1700 কোটির সেতুর শিলান্যাস ! মমতার বার্তা 'সব সাগর একবার, গঙ্গাসাগর বারবার'
কাকদ্বীপের লট নম্বর আট ও কচুবেড়িয়ার মধ্যে সংযোগকারী এই সেতু সুন্দরবনের অর্থনীতি ও পর্যটন মানচিত্রে আমূল পরিবর্তন আনবে বলে আশাবাদী প্রশাসন ।


Published : January 5, 2026 at 3:13 PM IST
সাগর, 5 জানুয়ারি: দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাস্তবের পথে বহু কাঙ্ক্ষিত গঙ্গাসাগর সেতু । মুড়িগঙ্গা নদীর ওপর তৈরি হতে চলা এই সেতুর শিলান্যাস করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । সোমবার সাগরে দাঁড়িয়ে 1,700 কোটি টাকার এই প্রকল্পের সূচনা করে তিনি জানিয়ে দেন, রাজ্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকেই এই বিশাল খরচের যোগান দেওয়া হচ্ছে । কাকদ্বীপের লট নম্বর আট এবং কচুবেড়িয়ার মধ্যে সংযোগকারী এই সেতু তৈরি হলে সুন্দরবনের অর্থনীতি ও পর্যটন মানচিত্রে আমূল পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছে প্রশাসন ।
এদিন সাগরের মাটি থেকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "আজ এই ব্রিজটির শিলান্যাস করে শুধু বাংলার মানুষের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের পর্যটকদের জন্য গর্বিত বোধ করছেন ।" মুড়িগঙ্গা নদীর ওপর এই সেতু তৈরির দায়িত্ব পেয়েছে দেশের অন্যতম খ্যাতনামা নির্মাণ সংস্থা এলঅ্যান্ডটি (L&T)। মুখ্যমন্ত্রী জানান, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি হবে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই চার লেনের সেতুটি । আগামী 2-3 বছরের মধ্যে এই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই কাজের বরাত বা 'ওয়ার্ক অর্ডার' দেওয়া হয়ে গিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন ।
গঙ্গাসাগর যাত্রার দুর্গমতা বোঝাতে একটা সময় মানুষের মুখে মুখে ফিরত 'সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার' প্রবাদটি । এদিন সেই প্রবাদকে কার্যত বদলে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নতুন স্লোগান তোলেন, 'সব সাগর একবার, গঙ্গাসাগর বারবার'। তিনি মনে করিয়ে দেন, আগে বকখালি যাওয়ার পথেও সেতু ছিল না, যা এখন তৈরি হয়েছে । মুড়িগঙ্গার ওপর এই সেতুটি সম্পন্ন হলে পুণ্যার্থী ও স্থানীয় মানুষকে আর জোয়ার-ভাটার খেয়াল রেখে নদী পারাপারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না । দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা ও ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাবেন লক্ষ লক্ষ মানুষ ।

এই সেতু কেবল তীর্থযাত্রীদের সুবিধাই নয়, স্থানীয় প্রায় তিন লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও বড় ভূমিকা নেবে । সেতুটি চালু হলে মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসার জন্য দ্রুত মূল ভূখণ্ডে বা কলকাতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে, যা এতদিন জোয়ার-ভাটার কারণে প্রায়শই বাধাপ্রাপ্ত হত । পাশাপাশি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পরিবহণ সহজ হবে এবং স্থানীয় কৃষিজাত পণ্য বাইরে পাঠানোর সুযোগ বাড়লে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে । ঝড়, বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছনো এবং মানুষকে উদ্ধার করার ক্ষেত্রেও এই সেতু 'লাইফলাইন' হয়ে উঠবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী ।

ভাষণের এক পর্যায়ে মুখ্যমন্ত্রী সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাসের প্রসঙ্গ টেনে আনেন । তিনি বলেন, "বাংলার মানুষ জানেন, বঙ্কিমচন্দ্র যখন কপালকুণ্ডলা লিখেছিলেন, তখন নবকুমার পথ হারিয়েছিলেন এই সাগর সঙ্গমে এসেই ।" অতীতে এই পথ কতটা দুর্গম ও বিপজ্জনক ছিল, তা বোঝাত তিনি বলেন, একদিকে বাঘ, অন্যদিকে কুমির, মাঝখানে উত্তাল নদী - এই ছিল সুন্দরবনের মানুষের নিত্যদিনের জীবনসংগ্রাম । সেই সংগ্রামকে সহজ করতেই রাজ্য সরকারের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ ।
এদিনের অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কপিলমুনি আশ্রমের প্রধান মহন্ত জ্ঞানদাসজি মহারাজের উত্তরাধিকারী হেমন্ত দাস মহারাজ, রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী, মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান সচিব মনোজ পন্থ-সহ একাধিক প্রশাসনিক কর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা । প্রশাসনিক মহলের মতে, 1700 কোটি টাকা ব্যয়ে রাজ্য সরকারের একক উদ্যোগে এই সেতু নির্মাণ ভারতের পরিকাঠামো উন্নয়নের ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে । সেতুটি সম্পূর্ণ হলে গঙ্গাসাগর মেলা প্রাঙ্গণ ও কপিলমুনির আশ্রমে যাতায়াত ব্যবস্থা আরও সুগম হবে, যা পর্যটন শিল্পে নতুন জোয়ার আনবে ।

