জর্দা নদীর চরে যথেচ্ছ বালি-পাথর উত্তোলন ! অস্তিত্ব সংকটে 501 বছরের জল্পেশ মন্দিরের
সময় থাকতে ব্যবস্থা না-নিলে, ধসে যেতে পারে জল্পেশের গর্ভগৃহ ! সরকার নির্ধারিত মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও কেন তোলা হচ্ছে বালি, প্রশ্ন মন্দির কর্তৃপক্ষের ৷

Published : February 27, 2026 at 2:52 PM IST
অভিজিৎ বোস
জলপাইগুড়ি, 27 ফেব্রুয়ারি: উত্তর-পূর্ব ভারতের বিখ্যাত শৈব-তীর্থে ভূমিধসের আশঙ্কা ! তার জেরে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে 501 বছরের পুরনো জল্পেশ মন্দির ৷ নেপথ্যে শিবমন্দির সংলগ্ন জর্দা নদী থেকে অবৈধভাবে বালি ও পাথর উত্তোলনের অভিযোগ ৷ এর ফলে ভবিষ্যতে জর্দা নদী সংলগ্ন মন্দির ভূমিধসের কবলে পড়তে পারে, এমনটাই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা ৷ নদী থেকে অবিলম্বে বালি ও পাথর তোলা বন্ধ না-হলে, ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না জল্পেশ মন্দির কমিটি এবং ময়নাগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতিও ৷
জল্পেশ মন্দির থেকে জর্দা নদীর দূরত্ব কয়েকশো মিটার ৷ জল্পেশ মন্দির সংলগ্ন জর্দা নদী থেকে অবৈজ্ঞানিক ভাবে বালি উত্তোলনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের ৷ বালি তোলার ফলে জর্দা নদীর গতিপথ যেমন পরিবর্তন হচ্ছে, পাশাপাশি নদীখাতের পরিবর্তন হয়েছে বলে অভিযোগ ৷ এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে জর্দা নদীতে ভূমিধসের ফলে জল্পেশ মন্দিরের ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে ৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, জল্পেশের গর্ভগৃহকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে জর্দা নদী থেকে বালি তোলা বন্ধ করতে হবে ৷ পাশাপাশি ওই অঞ্চলের মাটির নীচের অংশের পরিস্থিতি পরীক্ষা করার দাবিও তোলা হয়েছে ৷
উল্লেখ্য, শিবমন্দিরের পাশেই বিখ্যাত জল্পেশ মেলার মাঠ রয়েছে ৷ আর তার সংলগ্ন এলাকায় সরকারিভাবে আটটি বালির বেড ছিল ৷ কিছুদিন আগে বেডগুলির মেয়াদ পেরিয়ে গেছে ৷ অভিযোগ, মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সেখান থেকে বালি উত্তোলন চলছে ৷ এই অবৈজ্ঞানিকভাবে বালি উত্তোলনের ফলে জর্দা নদী ও তার আশেপাশের এলাকার ভূর্গভের মাটির আলগা হয়ে যাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা ৷
এর প্রভাব অনেক আগেই টের পেয়েছিল উত্তরবঙ্গবাসী ৷ যথেচ্ছভাবে বালি তোলার ফলে দশ বছর আগে বালি-পাথরের খাত হঠাৎ বসে গিয়ে জলপ্রপাত তৈরি হয় ৷ যা সাধারণত মালভূমি অঞ্চলের নদীতে দেখা যায় ৷ কিন্তু, উত্তরবঙ্গে এই ঘটনা ছিল বিরল ৷ ভূ-বিদ্যার গবেষকদের বক্তব্য ছিল, সাধারণত যথেচ্ছভাবে বালি-পাথর উত্তোলনে, জলস্তর নেমে যাওয়া-সহ প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে নদী বক্ষ ও পাশ্ববর্তী অংশ বসে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে ৷
জল্পেশ মন্দিরের ইতিহাস
কথিত আছে, কোচ বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা বিশ্ব সিং 1524 সালে জল্পেশ শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ৷ পরবর্তীতে কোচবিহারের মহারাজা প্রাণ নারায়ণ রায় জল্পেশ মন্দিরের পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন (1632-1665) ৷ তিনি দিল্লি থেকে স্থপতি নিয়ে এসে জল্পেশ মন্দির পুনর্নির্মাণের কাজ করান ৷ তবে, কাজ শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই প্রাণ নারায়ণ রায়ের মৃত্যুর পর, তাঁর পুত্র মহারাজা মোদ নারায়ণ রায় জল্পেশ মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ করান ৷

