ETV Bharat / state

মরেও শান্তি নেই ! শেষকৃত্যের কাগজের জন্য নদী পেরিয়ে যেতে হয় 5 কিমি দূরে পাশের জেলায়

অজয়ের তীরে বিদবিহার গ্রাম পঞ্চায়েতে নেই সরকার স্বীকৃত শ্মশান ! তাই সৎকারের কাগজ পেতে পাড়ি দিতে হয় বীরভূমের জয়দেব গ্রাম পঞ্চায়েতে ৷

CREMATION WITHOUT DEATH CERTIFICATE
অজয় নদের তীরে খোলা জায়গায় এভাবেই হয় মৃতদেহ সৎকার ৷ (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : December 29, 2025 at 8:10 PM IST

4 Min Read
Choose ETV Bharat

দুর্গাপুর, 29 ডিসেম্বর: অজয়ের চরে প্রতিদিনই জ্বলে চিতার আগুন ৷ প্রায় রোজই মৃতদেহের শেষকৃত্য হলেও, প্রশ্ন রয়েছে এই শ্মশানের বৈধতা নিয়ে ৷ আর তার জেরে দেহ সৎকারের অনুমতি ও মৃত্যু শংসাপত্র কাগজ নিতে যেতে হয় পাশের বীরভূম জেলায় ৷ ঘটনা পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসার বিদবিহার গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ৷

জানা গিয়েছে, এই গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা বা তার আশেপাশে কোনও বৈধ শ্মশান নেই ৷ তাই ওই পঞ্চায়েত এলাকায় কেউ মারা গেলে, অজয় নদের চরে অস্থায়ী শ্মশানে নিয়ে গিয়ে সৎকার করা হয় ৷ তবে, শ্মশানটি বৈধ না-হওয়ায়, সেখানে শংসাপত্র দেওয়ারও কোনও অফিস নেই ৷ এমনকি অজয় নদের ওই চর এলাকা পশ্চিম বর্ধমান জেলার মধ্যে হলেও, কাঁকসার বিদবিহার গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে পড়ে না ৷

শেষকৃত্যের কাগজের জন্য নদী পেরিয়ে যেতে হয় 5 কিমি দূরে পাশের জেলায় (নিজস্ব ভিডিয়ো)

জানা গিয়েছে, চর এলাকাটি অজয় নদের উল্টোদিকে অবস্থিত বীরভূম জেলার ইলামবাজার ব্লকের জয়দেব গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে ৷ তাই অজয়ের উপর তৈরি হওয়া নতুন ব্রিজ পেরিয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরের একটি বৈধ শ্মশানে যেতে হয় দেহ সৎকারের কাগজ সংগ্রহ করতে ৷ ফলে চিকিৎসকের দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে পাঁচ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে কাগজ সংগ্রহ করা ও তা নিয়ে এসে দেহ সৎকারের ঝক্কি পোহাতে হয় বিদবিহার পঞ্চায়েতের অধীন গ্রামগুলিকে ৷

পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, কখনও কখনও গ্রামবাসীরা মৃতদেহ আগে সৎকার করে ফেলেন নিজেরাই ৷ তার এক বা দু’দিন পরে গিয়ে জয়দেব গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার শ্মশান থেকে কাগজ সংগ্রহ করে মৃত্যু শংসাপত্রের জন্য আবেদন করেন পরিবারের সদস্যরা ৷ আর এক্ষেত্রে কাগজ সহজে দিতে চান না শ্মশানের অফিসে থাকা কর্মী ৷ স্বাভাবিক কারণেই সেই কর্মী দেহ সৎকারের প্রমাণ চান ৷ তখন প্রমাণ দেখিয়ে চিকিৎসকের সার্টিফিকেটের বদলে কাগজ বের করতে হয় ৷ তারপরে সেই কাগজ নিয়ে পঞ্চায়েত থেকে মৃত্যু শংসাপত্রের জন্য আবেদন করেন বিদবিহারের মানুষজন ৷

ফলে শোকের আবহে পরিবারের সদস্যদের এই দৌড়ঝাঁপ ওই এলাকার প্রায় অধিকাংশ গ্রামের প্রতিটি ঘরের কাহিনি ৷ কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, যে শ্মশানের কোনও বৈধতা নেই, সেই শ্মশানে পৌঁছতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পথশ্রী-রাস্তাশ্রী প্রকল্পের অধীনে পাকা সড়ক তৈরির কাজ শুরু হয়েছে ৷ আর সেই কাজের সূচনা করেছেন স্বয়ং কাঁকসার বিডিও সৌরভ গুপ্ত এবং পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ নবকুমার সামন্ত ৷

বিদবিহার গ্রাম পঞ্চায়েতের কৃষ্ণপুর বাগান থেকে অজয়ের ওই অস্থায়ী শ্মশান পর্যন্ত রাস্তার কাজের সূচনা করেন তাঁরা ৷ কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যে শ্মশানের কোনও সরকারি স্বীকৃতি নেই, সেখানে সরকারি প্রকল্পের আওতায় কীভাবে রাস্তা তৈরির কাজ হচ্ছে ? তাও আবার বিডিও-র উপস্থিতিতে ৷

এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিডিও জানালেন, তিনি গ্রামবাসীদের দাবিতে এই রাস্তা অনুমোদন করিয়েছেন ৷ কিন্তু, অস্থায়ী শ্মশানের বিষয়ে তিনি জানতেন না ৷ তাঁর কথায়, "এই সমস্যার কথা এখানে এসে প্রথম শুনলাম ৷ অস্থায়ী শ্মশানের কোনও লিখিত অনুমোদন আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে ৷ আর এখানে হয়তো শংসাপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা নেই, তাই ওপারে যেতে হয় ৷ এখানে এসেও দেখলাম, নদীর ওপারে একটা শ্মশান আছে ৷ তাই হয়তো দীর্ঘদিনের ব্যবস্থা মতো এপারেই দেহ সৎকার করে শংসাপত্র নিতে ওপারে যান লোকজন ৷ তবে, এখানে যেহেতু দেহ সৎকার হয়, তাই এই এলাকাতেই শ্মশানের শংসাপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটা দেখব ৷ তবে, বৈধতার বিষয়টি খতিয়ে না-দেখে বলতে পারব না ৷"

পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ নবকুমার সামন্তের বক্তব্য, "এই রাস্তা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, তাই কাজ শুরু হয়েছে ৷ শ্মশানের শংসাপত্র সংক্রান্ত যে সমস্যা রয়েছে, তা সমাধানের চেষ্টা চলছে ৷" তবে, পুরো বিষয়টিকেই প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলে সমালোচনা করেছেন দুর্গাপুর পশ্চিম বিধানসভার বিধায়ক লক্ষ্মণ ঘড়ুই ৷ তিনি বলেন, "এটা চূড়ান্ত প্রশাসনিক ব্যর্থতা ৷ এখানে শ্মশানে গিয়েও মানুষ শান্তি পায় না ৷" তবে প্রশ্ন উঠছে, যেখানে জীবনের শেষ ঠিকানাটুকুতেই অনিশ্চয়তা, সেখানে উন্নয়নের রাস্তা কতটা কাজে আসবে ? যার জবাব সময় দেবে ৷