার্তা পৌঁছে দেবে ।
'দুর্গা অঙ্গন'-এর শিলান্যাসে সর্বধর্ম সমন্বয়
এদিনের শিলান্যাস মঞ্চে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে এই কর্মযজ্ঞে আশীর্বাদ প্রদান করেন । মুখ্যমন্ত্রী এদিন ফের বলেন, “ধর্ম যার যার, উৎসব কিন্তু সবার।” তিনি জানান, এই প্রকল্প কেবল ধর্মীয় ভাবাবেগ নয়, রাজ্যের অর্থনৈতিক বুনিয়াদকেও শক্তিশালী করবে ।
তিনি বলেন, নিউটাউন, রাজারহাট, সল্টলেক এবং বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকে এটি সুবিধাজনক । ফলে পর্যটন শিল্পে জোয়ার আসবে । স্থানীয় হস্তশিল্প, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং বাংলার কারিগররা এখানে তাঁদের তৈরি সামগ্রী বিক্রির সুযোগ পাবেন, যা ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি করবে । মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে গঠিত একটি ট্রাস্টি বোর্ড এই প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ করবে । মুখ্যমন্ত্রী এদিন ঘোষণা করেন, নকশা ও পরিকল্পনা চূড়ান্ত, তাই আজ থেকেই শুরু হয়ে যাচ্ছে এই মহৎ কর্মযজ্ঞের নির্মাণকাজ ।

