ETV Bharat / state

ভোটার তালিকা সংশোধন ‘প্রহসনে’ পরিণত হয়েছে ! SIR নিয়ে কমিশনকে ফের চিঠি মমতার

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ এর SIR নিয়ে তিনি দু’টি চিঠে লেখেন নির্বাচন কমিশনকে৷

Mamata Banerjee
SIR নিয়ে কমিশনকে ফের চিঠি মমতার (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : January 4, 2026 at 7:53 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

কলকাতা, 4 জানুয়ারি: রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় আবারও অসন্তোষ প্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে লেখা চার পাতার একটি চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, অপরিকল্পিত ও খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের জেরে গোটা প্রক্রিয়াটি এখন ‘প্রহসনে’ পরিণত হয়েছে।

অবিলম্বে এই ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া সংশোধন করা না-হলে, বহু বৈধ ভোটার নাগরিকত্ব হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। এই চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমান পদ্ধতিতে কাজ চলতে থাকলে বহু যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার হরণ বা ‘ডিসএনফ্রানচাইজমেন্ট’-এর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত।

Mamata Banerjee
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (নিজস্ব ছবি)

উল্লেখ্য, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে এর আগেও গত 20 নভেম্বর এবং 2 ডিসেম্বর কমিশনকে চিঠি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়ইনি, বরং ক্রমশ অবনতি হয়েছে।

হোয়াটসঅ্যাপে নির্দেশ, নেই সরকারি বিজ্ঞপ্তি

মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে লেখা চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, অত্যন্ত সংবেদনশীল এই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সরকারি নির্দেশনামার বালাই নেই। জেলাস্তরের আধিকারিকদের কাছে বহু নির্দেশ যাচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ বা টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে।

মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘‘এত বড় মাপের এবং সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে কোনও যথাযথ লিখিত বিজ্ঞপ্তি বা সংবিধিবদ্ধ নির্দেশ জারি না-করে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক বার্তা পাঠানো হচ্ছে। এই গোপনীয়তা ও স্বেচ্ছাচারিতা স্বচ্ছতার পরিপন্থী।’’

Mamata Banerjee
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (নিজস্ব ছবি)

তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই ‘ইনফর্মাল’ বা অনানুষ্ঠানিক নির্দেশের ভিত্তিতেই বিহারে গ্রাহ্য হওয়া ‘ফ্যামিলি রেজিস্টার’-কে এ রাজ্যে আচমকা পরিচয়পত্র হিসেবে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি রাজ্য সরকারের দেওয়া স্থায়ী বাসিন্দার শংসাপত্রকেও গ্রাহ্য করা হচ্ছে না৷ মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘আইনত যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও জীবিকার সন্ধানে ভিনরাজ্যে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের সশরীরে শুনানিতে হাজিরা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা অমানবিক।’’

আইটি বিভ্রাট ও ব্যাক-এন্ডে নাম বাদ

চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনে ব্যবহৃত আইটি সিস্টেম বা প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো ত্রুটিপূর্ণ এবং অস্থির (Unstable)। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আইটি সিস্টেমের অপব্যবহার করে ‘ব্যাক-এন্ড’ থেকে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, যা সম্পর্কে ‘ইলেক্টরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার’ (ইআরও)-রাও অন্ধকারে থাকছেন। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের তোয়াক্কা না-করে কার নির্দেশে এবং কোন আইনি বলে এমন কাজ করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

শুনানির নামে হয়রানি

ভোটারদের শুনানির জন্য ডাকার প্রক্রিয়া নিয়েও কমিশনের তীব্র সমালোচনা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে কেন ডাকা হচ্ছে, তার নির্দিষ্ট কারণ না-জানিয়েই ভোটারদের সমন পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও হয়রানি বাড়ছে।

Mamata Banerjee
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (নিজস্ব ছবি)

তিনি লিখেছেন, ‘‘এমনকি বয়স্ক, অসুস্থ ও দুর্বল নাগরিকদেরও রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। শুনানির জন্য 20-25 কিলোমিটার দূরে যাতায়াত করতে বাধ্য করা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।’’ মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন, কেন বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার বদলে এমন কেন্দ্রীভূত শুনানি করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়াও, শুনানিতে উপস্থিত ভোটারদের থেকে নথি জমা নেওয়া হলেও, তার কোনও প্রাপ্তিস্বীকার বা ‘রিসিপ্ট’ দেওয়া হচ্ছে না-বলে অভিযোগ। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, নথিপত্রের প্রমাণ না-থাকা ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।

অফিসার নিয়োগে অনাস্থা ও বিহারের প্রসঙ্গ

কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মুখ্যমন্ত্রী চিঠিতে লিখেছেন, রাজ্য সরকারের পাঠানো প্যানেলকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে ‘মাইক্রো-অবজারভার’ হিসেবে যাঁদের নিয়োগ করা হচ্ছে, তাঁরা মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের ‘গ্রুপ-বি’ কর্মী। মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন, এই সংবেদনশীল কাজের জন্য তাঁদের কোনও অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ নেই এবং তাঁরা নিজেদের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন।

Mamata Banerjee
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (নিজস্ব ছবি)

বিহারে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল, এ রাজ্যে তার সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটছে কমিশন। বানান ভুল বা বয়সের সামান্য তারতম্যের মতো ছোটখাটো ‘যৌক্তিক বিচ্যুতি’ (Logical Discrepancies) সারাতে গিয়ে আন্তঃজেলা বা আন্তঃরাজ্য যাচাইকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই যাচাইকরণ সম্ভব নয় জেনেও ইচ্ছাকৃতভাবে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের বাধা

চিঠির শেষ ভাগে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, বুথ লেভেল এজেন্ট (বিএলএ)-দের শুনানির সময় থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি লেখেন, ‘‘ভোটগ্রহণের দিনও যেখানে পোলিং এজেন্টদের বুথে থাকার অনুমতি থাকে স্বচ্ছতার স্বার্থে, সেখানে ভোটার তালিকা সংশোধনের শুনানিতে বিএলএ-দের বাধা দেওয়া প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।’’

চিঠির শেষে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, অবিলম্বে এই ত্রুটিগুলি সংশোধন করা হোক। অন্যথায়, এই অপরিকল্পিত, খামখেয়ালি এবং অ্যাড-হক প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। কারণ, এভাবে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে, তা দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর মূলে কুঠারাঘাত করবে এবং বহু মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন।

প্রসঙ্গত, আগেই একই অভিযোগ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি দল, যাঁর নেতৃত্বে ছিলেন লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের দলনেতা তথা দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করেছেন। এরপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজেই এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেল। এখন দেখার সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখে নির্বাচন কমিশন কী পদক্ষেপ করে৷

আরও পড়ুন -

  1. নাকে অক্সিজেনের নল লাগিয়ে SIR শুনানিতে, পরের দিনই আতঙ্কে মৃত্যু জয়নগরের বৃদ্ধের !
  2. 10 বছরে দু’বার লাইনে দাঁড় করাল, SIR-নোটবন্দির তুলনা টেনে মোদিকে নিশানা অভিষেকের