ETV Bharat / state

অসাধ্য সাধন! প্রশাসনের অপেক্ষায় না থেকে পাহাড় কেটে রাস্তা বানালেন বক্সার গ্রামবাসীরা

গর্ভবতী মহিলা বা অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হলে বাঁশের মাচা বানিয়ে কাঁধে তুলে নামানোই ছিল একমাত্র উপায় ।

boxa
পাহাড় কেটে রাস্তা বানালেন চুনাভাটি গ্রামের বাসিন্দারা (নিজস্ব চিত্র)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : February 28, 2026 at 8:47 PM IST

3 Min Read
Choose ETV Bharat

শুভদীপ বর্মন

আলিপুরদুয়ার, 28 ফেব্রুয়ারি : দুর্গম পাহাড় মানেই লড়াই । কিন্তু সেই লড়াই যখন পরিণত হয় আত্মনির্ভরতার ইতিহাসে, তখন তা শুধু খবর নয়—প্রেরণার কাহিনিও বটে ! উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার বুকে, বক্সা পাহাড়র প্রত্যন্ত চুনাভাটি গ্রাম যেন সেই ইতিহাসই রচনা করল ।

বহু বছর ধরে চুনাভাটির প্রায় 50টি পরিবারের নিত্যসঙ্গী ছিল দুর্ভোগ । গ্রাম থেকে নীচের পাকা রাস্তায় পৌঁছতে হলে তিন কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ হেঁটে নামতে হতো । বর্ষায় কাদা আর ধস, শীতে কুয়াশা—প্রতিটি ঋতুই যেন বিপদের বার্তা বয়ে আনত । অসুস্থ রোগী কিংবা গর্ভবতী মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বাঁশের মাচায় তুলে কাঁধে করে নামানোই ছিল একমাত্র ভরসা । স্কুলপড়ুয়া পড়ুয়াদের প্রতিদিনের পথচলাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ।

boxa
যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম দুর্ভোগে ভুগছিল গ্রামটি (নিজস্ব চিত্র)

অবশেষে অপেক্ষার ইতি টানলেন গ্রামবাসীরাই । কোদাল-বেলচা হাতে, দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমে পাহাড় কেটে তৈরি করলেন প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গাড়ি চলাচলযোগ্য রাস্তা । লক্ষ্য একটাই—চুনাভাটি থেকে ডোলিচেইন পর্যন্ত সহজ যোগাযোগ, যাতে জরুরি মুহূর্তে দ্রুত পৌঁছানো যায় হাসপাতাল বা শহরের দিকে ।

তবে শেষ এক কিলোমিটার পথ ছিল সবচেয়ে কঠিন। সেই অংশ এতটাই দুর্গম যে গাড়ি পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছিল না । আর সেখানেই ঘটল নজিরবিহীন ঘটনা । প্রায় 25-30 জন গ্রামবাসী মিলে একটি পুরনো মারুতি ভ্যান শক্ত করে বেঁধে কাঁধে তুলে প্রায় এক কিলোমিটার পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে গ্রামে পৌঁছে দিলেন । গাড়ির ইঞ্জিনের অংশ আলাদা করে আগে কাঁধে তুলে নেওয়া হয়, পরে পাহাড়ের মাথায় গিয়ে তা ফিটিং করে দেন এক কারিগর । ফলে গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার পথ গাড়িতে এসে বাকি এক কিলোমিটার হেঁটে পৌঁছানো যাবে বক্সা ফিডার রোডে । চার কিলোমিটারের দুর্ভোগ কার্যত নেমে এল এক কিলোমিটারে।

স্থানীয় বাসিন্দা অরুণ রাইয়ের কথায়, "প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েও কোনও ফল পাইনি । শেষ পর্যন্ত নিজেরাই উদ্যোগ নিলাম । একসঙ্গে চাইলে অসম্ভবও সম্ভব হয়—আমরাই তার প্রমাণ ।" অপর গ্রামবাসী লাজোর ডুকপা জানান, " বর্ষার আগে কাজ শেষ না করলে সমস্যা হতো । তাই সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেরাই নিজেদের চলাচলের রাস্তা বানালাম ।"

boxa
অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটালেন গ্রামবাসীরাই । (নিজস্ব চিত্র)

প্রশাসনের তরফে আগে 'পালকি অ্যাম্বুলেন্স' পরিষেবা চালু হলেও তা নিয়মিত ছিল না বলে অভিযোগ । তবে কালচিনি ব্লকের বিডিও মিঠুন মজুমদার গ্রামবাসীদের উদ্যোগের প্রশংসা করে আশ্বাস দিয়েছেন, ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে প্রশাসন পাশে থাকবেন । গ্রামবাসীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ আলিপুরদুয়ারের মহকুমা শাসক দেবব্রত রায়ও ৷ তিনি বলেন, "এটা প্রশাসনের করার কথা ছিল, তবে নানাবিধ কাজের চাপে সবসময় প্রশাসন সবটা করে উঠতে পারে না ৷ সেক্ষেত্রে গ্রামবাসীদের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ৷ আগামিদিনে ওদের যেকোনও প্রয়োজনে পাশে থাকব ৷"

বক্সার প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দাদের এই উদ্যোগ এখন আলিপুরদুয়ারের মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে ৷ পাহাড় কেটে রাস্তা, কাঁধে গাড়ি—এসব শুধু পরিশ্রমের গল্প নয়, অদম্য মানসিকতার প্রতীকও । ওয়াকিবহাল মহলের মতে, উন্নয়নের গতি যখন থমকে যায়, তখন সাধারণ মানুষই দেখিয়ে দেন এগিয়ে যাওয়ার পথ । চুনাভাটির এই কাহিনি যেন পাহাড়ের বুকেই খোদাই হয়ে রইল—আত্মবিশ্বাস আর ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ।