শরৎচন্দ্রের 'ছিনাথ'ই অনুপ্রেরণা, গোলাপ দিয়ে সুবল বহুরূপীকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন রাজীব গান্ধি
দিল্লিতে তাঁর হাতে একটি গোলাপ ফুল দিয়ে নাকি রাজীব গান্ধি বলেছিলেন, দেশের এই শিল্পীদের জন্য তিনি কিছু করবেন ।

Published : December 12, 2025 at 8:05 PM IST
বোলপুর, 12 নভেম্বর: 'সড়কি লাও, বন্দুক লাও...!' শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত উপন্যাসে ডালিম গাছের ঝোপে বৃহৎ আকারের জন্তু বসে আছে দেখে, গাদা বন্দুক দিয়ে তাকে শায়েস্তা করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন গল্পের পিসেমশাই ৷ পরে বোঝা যায়, বাঘ-টাঘ কিছুই নয়, আসলে সে বাঘের বেশ ধরা 'ছিনাথ বহুরূপী' ৷ সেই গল্প পড়েই জীবনটা বদলে গিয়েছিল বীরভূমের নানুরের বাসিন্দা সুবল দাস বৈরাগ্যের ৷
বহুরূপী শিল্পে তাঁর হাতে খড়ি দেন সেই 'ছিনাথ বহুরূপী'-রই ছাত্র ৷ প্রতিভার জোরে সুবল পেয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির সাহচর্য ৷ দেশে-বিদেশে পেয়েছেন সম্মান ৷ তবে আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এই শিল্পে এসেছে নানা ঘাত-প্রতিঘাত ৷ তবু অবিচল থেকে 50 বছর ধরে বিপন্ন 'বহুরূপী' শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন 85-র বৃদ্ধ ৷
অনুপ্রেরণা শরৎচন্দ্রের 'ছিনাথ বহুরূপী'
কখনও তিনি ধরা দেন রামের সাজে, তো কখনও হনুমান ৷ আবার কখনও তাঁরই অঙ্গে একাধারে দেখা মেলে শিব, নারায়ণের ৷ আবার কখনও ধরেন বাঘ কিমবা ভালুকের বেশ ৷ এসবেই বাঁধা আছে বীরভূমের নানুরের প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা সুবল দাস বৈরাগ্যের দিনলিপি ৷ একটা সময়ে পেশায় যাত্রাশিল্পী ছিলেন ৷ রমণীর সাজে পালাগানে অভিনয় করতেন ৷ সেই সময় যাত্রায় যে কোনও চরিত্রেই অভিনয় করতেন শুধুমাত্র পুরুষেরাই ৷ তবে কালের নিয়মে সেই নারী চরিত্রগুলো পরবর্তীতে পেয়েছে প্রকৃত রমণীকে ৷ এবার তিনি কী করবেন ? কীভাবে সংসার চালাবেন ? চিন্তাটা তখনই মাথায় চেপে বসে ৷ ঠিক সেই সময়ই তাঁর চোখ খুলে দেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'ছিনাথ বহুরূপী' ৷ সেই গল্প পড়েই আগামী দিনে নিজের চলার পথ বেছে নেন সুবল ৷ সেই শুরু ৷

সুবল দাস বৈরাগ্য হলেন সুবল বহুরূপী
প্রসঙ্গত, কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 1917 সাল থেকে 1933 সাল পর্যন্ত চারটি খণ্ডে রচনা করেছিলেন বিখ্যাত উপন্যাস 'শ্রীকান্ত'৷ সেই উপন্যাসেরই অন্যতম চরিত্র 'শ্রীনাথ বহুরূপী', যা অপভ্রংশ হয়ে হয়েছিল 'ছিনাথ বহুরূপী'। এই উপন্যাসের বহুরূপী চরিত্রটি মন ছুঁয়ে গিয়েছিল সুবল দাস বৈরাগ্যের ৷ এই 'ছিনাথ বহুরূপী'-র ছাত্র ছিলেন নানুরের চারকল গ্রামের বাসিন্দা কানাই চক্রবর্তী ।

সুবল দাস বৈরাগ্য জানান, একদিন কুলে গ্রামে বহুরূপী সেজে এসেছিলেন এই কানাই চক্রবর্তী । গ্রামে কুকুরের কামড়ে জখম হয়েছিলেন তিনি ৷ তাঁকে সেবা-শুশ্রূষা করে সারিয়ে তুলেছিলেন সুবলবাবু ৷ আপ্লুত হয়ে তাঁকে নিজের বহুরূপী শিল্পে আসার পরামর্শ দেন কানাই চক্রবর্তী । এরপর শুরু হয় তাঁর কাছে তালিম নেওয়া ৷ ক্রমে সুবল দাস বৈরাগ্য হয়ে ওঠেন সুবল বহুরূপী ৷

গোলাপ দিয়েছিলেন রাজীব গান্ধি
নিজের শিল্পের প্রচারে তিনি 1985 সালে দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির হাত ধরে ওয়াশিংটন শহরে পাড়ি দিয়েছিলেন ৷ প্রায় দুই মাস বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় শো করে ফেরার পর দিল্লিতে তাঁর হাতে একটি গোলাপ ফুল দিয়ে নাকি ইন্দিরা-পুত্র বলেছিলেন, দেশের এই শিল্পীদের জন্য তিনি কিছু করবেন । সেই প্রতিশ্রুতি পেয়ে দিনবদলের স্বপ্ন দেখেছিলেন সুবল বহুরূপী ৷ তবে তাঁর আক্ষেপ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অকালপ্রয়াণ তাঁর স্বপ্নে জল ঢেলে দিয়েছিল ৷

