তিন দিন আগে শেষ কথা, চিন-সীমান্তে নিখোঁজ ইঞ্জিনিয়ার লোপামুদ্রার বাড়িতে রূপা
একদিকে নেপালের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর... সব মিলিয়ে উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছে সোনারপুরের বৈকুণ্ঠপুর। বাড়ির ছোট-বড় সকলেই অপেক্ষা করছেন একটি ফোনের জন্য।

Published : August 29, 2026 at 2:12 PM IST
সোনারপুর, 29 অগস্ট: ভ্রমণের নেশাই কাল হল ? নেপালে বেড়াতে গিয়ে চিনের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ সোনারপুরের বৈকুণ্ঠপুরের বাসিন্দা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার লোপামুদ্রা কুণ্ডু। পরিবারের সঙ্গে শেষবার ফোনে কথা বলার সময় জানিয়েছিলেন, তাঁরা চিন সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় রয়েছেন। দুর্গম এলাকা হওয়ায় সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যা রয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি ৷ শুক্রবার সোনারপুর দক্ষিণের বিধায়ক রূপা গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন ৷
বিজেপি বিধায়ক বলেন, "লোপামুদ্রা কুণ্ডুর পরিবারের সামনে আমার কথা হয়েছে ৷ আমাদের পক্ষ থেকে সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে ৷ মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের সঙ্গে নিয়মিত আমরা যোগাযোগ রাখছি ৷ নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে ৷ কীভাবে তাঁদের ফেরানো যায় তার সবরকম ব্যবস্থা আমরা করছি।" পাশাপাশি বারুইপুর পুলিশ জেলার পক্ষ থেকে একাধিক আধিকারিকরা লোপামুদ্রার বাড়িতে এসে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। তবে এখনও পর্যন্ত প্রিয়জনের কোনও সন্ধান না-পাওয়ায় উৎকণ্টার মধ্যে রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
পরিবারের সদস্যদের চিন্তা না-করার পরামর্শ দিয়েছিলেন লোপামুদ্রা ৷ কিন্তু সেই শেষ কথার পর থেকেই আর কোনও যোগাযোগ নেই ৷ নেপালে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবরের মধ্যে প্রিয়জনের কোনও খোঁজ না-পেয়ে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে লোপামুদ্রার পরিবারের ৷ পরিবারের একটাই প্রার্থনা ৷ দুর্যোগের সমস্ত আশঙ্কা কাটিয়ে দ্রুত লোপামুদ্রার সন্ধান মিলুক। শেষ ফোনে যেভাবে বলেছিলেন, 'চিন্তা করো না', সেই কথাটাই এখন আঁকড়ে ধরে রয়েছেন তাঁর স্বজনরা। তাঁদের আশা, খুব শীঘ্রই নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে আসবেন লোপামুদ্রা।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, লোপামুদ্রা পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তাঁর স্বামী শুভ্রজিৎ সিনহা রায় পেশায় ব্যাঙ্ককর্মী। সোনারপুরের বৈকুণ্ঠপুরে তাঁদের সংসার। পরিবারে রয়েছেন স্বামী, মা-বাবা এবং এক ছেলে ও এক মেয়ে। কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও ঘুরে বেড়ানোর প্রতি বরাবরই আলাদা টান ছিল লোপামুদ্রার। প্রতিবছরই বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যেতেন তিনি। অনেক সময় একাই ভ্রমণে বেরিয়ে পড়তেন। এবারের গন্তব্য ছিল নেপাল।

গত 21 অগস্ট 'চলো যাই' নামে একটি ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে 32 জনের একটি দলের সদস্য হয়ে নেপালের উদ্যেশে রওনা দেন লোপামুদ্রা। পরিকল্পনা ছিল নেপালের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘোরার পাশাপাশি চিন সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় যাওয়ার। যাত্রার শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। পরিবারের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন লোপামুদ্রা।
গত 26 অগস্ট সকালেও পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা হয় তাঁর। সেই সময় তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁদের দল চিন সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় পৌঁছে গিয়েছে। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ঠিকমতো কাজ করছে না। ফলে পরবর্তী সময়ে হয়তো ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হবে না। পরিবারের সদস্যদের সেই কথাই কিছুটা আশ্বস্ত করেছিল। এরপর নেপালের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর সামনে আসতে শুরু করে। একাধিক এলাকায় প্রবল বৃষ্টি, হড়পা বান, ভূমিধস-সহ বিভিন্ন বিপর্যয়ের খবর আসতে থাকে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার খবরও ছড়িয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই লোপামুদ্রাকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায় তাঁর পরিবার ৷ পরিবারের তরফে ফের তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সেই সময় কোনওভাবে যোগাযোগ করা গেলেও লোপামুদ্রা পরিবারের সদস্যদের চিন্তা না-করার কথা জানান। তিনি নিরাপদে রয়েছেন বলেই আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু সেটিই হয়ে ওঠে পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষ যোগাযোগ। এরপর থেকে তাঁর মোবাইল ফোনে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
সময় যত গড়িয়েছে, পরিবারের উদ্বেগও তত বেড়েছে। ফোনে যোগাযোগ না-হওয়ায় বারবার চেষ্টা করা হচ্ছে তাঁর সঙ্গে কথা বলার। কিন্তু কোনও সাড়া মিলছে না। লোপামুদ্রার বর্তমান অবস্থান কোথায়, তিনি ঠিক কেমন রয়েছেন, তাঁর সঙ্গে থাকা 32 জনের দলের অন্য সদস্যদের পরিস্থিতি কী... এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা।
পরিবারের আশঙ্কা, চিন-সীমান্ত সংলগ্ন যে দুর্গম এলাকায় তাঁরা গিয়েছেন, সেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মোবাইল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস বা হড়পা বানের কারণে কোথাও রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলেও পর্যটকদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ৷ যদিও লোপামুদ্রার ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনও তথ্য পরিবারের হাতে আসেনি।
লোপামুদ্রার স্বামী শুভ্রজিৎও স্ত্রী-কে নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। প্রতিদিনের মতো ফোনের ওপারে স্ত্রীর কণ্ঠ শোনার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো পরিবার। যে মানুষটি বেড়াতে গিয়ে পরিবারকে নিশ্চিন্ত করতে বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গেই এখন আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ফলে আনন্দের ভ্রমণ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে দুশ্চিন্তার ঘটনায়।
পরিবারের তরফে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত লোপামুদ্রার সন্ধান করার আবেদন জানানো হয়েছে। ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন পরিবারের সদস্যরা। দলের অন্য পর্যটকদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে লোপামুদ্রার অবস্থান সম্পর্কে কোনও তথ্য পাওয়া যায় কি না, সেই চেষ্টাও চলছে ৷