1775 সাল থেকে 1865 সাল পর্যন্ত ডুয়ার্স অঞ্চল ভুটানের রাজার দখলে ছিল ৷ ময়নাগুড়ি, কোচবিহার, বৈকুণ্ঠপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করেছিলেন ভুটানের রাজা ৷ 1867 সালে ডুয়ার্স ব্রিটিশদের দখলে আসে ৷ 1894 সালের 4 জুন ব্রিটিশ সরকার জল্পেশ মন্দির পরিচালনা করার জন্য একটি সার্কুলার জারি করে ৷ জল্পেশ মন্দির পরিচালনার জন্য 'জল্পেশ টেম্পল কমিটি' গঠন করা হয় ৷ আজও ব্রিটিশদের তৈরি সেই বোর্ড বা কমিটি জল্পেশ মন্দিরের উন্নয়ন ও সংস্কারের কাজ পরিচালনা করে আসছে ৷ 1897 সালের জুন মাসে ভূমিকম্পের ফলে জল্পেশ মন্দিরের উপরের 52 ফুট অংশ ধ্বংস হয়ে যায় ৷ পরবর্তীতে জল্পেশ মন্দির কমিটি সেই ভেঙে যাওয়া অংশ সংস্কার করায় ৷
জল্পেশ মন্দিরের অবস্থান ও মেলা
জল্পেশ মন্দিরটি উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম বিখ্যাত শৈব তীর্থ ৷ ময়নাগুড়ি শহর থেকে 8 কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মন্দির ৷ মন্দিরের আগে জর্দা সেতুর পাশেই জল্পেশ মেলার মাঠ অবস্থিত ৷ শিব চতুর্দশীতে জলপাইগুড়ি জেলাপরিষদের পক্ষ থেকে বিরাট মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে । হাজার হাজার দোকানি পসরা সাজিয়ে বসেন । পাশাপাশি শ্রাবণ মাসে শ্রাবণী মেলায় উত্তর-পূর্ব ভারতের এই বিখ্যাত শৈব তীর্থে জল ঢালতে নেপাল, ভুটান ছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে পুণ্যার্থীরা আসেন ৷

জল্পেশ মন্দিরটি প্রায় এক একর জমির উপরে তৈরি ৷ আর এই মন্দিরের উচ্চতা 127 ফুট ৷ জল্পেশ মন্দিরের দৈর্ঘ্য 124 ফুট এবং প্রস্থে 120 ফুট ৷ আর মন্দিরের গর্ভগৃহ রয়েছে 12 ফুট নীচে ৷ প্রতিবছর কয়েক লক্ষ পুণ্যার্থী শ্রাবণ মাসে এই মন্দিরে আসেন পুজো দিতে ৷ সবমিলিয়ে উত্তরবঙ্গের জল্পেশ মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে যথেষ্টই ৷
মন্দিরের অস্তিত্ব সংকটে !
জল্পেশ মন্দির ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক গিরিন্দ্রনাথ দেব বলেন, "জর্দা নদী থেকে অবিলম্বে বালি ও পাথর তোলা বন্ধ করতে হবে ৷ ভূমি ধসের একটা আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে ৷ আমরা জল্পেশ মন্দির নিয়ে চিন্তিত ৷ এর আগেও প্রশাসনকে আমরা বিষয়টি জানিয়েছি ৷ আবারও আমরা প্রশাসনকে বিষয়টি জানাব ৷ অবিলম্বে জল্পেশ মন্দির সংলগ্ন জর্দা নদীর ঘাটগুলি থেকে বালি তোলা বন্ধ করতে হবে ৷"

