ফিরবে সবুজ ও স্বচ্ছ জল, রবীন্দ্র সরোবরকে দূষণমুক্ত করতে ব্যাপক সংস্কারের ভাবনা
রবীন্দ্র সরোবরের জলে বিপুল পরিমাণ ধাতবকণা ৷ পলি তুলতে 'সাকশন কাটার ড্রেজিং' ব্যবহারের পরিকল্পনা ৷

Published : June 29, 2026 at 8:00 PM IST
কলকাতা, 29 জুন: দেশের সংরক্ষিত জাতীয় জলাধার রবীন্দ্র সরোবর আজ 'মৃত্যু'-মুখে ! এমনই ভয়াবহ পরিস্থিতি একদা নানান প্রজাতির পাখির বিচরণ ক্ষেত্রের ৷ কারণ জলের গুণগত মান তলানিতে, বেড়েছে বিষাক্ত ধাতব পদার্থ থেকে কলিফর্ম, গভীরতাও কমেছে মারাত্মক, বিপন্ন বাস্তুতন্ত্র এবং সর্বোপরি কমেছে রবীন্দ্র সরোবরে সবুজের পরিমাণ ৷ আর এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য প্রাতঃভ্রমণকারী থেকে শুরু করে, পরিবেশকর্মী সকলে দায়ী করেছেন বিগত সরকারের চরম উদাসীনতাকে ৷
তবে, পরিস্থিতি এখনও হাতের বাইরে যায়নি ৷ তৃণমূল সরকারের পতন ও বিজেপির সরকার গঠনের সঙ্গেই বদলাতে চলছে রবীন্দ্র সরোবরের বাস্তুতন্ত্র ৷ খুব দ্রুত ফিরবে সেখানকার সবুজ ৷ সেই সঙ্গে রবীন্দ্র সরোবরের টলটলে কাচের মতো স্বচ্ছ জল ৷ কমে যাবে কংক্রিটও ৷ এমনই একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছে কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভলপমেন্ট অথরিটি বা কেএমডিএ ৷
সম্প্রতি রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন দক্ষিণ কলকাতার ফুসফুস হিসেবে পরিচিত রবীন্দ্র সরোবরে ৷ সেখানে তিনি আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে গোটা সরোবর ঘুরে দেখেন ৷ কথা বলেন প্রাতঃভ্রমণকারী থেকে শুরু করে পরিবেশকর্মী সকলের সঙ্গে ৷ তাঁরা একাধিক সমস্যার কথা মন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন ৷
সেদিনই মন্ত্রী আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন দ্রুত সমস্যাগুলি সমাধান করতে ৷ এমনকি আর্থিক অনুমোদন নিয়ে চিন্তা করতে বারণ করেছিলেন ৷ এরপরেই তৎপর হয় কেএমডিএ ৷ আর সেই মতো সরোবরের হাল ফেরাতে একাধিক পরিকল্পনাও করে ফেলেছেন কেএমডিএ আধিকারিকরা ৷
কেএমডিএ সূত্রে খবর, রবীন্দ্র সরোবরে প্রতি বছর গড়ে 8.3 সেন্টিমিটার হারে পলি জমা হয় ৷ কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (KMDA) এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা পরিচালিত বাথিমেট্রিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে ক্রমাগত পলি জমার কারণে হ্রদের গড় গভীরতা 2022 সালে 3.2 মিটার থেকে কমে 3.0 মিটার হয়ে গিয়েছে ৷
পলি জমা এবং পরিবেশগত তথ্য
2022 থেকে 2025 সালের মধ্যে রবীন্দ্র সরোবরে অগভীর অঞ্চল বৃদ্ধি পেয়েছে ৷ হ্রদে 2 মিটারের কম গভীর এমন অঞ্চলের পরিমাণ 7 শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে ৷
রবীন্দ্র সরোবরে ধাতবকণা
সরোবরের তলদেশের নমুনা পরীক্ষায় দস্তা এবং ম্যাগনেসিয়াম-সহ উচ্চপর্যায়ের বিষাক্ত ধাতব পলির উপস্থিতি পাওয়া গেছে ৷ যা বিশেষজ্ঞরা জলের গুণমান হ্রাস এবং মাছের মৃত্যুর কারণ বলে মনে করছেন ৷
এই বিষয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানী সোমেন্দ্রমোহন ঘোষ বলেন, "স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি না-করে হ্রদের তলদেশ থেকে নিরাপদে পলি পরিষ্কার করার জন্য 'সাকশন কাটার ড্রেজিং' ব্যবহার করা যেতে পারে ৷ এতে সরোবরের তলদেশে জমা পলি তুলে ফেলে গভীরতা ফেরানো যাবে ৷ এই পদ্ধতিতে বেঙ্গালুরু ও কাশ্মীরের ডাল লেকে গভীরতা ফেরানো কাজ হয়েছে ৷ ভেঙে যাওয়া গাছের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগাতে হবে ৷ পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাবের কংক্রিট কাঠামো ভেঙে ফেলা দরকার ৷ ধর্মীয় স্থান বা ক্লবগুলির শৌচালয়ের জল সরাসরি সরোবরে মেশে ৷ সেটার বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে ৷"
কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভলপমেন্ট অথরিটি এক আধিকারিক বলেন, "পলি উত্তোলনের জন্য যে যন্ত্র ব্যবহার হবে, তাতে জ্বালানির ধোঁয়া উৎপাদন হবে ৷ তাই কীভাবে সেই কাজ করা যায়, জানতে চেয়ে পরিবেশ আদালতের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে ৷ পানা-সহ আশপাশে পরিষ্কার ও গভীরতা বৃদ্ধির কাজ হবে ৷ ক্লাবগুলি পরিদর্শন করে দেখা হচ্ছে, কোনও কংক্রিটের কাঠামো তৈরি করেছে কি না ৷ পাশাপাশি, তাদের শৌচালয়ের জল সরাসরি সরোবরে পড়ছে কি না, না-পড়লে সেই জল কীভাবে, কোথায় যাচ্ছে, তা দেখা হচ্ছে ৷ বসার যে জায়গাগুলি আছে, তার উপরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ছাউনি দেওয়া হবে ৷ পরিচ্ছন্নতার দিকে আরও জোর দেওয়া হবে ৷ রবীন্দ্র সরোবরের নিরাপত্তা আরও বৃদ্ধি করা হবে ৷ সিসিটিভি-র নজরদারি বাড়ানো হবে ৷ যেখানে-যেখানে বড় গাছ ভেঙে পড়েছে বা ফাঁকা জায়গা আছে, সেখানে আরও গাছ লাগানোর মাধ্যমে সবুজ বৃদ্ধি করা হবে ৷"

