'শিক্ষক-নিগ্রহ' কাণ্ডের পর সুরক্ষায় জোর, পুরনো নির্দেশিকা ফের জারি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের
সন্ধ্যা সাতটা থেকে সকাল সাতটার মধ্যে কোনও কারণে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে হলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত বৈধ পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে, প্রয়োজনে গেটে তা দেখাতে হবে।

Published : February 24, 2026 at 2:09 PM IST
কলকাতা, 24 ফেব্রুয়ারি: পুরনো নির্দেশিকা আরও একবার জারি করা হল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে । ব়্যাগিং-এর ঘটনার পরেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা নিয়ে বেশ কিছু নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল । সেই নির্দেশিকা সাম্প্রতিক 'শিক্ষক-নিগ্রহ'-এর ঘটনার প্রেক্ষিতে আরও একবার জারি করল কর্তৃপক্ষ ।
সেখানে বলা হয়েছে, সন্ধ্যা সাতটা থেকে সকাল সাতটার মধ্যে কাউকে কোনও কারণে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে হলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত বৈধ পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে গেটে তা দেখাতে হবে । আর যাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র নেই, তাঁদের অন্য কোনও বৈধ পরিচয়পত্র দেখাতে হবে এবং যাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন তাঁর নাম ও যোগাযোগ নম্বর-সহ প্রয়োজনীয় তথ্য গেটের রেজিস্টারে নথিভুক্ত করতে হবে ।
ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দুই চাকা বা চার চাকার যানবাহন প্রবেশের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত পার্কিং স্টিকার গাড়িতে স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক । স্টিকারবিহীন যানবাহনের ক্ষেত্রে প্রবেশের আগে গেটে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর জমা দিতে হবে । নিরাপত্তারক্ষীরা এ ধরনের সমস্ত গাড়ির তথ্য সংরক্ষণ করবেন । প্রয়োজনে চালক বা যাত্রীদের বৈধ পরিচয়পত্র দেখাতে হবে ।
ক্যাম্পাসের কোনও অংশে মাদকদ্রব্য, মদ্যপান বা অন্য কোনও বেআইনি বস্তু ব্যবহার এবং যে কোনও বেআইনি কার্যকলাপ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ । এই নির্দেশ লঙ্ঘন করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নির্দেশিকায় বলা হয়েছে । অনধিকার প্রবেশ, সকাল বা সন্ধ্যায় হাঁটাচলা করা, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরকে সাধারণ পথ হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ । রাত আটটার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে (যেমন - মাঠ, ক্যান্টিন এলাকা, সুবর্ণ জয়ন্তী ভবনের সামনে ইত্যাদি) ধরনের জমায়েত করা যাবে না, শুধুমাত্র সান্ধ্যকালীন শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয় ।
বিশেষ অনুষ্ঠান বা উৎসবের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই নিয়ম শিথিল করা যেতে পারে, তবে যতটা সম্ভব রাত ন'টার মধ্যেই তা শেষ করতে হবে । কোনও ব্যক্তি বৈধ কারণ ছাড়া ক্যাম্পাসে অবস্থান করলে বা রাত আটটার পর অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পাসে থাকলে, তাঁকে অনধিকারপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে । প্রবেশ ও প্রস্থানের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিরাপত্তাকর্মী ও নাইট ইনচার্জের উপর ন্যস্ত থাকবে । রাত আটটার পর প্রবেশের অনুমতি দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে । এ সংক্রান্ত কোনও অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে রেজিস্ট্রারের কাছে জানাতে হবে।
নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কোনও ধরনের অসদাচরণ, ভয় দেখানো বা অসম্মানজনক আচরণ করলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে ।
উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে দেখা গিয়েছিল দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ধস্তাধস্তির ছবি । সেখানে আহত হয়েছিলেন দুই অধ্যাপক । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন জুটার তরফে অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের ও বাইরের একটা অংশ সমাজের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়কে কালিমালিপ্ত করার কাজে লেগেছে । শুধু তাই নয়, ক্যাম্পাসের মধ্যে রাতে মদ-গাঁজা খাওয়ায় নিরাপত্তারক্ষীরা বাধা দিলে ছাত্রদেরই একটা অংশ বহিরাগতদের নিয়ে তাঁদেরকে আটকে রেখে হেনস্তা করে বলে অভিযোগ উঠেছে ক'দিন আগেই ।
শিক্ষক সংগঠনের জুটার পার্থপ্রতিম রায় বলেন, "দু'দল ছাত্রের মধ্যে ঝামেলার খবর পেয়ে আমরা প্রায় 12-15 জন শিক্ষক উপস্থিত হয়ে দুটি দলের লোকেদের দু'দিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি, যাতে কোনও মারামারির ঘটনা না-ঘটে । প্রাথমিকভাবে তাতে আমরা সমর্থও হই ৷ উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয় । কিন্তু তাতে সম্ভবত কেউ কেউ অখুশি হচ্ছিলেন, ছাত্রদের মারামারি চলতে থাকলে বোধ হয় তাঁদের ভালো লাগত ।"
তিনি আরও বলেন, "তাঁদেরই মধ্যে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি শুরু করে - এমনকি যে সব শিক্ষক মাঝে দাঁড়িয়ে ঝামেলা সামলাচ্ছিলেন, তাঁদেরকেও তাঁরা অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করা শুরু করেন ও প্রতিপক্ষের পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে দেন । এই অবস্থায় আবারও উত্তেজনা বাড়ে এবং আরও কিছু ছাত্র ও অছাত্র ঝামেলায় যোগ দিয়ে পুনরায় মারামারি শুরু করে দেয় । আমরা সেই অবস্থায় দাঁড়িয়েও চরম শারীরিক হেনস্তা উপেক্ষা করে তাঁদের থামানোর চেষ্টা করি । এই সময় হঠাৎ করে তৃতীয় একটি পক্ষের 4-5 জন ছাত্র-অছাত্র আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরই অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে হাজির হয় সেখানে, এবং অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমেই থিতিয়ে আসা মারামারির মধ্যে ঢুকে পড়ে ।"
সেখানেই একজন সরাসরি অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিন্হার মুখে উপর্যুপরি ঘুষি মারে বলে অভিযোগ । পার্থ প্রতিম রায়ের কথায়, "রাজ্যেশ্বর মাটিতে পড়ে যান । তার চশমা ভেঙে যায় । আর একজন আঘাত করে অধ্যাপক ললিতকে । যে ছেলেটি রাজ্যেশ্বরকে মারে, তাকে আমরা ধরে ফেলি । কিন্তু যে ছাত্র/অছাত্ররা ওই ছেলেটিকে এনেছিল, তারা তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বের করে দেয় । এর পরেই দেখা যায় যে, হস্টেল থেকে ছাত্রদের ডেকে নিয়ে আসা হচ্ছে এবং তার পরেই ঘটনা আয়ত্তের বাইরে চলে যায় ।"
এই ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানিয়ে, তাঁরা সোমবার উপাচার্যকে একটি ডেপুটেশন জমা দেন বলে জানিয়েছেন জুটার সাধারণ সম্পাদক ৷ তিনি বলেন, যদি মঙ্গলবারের মধ্যে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া না-হয়, তাহলে বৃহস্পতিবার তাঁরা কর্মবিরতি করবেন, শুক্রবার মিছিল করবেন এবং আগামী সোমবার থেকে প্রশাসনিক কোনও কাজে সহযোগিতা করবেন না ৷