জল্পেশ নাগরিক কমিটির সম্পাদক রজনীকান্ত রায় বলেন, "জর্দা নদীতে যেভাবে বালি কাটা হচ্ছে, তাতে অনেক নিচু হয়ে যাচ্ছে ৷ যদি সরকার পদক্ষেপ না-করে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে জল্পেশ মেলার আয়তনও ছোট হয়ে যাবে ৷ নদী থেকে বালি তুলে বিক্রি করে রোজগার করে ৷ এতে আগামীতে জল্পেশ মন্দিরের নীচের মাটি ধসে যেতে পারে ৷"
ময়নাগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কুমুদ রায় বলেন, "উত্তর-পূর্ব ভারতের বিখ্যাত শৈব তীর্থ জল্পেশ মন্দির ৷ মুখ্যমন্ত্রী জল্পেশের উন্নয়নের অনেক কাজ করেছেন ৷ জল্পেশ মন্দিরে যাওয়ার জন্য দু’টি সেতু তৈরি করা হয়েছে ৷ আমরা ভূমিধসের আশঙ্কা করছি ৷ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি ৷ জল্পেশ নদী সংলগ্ন জর্দা নদী থেকে বালি তোলার ফলে ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে ৷ জর্দা নদী তার স্বাভাবিকতা হারিয়েছে ৷ খাদ তৈরি হয়ে গেছে ৷ যার ফলে ভবিষ্যতে ভূমিধস এবং জল্পেশ শৈবতীর্থে একটা ফাটলের সম্ভাবনা রয়েছে ৷ তাই অবিলম্বে খনন কাজ বন্ধ করার জন্য কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে ৷ বর্ষার পরে আশা করি সেই প্রক্রিয়া শুরু হবে ৷"

এ নিয়ে জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদের সভাধিপতি কৃষ্ণা রায় বর্মন দাবি করেন, "এই বিষয়টি ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে গিয়ে দেখাতে হবে ৷ সবাই তো আর সব কিছু জানে না ৷ যদি ভূমিধসের বিষয়টি থেকে থাকে, তাহলে এর মোকাবিলা আমাদের করতে হবে ৷ আমরা এই ঐতিহ্যবাহী জল্পেশ মেলা ও ঐতিহ্যবাহী মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ জেলা পরিষদের থেকে করছি এবং আগামীতেও করব ৷"
ধসের আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
এ নিয়ে প্রসন্নদেব মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক রঞ্জিত সিং আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, "যথেচ্ছভাবে বালি তোলার কারণে ভূমিধসের ঘটনা প্রায় জায়গাতেই হয় ৷ রিভার বেড থেকে বালি পাথর তোলার ফলে নদীর গতিপথ পালটে যায় ৷ দুই পাশে পাড়গুলোতে চাপ পড়ে ৷ এর ফলে নদীর দুই পাড়ে ধস নামে ৷ জল্পেশে যে সেতু আছে, সেই সেতুর সঙ্গেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে ৷"

এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক বলেন, "সেতুর আশেপাশে বালি তোলার ফলে, তার উপর প্রেশার তৈরি হয় ৷ জল্পেশের ক্ষেত্রে একাধিক ঘটনা ঘটতে পারে ৷ ধস নামলে পারিপার্শ্বিক কৃষি জমি শেষ হয়ে যাবে ৷" এর থেকে বাঁচতে বেশ কিছু উপায়ের কথাও বলেন তিনি ৷ তাঁর কথায়, "প্রথমত সচেতন হতে হবে ৷ বালি ও পাথর তোলার বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে করতে হবে ৷ সরকারকে আরও সচেতন হতে হবে, যাতে নদীর গতিপথ বদলে বা নীচের অংশ ধসে গিয়ে মন্দিরের কোনও ক্ষতি না-হয় ৷ প্রশাসনের তরফ থেকে মন্দির সংলগ্ন স্থানে নদীতে বাঁধ দেওয়া দরকার ৷ মন্দির বাঁচাতে হলে সরকারকে অনেক কঠোর পদক্ষেপ করতে হবে ৷"
যদিও এ নিয়ে জলপাইগুড়ির জেলাশাসক শামা পারভিনের দাবি, "জল্পেশ মন্দিরে ভূমিধসের কোনও থ্রেট আমরা পাইনি ৷ যদি এমনটা হয়, তাহলে আমরা সংশ্লিষ্ট দফতরকে দিয়ে তদন্ত করে দেখব ৷" কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে বেআইনি এই বালি উত্তোলন কীভাবে সম্ভব, তার কোনও সদুত্তর মেলেনি ৷

