ট্রাফিক সিগন্যালে দেবদেবীর বেশ ধরে হাতসাফাই! কলকাতা পুলিশের জালে গুজরাতের ‘ভেকধারী’ চক্র
তদন্তকারীদের দাবি, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করত এই দল। একজন কথা বলত, আরেকজন ‘আশীর্বাদ’-এর ভঙ্গিতে চুরি করত! ভুক্তভোগীরা বুঝতেই পারতেন না কখন সর্বস্ব খোয়া গেল।

Published : February 15, 2026 at 10:02 PM IST
কলকাতা, 15 ফেব্রুয়ারি: কলকাতার ব্যস্ত মোড়। ট্র্যাফিক সিগন্যালে লাল আলো জ্বলছে। কেউ রাস্তা পার হবেন, কেউ বা গাড়ির কাচ নামিয়ে অপেক্ষা করছেন। চেনা এই ছবির আড়ালে শহরে ফাঁদ পেতেছিল গুজরাতের প্রতারক চক্র৷ রবিবার দুপুরে এক্সে পোস্ট করে এ ব্যাপারে শহরবাসীকে সতর্ক করল কলকাতা পুলিশ৷
পোস্টে নাটকীয় ভঙ্গিমায় পুলিশের বয়ান, 'ধরুন আপনি ট্র্যাফিক সিগনালে বা অন্য কোথাও অপেক্ষা করছেন, হয়তো রাস্তা পেরোবেন। আপনার দিকে এগিয়ে এলেন মা কালী, শিবঠাকুর এবং আরও অন্যান্য দেবদেবী।...দেবদেবীর দল উধাও হয়ে যাওয়ার পর আপনি দেখলেন, আপনার মানিব্যাগ বা মোবাইলও উধাও। অভাবনীয় দক্ষতায় সেগুলো হাতিয়ে নিয়েছে চোরেরা!'
দেবদেবীর বেশ ধরে চুরি, আমাদের জালে গুজরাটের চার বাসিন্দা
— Kolkata Police (@KolkataPolice) February 15, 2026
ব্যাপারটা শুনতে সোজা। ধরুন আপনি ট্র্যাফিক সিগনালে বা অন্য কোথাও অপেক্ষা করছেন, হয়তো রাস্তা পেরোবেন। আপনার দিকে এগিয়ে এলেন মা কালী, শিবঠাকুর এবং আরও অন্যান্য দেবদেবী। চমকে যাবেন না, এরা ঠাকুর-দেবতার বেশধারী মানুষ মাত্র।… pic.twitter.com/mF03RZLCs5
ট্রাফিক পুলিশের এক আধিকারিকের কথায়, "প্রথম দর্শনে চমকে ওঠাই স্বাভাবিক। ততক্ষণে করুণ কণ্ঠে অনুরোধ, 'কিছু দান করুন।' ধর্মীয় আবেগে কেউ দশ, কেউ কুড়ি টাকা এগিয়ে দেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে যায় অদৃশ্য কারসাজি। ‘আশীর্বাদ’ শেষ হতেই দেখা যায়, মানিব্যাগ বা মোবাইল উধাও!"
সাম্প্রতিক অতীতে কলকাতা শহরের একাধিক ট্রাফিক সিগন্যালে এই অভিনব প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেকেই৷ এ ব্যাপারে পুলিশের কাছে বেশ কয়েকটি অভিযোগও জমা পড়েছে৷ তারই অন্যতম জোড়াসাঁকো থানার একটি অভিযোগ৷ যার ভিত্তিতে শহরের বুকে 'ভক্তির আড়ালে হাতসাফাই' ঠেকাতে তৎপর হয় কলকাতা পুলিশ।
তদন্তে নেমে শনিবার হেস্টিংস এলাকা থেকে ভেকধারী চার অভিযুক্তকে পাকড়াও করে পুলিশ৷ এ ব্যাপারে শহরবাসীকে সতর্ক করে সোশ্যাল মাধ্যমে ধৃতদের ছবি, পরিচয় দিয়ে পোস্ট করেছে পুলিশ৷ তাতে জানানো হয়েছে, ধৃতরা সকলেই গুজরাতের আনন্দ জেলার বাসিন্দা— অনিল রামজু সালাত, ধীরু কালোভাই সালাত, সমীরভাই সালাত এবং রাজু কুমার।
তদন্তকারীদের পর্যবেক্ষণে, ভক্তি আর ভেক, এই দুইয়ের মিশেলে ‘ব্যবসা’র ফাঁদ পেতেছিল প্রতারকরা। শুধু কলকাতাই নয়, দেশের অন্য শহরেও একই কায়দায় প্রতারণা চালাত এই চক্র।
কী ভাবে ধরা পড়ল ভেকধারীরা?
রয়েছে নাটকীয় মোড়। পুলিশ সূত্রের খবর, কয়েক দিন আগে গিরিশ পার্ক থানায় দায়ের হওয়া একটি মোবাইল চুরির মামলায় পার্ক স্ট্রিট এলাকা থেকে গ্রেফতার হয় দুই যুবক— মহম্মদ শাহনওয়াজ ও মহম্মদ সমীর। জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে এক বৃহত্তর চক্রের ইঙ্গিত। সেই সূত্র ধরেই পুলিশ পৌঁছে যায় 'দেবদেবীর ছদ্মবেশী' দলের কাছে। নজরদারি বাড়িয়ে অবশেষে হেস্টিংস থেকে চার জনকে পাকড়াও করা হয়।
তদন্তকারীদের দাবি, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করত এই দল। একজন কথা বলত, আরেকজন ‘আশীর্বাদ’-এর ভঙ্গিতে কাছে এসে মুহূর্তের মধ্যে সেরে ফেলত হাতসাফাই! ভুক্তভোগীরা বুঝতেই পারতেন না কখন সর্বস্ব খোয়া গেল।
ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এদের সঙ্গে আর কারা জড়িত এবং শহরের কোন কোন এলাকায় তারা সক্রিয় ছিল, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। রসিকতার সুরে এক ট্রাফিক পুলিশ কর্মীর সতর্কবার্তা, "মনে ভক্তি থাকুক, কিন্তু ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ালে অবশ্যই নজর রাখুন নিজের ব্যাগ আর মোবাইলের প্রতি! না হলে আশীর্বাদের ফাঁদে সর্বস্ব খোয়াতে হবে!"

