SIR এর কাজে ব্যস্ত বিচারকরা ! ফাঁকা আদালতে ভোগান্তি, বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘশ্বাস
এসআইআর-এর কাজ কতদিন চলবে, কবে আবার আদালতের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরবে ? সেই উত্তরই খুঁজছেন সাধারণ মানুষ ।

Published : February 26, 2026 at 5:07 PM IST
বর্ধমান/হুগলি/জলপাইগুড়ি, 26 ফেব্রুয়ারি : ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ অভিযান (এসআইআর) ঘিরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মাঠে নামতে হয়েছে একাধিক বিচারককে । তার জেরে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা আদালতে কার্যত কাজের গতি শ্লথ । হুগলির চুঁচুড়া থেকে পূর্ব বর্ধমান, এমনকি উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়িতেও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির ছবিটা প্রায় একই ।
বিচারকের অভাবে সমস্যা বর্ধমান জেলা আদালতে
পূর্ব বর্ধমান জেলায় আছে মোট 16টি বিধানসভা কেন্দ্র । জেলায় মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল 41 লক্ষ 78 হাজার 695 জন । বিভিন্ন কারণে নাম বাদ পড়েছে দু লক্ষ আট হাজার পঁচাত্তর জনের । এছাড়া নো-ম্যাপিং ভোটার ছিলেন এক লক্ষের বেশি । এসআইআরের জেরে প্রায় পাঁচ লক্ষ ভোটারকে শুনানির জন্য নোটিস পাঠানো হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। প্রয়োজনীয় 13টি নথির একটিও জমা দিতে না পারায় প্রায় 70 হাজার ভোটার অযোগ্যদের তালিকায় চলে গিয়েছেন ।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে বর্ধমান জেলা আদালতের বিচারকেরাও এসআইআর এর কাজে যুক্ত হয়েছেন । জেলা জজ ছাড়াও পাঁচ জন অতিরিক্ত জেলা বিচারক (এডিজে) এবং সমমর্যাদার তিন জন বিচারক নথি যাচাই করছেন । এক একজন বিচারক দু’ থেকে তিনটি বিধানসভার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন । ফলে আদালতের স্বাভাবিক বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে বলেই অভিযোগ আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের একাংশের ।
জেলা আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন বহু মানুষ বিচার পেতে আদালতে আসেন । কিন্তু বিচারক অনুপস্থিত থাকায় দিনের পর দিন ফিরে যেতে হচ্ছে তাঁদের । রায়না এলাকা থেকে আসা এক বিচারপ্রার্থী আমিনা বেগম (নাম পরিবর্তিত) বলেন, " দু'-তিন দিন ধরে ঘুরছি । বিচারক নেই । খুব সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ।"
বর্ধমান বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সদন তা বলেন, " এসআইআরের কাজে একসঙ্গে এতজন বিচারক যুক্ত হওয়ায় স্বাভাবিক বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে । দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে সময় নষ্ট করে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন । এতে তাঁদের আর্থিক ও মানসিক দুই দিকেই ক্ষতি হচ্ছে ।"
বর্ধমানের মতোই তথৈবচ হাল চুঁচুড়া আদালতেও
একই চিত্র হুগলির চুঁচুড়া আদালতেও । জেলা জজ-সহ অতিরিক্ত জেলা বিচারকেরা এসআইআরের কাজে নিযুক্ত থাকায় বহু কোর্টরুমে কাজ বন্ধ । সিজেএম ও থার্ড কোর্টে বিচারক থাকলেও বাকি আদালতগুলিতে শুনানি হচ্ছে না বলে অভিযোগ । চুঁচুড়া আদালতে কাজে আসা সুজিত কুমার ঘোষ বলেন, " সেকেন্ড কোর্টে আমার কাজ ছিল । বিচারক না আসায় অন্য কোর্টে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হল । সারাদিন লেগে গেল ।"
রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তরজা। চুচুঁড়া আদালতের বিজেপি-ঘনিষ্ঠ আইনজীবী স্বপন পাল বলেন, " সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ একদম সঠিক । আরও আগে হলে ভাল হত । ভোটার তালিকায় ভুয়ো নাম ঢোকানোর চেষ্টা বন্ধ হবে ।" অন্যদিকে তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ আইনজীবী নির্মাল্য চক্রবর্তী বলেন, " আদালতের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে ঠিকই, তবে বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ । স্বচ্ছতার দাবিতে এই পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল ।" আইনজীবী শুভদীপ দাসের কথায়, " এমনিতেই বিচারক কম । তার উপর এসআইআরের কাজে বিচারকেরা চলে যাওয়ায় বিচারপ্রার্থীরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন ।"
