ফের মাকালু অভিযানে পিয়ালী, শীতে প্রথম মহিলা হিসেবে নজির গড়াই লক্ষ্য
11 ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক পর্বত দিবস৷ সেদিনই নতুন অভিযানের ঘোষণা করলেন এভারেস্ট-লোৎসে-সহ একাধিক শৃঙ্গজয়ী পিয়ালী বসাক৷

Published : December 11, 2025 at 9:40 PM IST
|Updated : December 11, 2025 at 10:50 PM IST
চন্দননগর (হুগলি), 11 ডিসেম্বর: বিশ্ব পর্বত দিবস আজ, বৃহস্পতিবার৷ আর সেই গুরুত্বপূর্ণ দিনেই পর্বারোহণ সংক্রান্ত নতুন স্বপ্নের কথা শোনালেন পিয়ালী বসাক৷ হুগলির চন্দনগরের বাসিন্দা এই পর্বতারোহী জানালেন, ফের তিনি মাকালু জয়ের স্বপ্ন নিয়ে অভিযানে বের হতে চলেছেন৷
পিয়ালী বসাক জানান, আগামী 15 ডিসেম্বর শুরু হবে তাঁর অভিযান৷ ওইদিন তিনি চন্দনগরের বাড়ি থেকে রওনা দেবেন মাকালু বেসক্যাম্পের উদ্দেশে৷ তাঁর লক্ষ্য প্রথম মহিলা হিসেবে শীতকালে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্য়েও মাকালু জয়৷
এর আগেই একবার মাকালু জয় করেছেন পিয়ালী বসাক৷ 2023 সালে 17 মে তিনি সেই অভিযান করেছিলেন৷ শীতে আবহাওয়া যেমন প্রতিকূল থাকে, সেই সময় পরিস্থিতি তেমন ছিল না৷ তাই এবার শীতকালেই তিনি রওনা হচ্ছেন মাকালুর উদ্দেশে৷ এই অভিযান চলবে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষপর্যন্ত৷
পিয়ালী বসাকের কথায়, ‘‘গরমে মাকালুর বেস ক্যাম্পে কিছু গ্রামের মানুষকে পেয়েছিলাম। শীতকালীন এই সময়ে সকলেই নিচে নেমে আসেন। বেস ক্যাম্প পৌঁছাতেই কোমর সমান বরফ হয়ে যাবে। সেটাতেও অনেক কষ্ট করতে হবে। কঠিন বরফের দেওয়াল ও পাথরের দেওয়াল রয়েছে। মাঝে মাঝেই ফাটল থাকে। ঝড় ও কুয়াশা এলে এক ফুট দূর পর্যন্ত দেখা যায় না। পায়ের আঙুল ও লোহার কাঁটার জোরে আমাদের উঠতে হয় পর্বতে। পিঠে 14 থেকে 15 কিলো ওজনের ভারী ব্যাগ থাকে। ট্রেকিং করতে 25 কিলো ওজনের ব্যাগ রাখতে হয়।’’
মাকালু পর্বতের উচ্চতা আট হাজারের মিটারের বেশি৷ সেই শৃঙ্গ-সহ ছ’টি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় করেছেন হুগলির কানাইলাল বিদ্যামন্দিরের শিক্ষিকা পিয়ালী বসাক৷ তার মধ্যে অন্যতম এভারেস্ট, লোৎসে, ধওলাগিরি ও অন্নপূর্ণা৷ বারবার প্রতিকূল ও বিপদসঙ্কুল পরিবেশে যেতে কি ভয় লাগে না? পিয়ালীর উত্তর, ‘‘পর্বতারোহণে একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পদে পদে বিপদ থাকে পাহাড়ে।’’

ফলে বোঝাই যাচ্ছে, কী পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে, তা নিয়ে পিয়ালি ভাবছেনই না৷ বরং অবলীলায় বলে দিচ্ছেন যে সেখানে এখন আবহাওয়া কেমন হতে পারে৷ এই পর্বতারোহীর কথায়, শীতকালে তুষারঝড় হয়৷ আবহাওয়াও প্রতিকূল থাকে। আবহাওয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী মাইনাস 70 ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকবে সেই সময়। প্রতি ঘণ্টায় 130 কিলোমিটার গতিবেগে হাওয়া চলবে।

