ETV Bharat / state

নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে আদানি পুত্র, রাজ্যে বিপুল বিনিয়োগের সম্ভাবনা

দীর্ঘ প্রশাসনিক-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর, খোদ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আদানি গোষ্ঠীর শীর্ষকর্তার এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে রাজ্যের শিল্প মহলে এক বড় ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছে ওয়াকিবহল মহল ।

SUVENDU ADHIKARI WITH KARAN ADANI
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে আদানি গ্রুপের কর্ণধার গৌতম আদানির বড় ছেলে করণ (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : June 4, 2026 at 7:29 AM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

কলকাতা, 4 জুন: রাজ্যে কি এবার সত্যিই বড়সড় শিল্পের জোয়ার আসতে চলেছে ? দীর্ঘদিনের শিল্প খরা কাটিয়ে বাংলা কি ফের দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প কেন্দ্র হয়ে ওঠার পথে পা বাড়াচ্ছে ? রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই এই ধরনের নানা প্রশ্ন এবং জল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছিল বিভিন্ন মহলে । এবার সেই জল্পনাতেই যেন এক নতুন মাত্রা যোগ হল ।

বুধবার রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দফতর নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক করলেন দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান আদানি গোষ্ঠীর কর্ণধার গৌতম আদানির বড় ছেলে করণ আদানি । করণ হলেন ভারতের বৃহত্তম বন্দর ও লজিস্টিকস সংস্থা 'আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন' (APSEZ)-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর (MD)। আদানি গ্রুপের বৈশ্বিক বন্দর পরিচালনা, পরিকাঠামো উন্নয়ন ও কৌশলগত সম্প্রসারণে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন ।

নবান্ন সূত্রের খবর, এদিনের এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে মূলত রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ক্ষেত্র, লজিস্টিক্স হাব তৈরি এবং গ্রিনফিল্ড সড়ক নির্মাণের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে ।

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই নতুন সরকার বারবার দাবি করে আসছে যে, তারা বাংলায় একটি সম্পূর্ণ নতুন, স্বচ্ছ এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর । সেই লক্ষ্য পূরণে দেশের অন্যতম শীর্ষ এই বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা ।

রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষস্তরের খবর অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে পরিকাঠামোর সার্বিক ভোলবদল, শিল্পের জন্য উপযুক্ত পরিষেবা বৃদ্ধি, সিঙ্গল উইন্ডো সিস্টেমের মাধ্যমে দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগগুলি খতিয়ে দেখাই ছিল বুধবারের এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য । বিশেষ করে গ্রিনফিল্ড সড়ক ও লজিস্টিক্স নেটওয়ার্কের মতো ক্ষেত্রগুলিতে আদানি গোষ্ঠী আগামী দিনে রাজ্যে বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে ।

ভৌগোলিক দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এই রাজ্যকে কেন্দ্র করে উত্তর-পূর্ব ভারত এবং প্রতিবেশী দেশগুলিতে বাণিজ্য প্রসারের বিপুল সুযোগ রয়েছে । এই বিষয়টিকে কাজে লাগিয়েই আদানিরা এ রাজ্যে বড়সড় লজিস্টিক্স হাব তৈরি করতে আগ্রহী বলে সূত্রের খবর । যদিও ঠিক কত টাকার বিনিয়োগ রাজ্যে আসতে চলেছে বা কোন কোন সুনির্দিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে চলেছে, তা নিয়ে সরকার বা আদানি গোষ্ঠী— কোনও পক্ষের তরফেই এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনও ঘোষণা করা হয়নি ।

এই নতুন করে বিনিয়োগের সম্ভাবনার পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসছে অতীতের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও । অতীতে পশ্চিমবঙ্গে আদানি গোষ্ঠীর বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা একেবারেই সুখকর ছিল না । প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পূর্বতন সরকারের আমলে তাজপুরে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির টেন্ডার পেয়েছিল গৌতম আদানির সংস্থা । সেই সময় এই মেগা প্রকল্প ঘিরে রাজ্যজুড়ে বিপুল উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল । মনে করা হয়েছিল, তাজপুর বন্দর চালু হলে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে ।

কিন্তু পরবর্তীকালে জমি অধিগ্রহণ, নানা প্রশাসনিক জটিলতা এবং নীতিগত টানাপোড়েনের কারণে সেই প্রোজেক্টটি আর আলোর মুখ দেখেনি । দিনের পর দিন টালবাহানা চলার পর শেষ পর্যন্ত সেই টেন্ডার বাতিল হয়ে যায় এবং বাধ্য হয়েই আদানি গোষ্ঠী রাজ্য থেকে তাদের বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয় । সেই ঘটনার পর রাজ্যের শিল্প সম্ভাবনা নিয়ে দেশজুড়ে বিস্তর নেতিবাচক চর্চা শুরু হয়েছিল এবং বিনিয়োগকারীদের মনেও একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছিল ।

তবে রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা । পুরনো তিক্ততা ভুলে আদানি গোষ্ঠী আবারও পশ্চিমবঙ্গকে বিনিয়োগের অন্যতম সেরা গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে, নবান্নের এই বৈঠকেই তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে ।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্যে বর্তমানে পরিকাঠামো উন্নয়নের বিপুল সুযোগ রয়েছে । আদানিদের হাত ধরে বন্দর, বিদ্যুৎ, সড়ক বা লজিস্টিক্সের মতো কোর সেক্টরে বড় বিনিয়োগ এলে রাজ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হবে । রাজ্যের বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যাবে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি । নতুন সরকারও চাইছে শিল্পের মাধ্যমে রাজ্যের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি উন্নত করতে ।

পাশাপাশি, এই বৈঠকের একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাবও রয়েছে । ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আদানি গোষ্ঠীর মতো বড় মাপের কর্পোরেট সংস্থা যদি বাংলায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে, তবে তা দেশের অন্যান্য বড় শিল্পপতিদের কাছেও একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও নিরাপদ বার্তা পৌঁছে দেবে । অতীতে যে সমস্ত শিল্পপতিরা বাংলায় বিনিয়োগ করতে গিয়েও পিছপা হয়েছিলেন, তাঁরাও এই শিল্পের উপযুক্ত পরিবেশ দেখে নতুন করে আগ্রহ দেখাতে পারেন । আর এই প্রক্রিয়া সফল হলে তা রাজ্যের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে অনেকটাই চাঙ্গা করে তুলতে সক্ষম হবে ।

রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে নতুন প্রশাসন যে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেছে, করণ আদানির সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই বৈঠককে তারই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপ হিসাবে দেখা হচ্ছে । শিল্পমহলের একাংশের মতে, দীর্ঘ দিন পর পশ্চিমবঙ্গে বৃহৎ কর্পোরেট বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে এই আলোচনা ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পুরনো হতাশার অধ্যায় পেরিয়ে আবারও পশ্চিমবঙ্গে আদানি গোষ্ঠীর আগ্রহ দেখা যাওয়ায় শিল্প ও বাণিজ্যমহলে প্রবল উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে । আপাতত এই বৈঠকের পর বড়সড় কোনও প্রকল্প বা বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন রাজ্যবাসী । আগামী দিনে এই বৈঠক রাজ্যের অর্থনৈতিক মানচিত্রে কী বদল আনে, সেটাই এখন দেখার ।