50 হাজার মামলা ঝুলে, ক্ষুব্ধ দুর্গাপুরের আইনজীবীরা
একই ছবি দুর্গাপুর মহকুমা আদালতেও ৷ বিচারক সংকটের জেরে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, SIR সংক্রান্ত কাজে দুর্গাপুর মহকুমা আদালতের মোট 11টি এজলাসের মধ্যে পাঁচটি এজলাসের পাঁচজন বিচারককে নিযুক্ত করা হয়েছে । ফলে আদালতের নিয়মিত বিচারপ্রক্রিয়া থমকে যাওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন কয়েক হাজার বিচারপ্রার্থী এবং প্রায় 1400 আইনজীবী।
আদালত সূত্রে খবর, বর্তমানে প্রায় 50 হাজার মামলা ঝুলে রয়েছে । বিচারক না থাকায় বৃহস্পতিবার আদালতে এসে চরম হতাশা প্রকাশ করেন দুর্গাপুরের সগরভাঙার বিশেষভাবে সক্ষম সুভাষ বন্দ্যোপাধ্যায়৷ তিনি বলেন, " 2008 সালে ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিলাম । যার জেরে আমার দেহের 85 শতাংশ অঙ্গে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে ৷ বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা, স্ত্রী ৷ ক্ষতিপূরণের দাবিতে আদালতে মামলা করেছিলাম । 8 বছর ধরে বিচারের আশায় আদালতের দরজায় কড়া নাড়লেও এখনও পর্যন্ত সুবিচার পাইনি ।" বৃহস্পতিবার এজলাসে বিচারককে দেখতে না পেয়ে ভেঙে পড়েন তিনি ।
শুধু বিচারপ্রার্থীরাই নন, বিচারকদের অনুপস্থিতিতে সংকটে পড়েছেন আইনজীবীরাও । দুর্গাপুর মহকুমা আদালতের বিশিষ্ট আইনজীবী সঞ্জীব কুণ্ডু বলেন,"বিজেপির কথায় চলা নির্বাচন কমিশন এসআইআর প্রক্রিয়াকে প্রহসনে পরিণত করেছিল ৷ ওরা যেভাবে পক্ষপাতিত্ব করছিল তাতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এবং মহামান্য কলকাতা হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি ছিল । তবে একথাও ঠিক যে বিচারকদেরকে তুলে নেওয়ার কারণে দুর্গাপুর মহকুমা আদালতের বিচারপ্রার্থীরা এবং 1400 জন আইনজীবী এবং তাদের পরিবার বিপাকে পড়েছে । বিশেষ করে যে সকল মহিলারা মেনটেনেন্স এর মামলা করেছেন তাদের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে গেছে। "
দুর্গাপুর মহকুমা আদালতের বর্ষীয়ান আইনজীবী আয়ুব আনসারি এই পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "এমনিতেই আদালতে পাহাড়প্রমাণ মামলা জমে রয়েছে ৷ তার ওপর এসআইআর এর জেরে বিচারকরা ব্যস্ত হয়ে পড়ায় মানুষ আদালতে এসেও বিচার পাচ্ছেন না ৷ এদিকে আদালতের কাজ বন্ধ থাকায় আইনজীবীদের উপার্জনে টান পড়ছে ।"
আইনজীবী অন্তিমা কুমারীর মতে, " আদালতের সমস্ত কাজ বর্তমানে স্তব্ধ ৷ ফলে সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে । আমরা যাঁরা জুনিয়র আইনজীবী, তাঁরা রোজগার হারিয়েছি । যা শুনতে পাচ্ছি তাতে আগামী মাসের 10 তারিখ পর্যন্ত এইরকম অবস্থায় চলবে আদালতের ।"
একই হাল উত্তরবঙ্গেও
জলপাইগুড়ি জেলায় এসআইআরের কাজ তদারকিতে জেলা বিচারক প্রথমে বিডিও অফিসে বসেন । বুধবার থেকে সার্কিট হাউসে ক্যাম্প করে নথি যাচাই শুরু করেছেন তিনি । বিডিও অফিস থেকে ফাইল নিয়ে সার্কিট হাউসে পৌঁছে দিচ্ছেন আধিকারিকেরা । ফলে কোর্টে গিয়েও ফিরে যেতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের ৷ যদিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ অতিরিক্ত জেলাশাসক (সাধারণ), সদর মহকুমা শাসক ও সদর বিডিও-সহ প্রশাসনিক কর্তারা ।
সব মিলিয়ে জেলায় জেলায় আদালত চত্বরে এখন হাহাকারের ছবি । একদিকে জমে থাকা মামলার পাহাড়, অন্যদিকে বিচারকের অভাব—এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট জেলার বিচারব্যবস্থা । এসআইআর এর কাজ কতদিন চলবে, কবে আবার আদালতের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরবে— সেই উত্তরই খুঁজছেন সাধারণ মানুষ ।