তা সত্ত্বেও তাঁর মাথায় এখন একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে৷ তা হল, কোনও মহিলা এখনও শীতকালীন সময়ে মাকালু অভিযান করেননি। তিনি বলেন, ‘‘সারা পৃথিবী থেকে দু’জন পুরুষ, একজন ইতালি ও আর একজন রাশিয়ার পর্বতারোহী এই এই সময় মাকালু শৃঙ্গ জয় করেছেন। তাঁরা দুজনেই পৃথিবী বিখ্যাত পর্বতারোহী। তাই আমিও চাই মহিলা পর্বতারোহী হয়ে ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করার। আমার ইতিমধ্যেই এভারেস্ট, লোৎসে সবই 29 হাজার ফুটের ঊর্ধ্বে এবং সেগুলো তুষারঝড়ের মধ্যেই আমি অভিযান করে সফল হয়েছি।’’

পিয়ালী আরও বলেন, ‘‘পাহাড়ে একটা সময় ভালো আবহাওয়া পাওয়া যায়। তার মধ্যেই সামিট করে নেমে আসতে হয়। কিন্তু এর আগেও তুষার ঝড় ও প্রতিকূল আবহাওয়াতে অভিযান করে নেমে এসেছি। দু’টো পর্বত শৃঙ্গ প্রতিকূল আবহাওয়ায় বেঁচে ফিরেছি। আশা করি এই অভিজ্ঞতা জোরেই এই শীতকালীন মাকালু পর্বত শৃঙ্গ জয় করতে পারব।’’

যদিও পর্বতারোহণে তাঁকে যতটা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়, তার থেকেই বেশি সমস্যায় পড়তে হয় সমতলে৷ চন্দননগরের বাড়িতে তিনি একাই থাকেন৷ বোন তমালি বসাক কর্মসূত্রে থাকেন হায়দরাবাদে৷ কয়েকবছর আগে মা-বাবাকে হারিয়েছেন৷ আপাতত স্কুল আর পরবর্তী অভিযানের প্রস্তুতিতেই দিন কাটে তাঁর৷ যদিও প্রস্তুতির একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে অভিযানের খরচ জোগাড়ের বিষয়টি৷

এর আগের ছ’টি অভিযানের খরচ তিনি ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে করেছিলেন৷ সেই ঋণের ভারে তিনি জর্জরিত৷ পিয়ালী বলেন, ‘‘এর আগেও আমার 25 লক্ষ টাকা ঋণ রয়েছে ব্যাংকে। তার মধ্যেও মানুষের সহযোগিতায় আমি একাধিক পর্বত জয় করেছি। বর্তমানে এই মাকালু জয়ের জন্য আমার বাড়ি বন্ধক দিয়ে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় স্পনসরের জন্য যোগাযোগ করছি। আর প্রথম থেকেই মানুষ আমার পাশে আছেন। আশা করি এই পর্বত শৃঙ্গ জয়ে মানুষই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন।’’

তিনি অন্য খেলাধূলার কথা উল্লেখ করেন৷ সেখানে যেমন স্পনসর মেলে, পর্বতারোহণের ক্ষেত্রেও তেমন হলে ভালো হয় বলেই মত পিয়ালীর৷ তিনি বলেন, ‘‘ক্রিকেট খেলায় রাজ্য-কেন্দ্র সরকার এবং বিভিন্ন স্পনসর সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে সদর্থক ভূমিকা দেখা যায় না সরকারের। বিদেশে পর্বতারোহণে অনেক সুযোগ-সুবিধা থাকে। যদি সরকার এগিয়ে আসে, তাহলে আমাদের মতো পর্বতারোহীদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সুবিধা হবে। দেশেরও সুনাম বাড়বে। এর আগেও আমার স্বপ্নকে সার্থক হয়েছে সম্পূর্ণ সাধারণ মানুষের সহযোগিতার জন্য।’’

শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, পিয়ালী এমন একটা চাকরি করতে চান, যেখানে পেশা ও পর্বতারোহণের নেশা, দু’টোকেই সমানভাবে বজায় রাখতে পারেন৷ কারণ, স্কুলের চাকরিতে তাঁকে এই পর্বতারোহণের জন্য অনেক ছুটি নিতে হয়৷ যদিও স্কুলে যখন তিনি থাকেন, তখন ছাত্র-ছাত্রী ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখান৷ আর স্কুল ছেড়ে বেরিয়ে তিনি যখন পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেন, তখন তিনি ছড়িয়ে দেন বিশ্ব শান্তি ও পাহাড়ের পরিবেশকে রক্ষা করার বার্তা৷

আন্তর্জাতিক পর্বত দিবসেও একই বার্তা শোনা গেল তাঁর মুখে৷ পিয়ালী বলেন, ‘‘পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখেই পর্বত আরোহণে করতে হবে। সমস্ত কিছু বাধা অতিক্রম করে যেমন আমরা পর্বত শৃঙ্গ জয় করি, তেমনই জীবনের সমস্ত বাধা অতিক্রম করে ছাত্র-ছাত্রীদের এগিয়ে যেতে হবে।’’

