আইপ্যাক কর্ণধারের বাড়িতে ও অফিসে ইডি হানা, ডিজি-সিপিকে নিয়ে পৌঁছে গেলেন মমতা
কয়লাপাচার মামলার সূত্রে আইপ্যাকের সল্টলেকের দফতরে ইডি হানা ৷ প্রতীক জৈনের বাড়িতেও তল্লাশি ৷

Published : January 8, 2026 at 12:40 PM IST
কলকাতা, 8 জানুয়ারি: রাজ্যের শাসকদলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক-এর কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাসভবনে ইডি হানা ৷ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তল্লাশি শুরু হতেই সেখানে পৌঁছে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ৷ তাঁর সঙ্গে ছিলেন নগরপাল মনোজ ভার্মা ৷ সেখান থেকে একটি সবুজ ফাইলে কিছু নথি নিয়ে বেরনোর পর মুখ্যমন্ত্রী পৌঁছে যান আইপ্যাকের সল্টলেকের অফিসে ৷ সেখানে যান ডিজি রাজীব কুমারও ৷ সেখান থেকেও কিছু ফাইল এনে মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িতে তোলা হয়েছে বলে খবর ৷
এই হানায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মমতার প্রশ্ন, "আমরা যদি বিজেপির অফিসে তল্লাশি চালাই, তাহলে ওরা কী করবে ?" তিনি আরও বলেন, "এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে ইডি তৃণমূল কংগ্রেসের আইটি প্রধানের বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে । রাজনৈতিক দলগুলোর আইটি প্রধানদের বাড়িতে অভিযান চালানো কি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজ ?"

এদিন ভোরে আইপ্যাক-এর সল্টলেক সেক্টর ফাইভের দফতরেও হানা দেয় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে খবর, দিল্লিতে নথিভুক্ত কয়লাপাচার সংক্রান্ত একটি পুরনো মামলার সূত্র ধরেই এই অভিযান । অভিযানের জন্য দিল্লি থেকে বিশেষ ইডি টিম আনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে । ইডি সূত্রের দাবি, ওই কয়লাপাচার মামলায় একাধিক আর্থিক লেনদেনের সূত্রে আইপ্যাকের নাম উঠে এসেছে । একই মামলার সূত্র ধরে বড়বাজারের পোস্তা এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়েছে ।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সেক্টর ফাইভের একটি বহুতলের 12 তলায় অবস্থিত আইপ্যাকের দফতরে এদিন অভিযান শুরু হয় । ভোরের দিকে অভিযান হওয়ায় দফতরে তখন মূলত নাইট ডিউটিতে থাকা কয়েকজন কর্মীই উপস্থিত ছিলেন । তাঁদের সামনেই তল্লাশি শুরু হয় । পরে ওই তলাটি ‘সিল’ করে দেয় কেন্দ্রীয় বাহিনী । ফলে আপাতত দফতরে ঢোকা বা বেরোনো বন্ধ রয়েছে ।
অভিযানের খবরে আইপ্যাকের অন্দরেও তৎপরতা বাড়ে । বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সংস্থার শীর্ষ আধিকারিকেরা নিজেদের বাড়ি থেকে ‘জ়ুম কল’-এ বৈঠক করেন । জেলায় জেলায় থাকা আইপ্যাকের সদস্যদের সঙ্গেও অনলাইন বৈঠক হয় বলে জানা গিয়েছে । এরপর মুখ্যমন্ত্রী প্রতীক জৈনের বাসভবনে পৌঁছে গিয়ে সেখান থেকে একটি সবুজ ফাইলে বিভিন্ন নথি ও হার্ড ডিস্ক নিয়ে বেরিয়ে আসেন ৷ সেখান থেকে তিনি চলে যান আইপ্যাকের সল্টলেকের দফতরে ৷ তল্লাশির মাঝেই সেখান থেকেও বেশকিছু ফাইল নিয়ে এসে রাখা হয় মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িতে ৷
রাজ্য সরকারের ঘনিষ্ঠ এই পরামর্শদাতা সংস্থার দফতরে ইডি হানার খবরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে । জরুরি ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিক বৈঠক ডেকেছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম । মনে করা হচ্ছে, এই অভিযানের রাজনৈতিক দিক নিয়েই তিনি বক্তব্য রাখবেন ।
শাসক শিবিরেও শুরু হয়েছে জল্পনা । প্রশাসনের অন্দরমহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে । আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈন রাজ্য রাজনীতি ও প্রশাসনে প্রভাবশালী হিসেবেই পরিচিত । একাধিক বার তিনি নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন । বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের রূপায়ণ ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে শাসকদল ও সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করে আইপ্যাক । শাসকদলের শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতরের সঙ্গেও সংস্থাটির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের দাবি ।
এমনকি বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়াতেও আইপ্যাকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বহুবার অভিযোগ উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ইডি-র অভিযান নিছক আর্থিক তদন্তের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক ভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা ।
এই মুহূর্তে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট প্রচারে মালদহে রয়েছেন । বৃহস্পতিবার সেখানেই তাঁর কর্মসূচি রয়েছে । ইডি অভিযানের বিষয়ে তিনি বা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনও প্রতিক্রিয়া দেন কি না, সে দিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল ।
উল্লেখ্য, সাধারণত অভিষেক প্রচার শেষে রাতে কলকাতায় ফিরে এলেও বুধবার রাতে তিনি ফেরেননি। দুই দিনাজপুরে কর্মসূচির পর মালদহেই ছিলেন । আর বৃহস্পতিবার ভোরেই শুরু হয় ইডি অভিযান - যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে । এই ঘটনার ফলে নির্বাচনের আগে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি কিছুটা হলেও ‘রাজনৈতিক অক্সিজেন’ পাবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল । রাজ্য বিজেপির একাংশের অভিযোগ ছিল, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি বারবার তলব করলেও শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ করা হয়নি । সেই আবহেই, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কলকাতা সফরের এক সপ্তাহের মধ্যে এই অভিযান নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিল ।
ঘটনাচক্রে, বৃহস্পতিবারই কলকাতায় এসেছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নড্ডা । তাঁর সঙ্গে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বের বৈঠক হওয়ার কথা । তার ঠিক আগের দিন আইপ্যাকের দফতরে ইডি হানা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে রাজ্য রাজনীতিতে ৷