ইটিভি ভারতের প্রতিনিধির কাছে সেই স্মৃতি আওড়াতে গিয়ে গলা ধরে এল 85 বছরের বৃদ্ধের ৷ তাঁর কথায়, "রাজীব গান্ধি গোলাপ ফুল দিয়ে বলেছিলেন, খুব ভালো শিল্প । শিল্পীদের বাঁচাতে আমি কিছু একটা করব ৷ কিন্তু উনি চলে গেলেন । আমার ভাগ্যটাই খারাপ ৷" ঘাত-প্রতিঘাত এলেও, থেমে যাননি ৷ বরং দ্বিগুণ চেষ্টায় নিজের শিল্পের প্রচার ও প্রসারে সর্বদা সচেষ্ট থেকেছেন বীরভূমের এই বাসিন্দা ৷ আমেরিকা ছাড়াও ব্রিটেন, জার্মানি, তাসখন্দে গিয়ে শো করেছেন ৷ তাছাড়া, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত তো আছেই ৷ তাঁর কথায়, "আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানি ঘুরেছি, কত সম্মান পেয়েছি, উপহার পেয়েছি ৷ সবাইকে বলব এই শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতে ।"


বহুরূপীর উত্তরাধিকার রক্ষা পরবর্তী প্রজন্মের
পরের প্রজন্মেও এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে তালিম দিয়েছেন নিজের ছেলে ধনেশ্বর দাস বৈরাগ্যকে ৷ বর্তমানে দশম শ্রেণিতে পাঠরত নাতি রাখব দাস বৈরাগ্যও বাবা ও ঠাকুরদার পেশা গ্রহণের জন্য তৈরি হতে শুরু করেছে ৷ সুবল বহুরূপীর ছেলে ধনেশ্বর দাস বৈরাগ্য বলেন, "আমি সেলসম্যানের কাজ করতাম ৷ বাবা বহুরূপী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ৷ দেখলাম এই শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে ৷ তখন আমি বাবার কাছে তালিম নেওয়া শুরু করি ৷ বাবার নাম-ডাক সব দিকে ৷ দেশ-বিদেশে বহু ঘুরেছেন ৷ আমি 15 বছর হল বাবার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছি । মেক-আপ করে নিই নিজেই । চরিত্র অনুযায়ী মেক-আপ করতে সময় লাগে, 30 থেকে 40 মিনিটের মধ্যেই সেজে নিই ৷ এই শিল্প ধরে রাখতে আমার ছেলেকেও এখনও শেখাচ্ছি আমি আর বাবা মিলে ।"


বর্তমানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীর পাঠভবন থেকে শুরু করে ঠাকুর পরিবারের অন্যতম সদস্য সুপ্রিয় ঠাকুরের স্কুল শিশুতীর্থের বাচ্চাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন সুবল বহুরূপী । এত বছর বয়সেও আজও সমান প্রাণবন্ত, একই রকম প্রাণোচ্ছ্বল । আজও তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিতে উৎসাহী শিশুরা ৷


বিশ্বভারতীর কলাভবনের প্রাক্তনীদের প্রজেক্ট বহুরূপী
সুবল বহুরূপী বলেন, "আগে যাত্রা করতাম । শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছিনাথ বহুরূপী আমার মনে দাগ কেটেছে ৷ তারপরে পেলাম সেই ছিনাথ বহুরূপীর ছাত্রকে ৷ তিনিই আমাকে তালিম দিলেন ৷ গ্রামে গ্রামে ঘুরতাম এক আনা, এক সিকি পেতাম ৷ কিন্তু, এই শিল্পকে ছাড়িনি ৷ একদিন হয়তো হারিয়ে যাবে এই শিল্প ৷ চেষ্টা করছি ছেলে, নাতিকে শিখিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে । আনন্দ হচ্ছে যখন গুরুদেবের আশ্রমে গিয়ে, শিশুতীর্থে গিয়ে বাচ্চাদের শেখাতে পারছি ।"


বিশ্বভারতীর কলাভবনের প্রাক্তনী সুরজিৎ বিশ্বাস ও তাঁর সঙ্গীরা সুবল বহুরূপীর শিল্পকে প্রসারের উদ্যোগ নিয়েছেন ৷ তাঁদের চেষ্টাতেই স্কুলে স্কুলে চলছে বহুরূপী শিল্পের প্রশিক্ষণে কর্মশালা ৷ সুরজিৎ বলেন, "এই শিল্পে এক সঙ্গে বহু মানুষের সঙ্গে মেশা যায় ৷ শিল্প অন্য একটি আধার পায় ৷ তাই আমরা সুবল দাস বৈরাগ্যর প্রতিভাকে কাজে লাগাতে প্রজেক্ট হিসাবে এই কাজ হাতে নিয়েছি ।"


প্রযুক্তির সুনামির সঙ্গে সঙ্গেই গাঁয়ে-গঞ্জে বহুরূপীর সংখ্যা কমেছে ৷ কমছে এই শিল্পকে জড়িয়ে থাকা মানুষজনও ৷ তবে সেসব দিকে নজর না-দিয়ে আজও নিজের শিল্পের প্রসারে অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সুবল বহুরূপী ৷ সেজন্যই হয়তো গল্পে-সিনেমায় আজও আলাদা কদর আদায় করে নেয় ছিনাথ বহুরূপীরা ৷



