প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে গাছের ডাল ভেঙে মৃত্যু একজনের ! বিপর্যস্ত কলকাতা, জলমগ্ন একাধিক রাস্তা
অস্বস্তিকর গরমের হাত থেকে স্বস্তি মিললেও শহরের একাধিক রাস্তায় জল জমে, গাছ ভেঙে পড়ে দুর্ভোগের পরিস্থিতি ৷ শহরে ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় 88 কিলোমিটার !

Published : May 29, 2026 at 3:23 PM IST
কলকাতা, 29 মে: দুপুর গড়াতেই যেন আচমকাই নেমে এল সন্ধে ! কালো মেঘে ঢেকে গেল কলকাতার আকাশ । শুরুতে ঠান্ডা হাওয়া, তার সঙ্গে ঘন ঘন বজ্রপাত । তারপরই ঝেঁপে বৃষ্টি । শুক্রবার দুপুরে আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টিতে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকা । তীব্র ঝড়-জলের জেরে গাছ ভেঙে পড়ে এবং জল জমে এদিন শহর কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায় কার্যত দুর্ভোগের ছবি সামনে এসেছে ৷ বহু এলাকায় ব্যহত যান চলাচল ৷
পুলিশ সূত্রের খবর, এদিন বিকেল পর্যন্ত ঝড় জলে এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর জানা গিয়েছে ৷ তবে মৃত ব্যক্তির পরিচয় জানা যায়নি ৷ প্রিন্সেপ ঘাট-সংলগ্ন রেললাইনের ওপর থেকে ওই ব্যক্তির দেহ উদ্ধার করা হয় ৷ প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, ঝড় জলের মধ্যে গাছের ভারী ডাল পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে ৷ মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হতে পুলিশ দেহটি ময়নাতদন্তে পাঠিয়েছে ৷
হাওয়া অফিস সূত্রের খবর, এদিন দুপুর 2.45 মিনিট থেকে 2.47 মিনিটের মধ্যে শহরে ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ পৌঁছয় ঘণ্টায় 88 কিলোমিটার । একইভাবে উত্তর 24 পরগনার দমদম এলাকাতেও প্রবল ঝড় হয় । দুপুর 2.29 থেকে 2.30 মিনিটের মধ্যে সেখানে ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় 74 কিলোমিটার । দীর্ঘদিনের আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তিকর গরমের পর এই বৃষ্টি কিছুটা স্বস্তি দিলেও, শহরের একাধিক রাস্তায় জল জমে জনজীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ ।
তীব্র ঝড় জলের দাপটে এদিন দুপুরে সাউথ সিটি মলের একাধিক কাচ ভেঙে পড়েছে বলে খবর ৷ একইভাবে হরিশ মুখার্জি রোড, বিড়লা তারামণ্ডল, আলিপুর-সহ শহরের বিস্তীর্ণ এলাকায় একাধিক গাছ ভেঙে পড়েছে ৷ ঘটনার জেরে বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যহত ৷ শুধু কলকাতাই নয়, দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলাতেও এদিন দুপুর থেকে ঝড়-বৃষ্টির দাপট শুরু হয়েছে ।
ঝড় জলে বিপর্যস্ত সল্টলেকের জনজীবনও ৷ ঝড়ের দাপটে সল্টলেকের বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক গাছ ভেঙে পড়েছে রাস্তার ওপর । এর ফলে বেশ কিছু রাস্তায় যান চলাচল সাময়িকভাবে ব্যহত হয় । স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সল্টলেকের একটি বড় গাছ আচমকাই পার্ক করে রাখা একটি চারচাকা গাড়ির ওপর ভেঙে পড়ে । এর ফলে গাড়িটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । অন্য একটি স্থানে এক বাইক আরোহী যাওয়ার সময় তাঁর ওপর গাছ ভেঙে পড়ে । দুর্ঘটনায় ওই বাইক আরোহী আহত হন । স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে । খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বিপর্যয় মোকাবিলা দল । পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং রাস্তা সচল করতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় গাছ কাটার কাজ চালানো হচ্ছে । প্রশাসনের তরফে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে ।

হাওয়া অফিস জানিয়েছে, মধ্য পাকিস্তান থেকে অভ্যন্তরীণ ওড়িশা পর্যন্ত একটি অক্ষরেখা রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর ছত্তীসগঢ় হয়ে বিস্তৃত রয়েছে । পাশাপাশি উত্তর অভ্যন্তরীণ ওড়িশা সংলগ্ন এলাকায় থাকা একটি ঘূর্ণাবর্ত ওই অক্ষরেখার সঙ্গে মিশে গিয়েছে । তার জেরেই বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প ঢুকছে দক্ষিণবঙ্গে । ফলে তৈরি হয়েছে ঝড়বৃষ্টির অনুকূল পরিস্থিতি । আবহাওয়া দফতরের তরফে দক্ষিণ 24 পরগনা, উত্তর 24 পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুরে আগামী দুই থেকে তিন ঘণ্টার জন্য বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে ।
শুক্রবার দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সব জেলাতেই হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর । বিশেষ করে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, বীরভূম, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ঘণ্টায় 60 থেকে 70 কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে । কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতেও 50 থেকে 60 কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে । ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে উত্তরবঙ্গেও । মালদা ও দুই দিনাজপুরে একাধিক জায়গায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে হাওয়া অফিস । শনিবারও ঝড়-বৃষ্টির পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে ।
কলকাতায় দুপুরের প্রবল বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়ে শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। উত্তর কলকাতার ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি এলাকা থেকে মধ্য কলকাতার সিআর অ্যাভিনিউ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় হাঁটুসমান জল জমে যায়। রাস্তার উপর জল জমে যাওয়ায় বাস, ট্যাক্সি, বাইক-সহ ছোট গাড়ির গতি অনেকটাই কমে যায় । একাধিক জায়গায় গাড়ি বিকল হয়ে পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে । বহু পথচারীকে জল ঠেলে গন্তব্যে পৌঁছতে দেখা যায় । কোথাও কোথাও ফুটপাত ডুবে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে রাস্তাতেই হাঁটতে হয় সাধারণ মানুষকে । তথৈবচ হাল দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকাতেও ৷

সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন ঝড় জলের সময় রাস্তায় থাকা মানুষজন । জল জমার কারণে অনেক জায়গায় বাস দাঁড় করাতেও সমস্যা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পথে নামে কলকাতা পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী । ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জল জমা এলাকাগুলিতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে । নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলকাতা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এক আধিকারিক বলেন, "পরিস্থিতি সামাল দিতে সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোথাও যানজট তৈরি হলে দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে ।"
অন্যদিকে, জল জমা এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে । সেই কারণে বিপজ্জনক জায়গাগুলিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। খোলা বৈদ্যুতিক তার বা ট্রান্সফর্মারের কাছে না যাওয়ার জন্য মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে স্থানীয়দের ।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী কয়েক ঘণ্টায় কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় আরও বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে। ফলে জল জমার পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে । প্রশাসনের তরফে অপ্রয়োজনীয় বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নাগরিকদের ।

