নরেন্দ্রপুরে ছাত্রের রহস্যমৃত্যু: পদত্যাগের ইচ্ছাপ্রকাশ প্রধান শিক্ষকের, সাসপেন্ড 3 হস্টেল কর্মী
নিহত ছাত্রের সহপাঠীদের অভিযোগ, সময়মতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলে হয়তো এই মর্মান্তিক পরিণতি এড়ানো যেত ।

Published : July 2, 2026 at 6:39 PM IST
নরেন্দ্রপুর, 2 জুলাই: নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ছাত্রের রহস্যমৃত্যু ৷ আর তারপরই স্কুলের হস্টেল পরিচালনা, ছাত্রদের নিরাপত্তা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে । ঘটনার জেরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বামী ইষ্টেষানন্দ মহারাজ পদত্যাগের ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন । পাশাপাশি ছাত্রদের মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগে সৌরভ তরু বিশ্বাস, সোমনাথ বৈরাগী এবং সমরেশ ধাড়া নামে তিন হস্টেল কর্মীকে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করেছে মিশন কর্তৃপক্ষ ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বারুইপুর পুলিশ জেলার পুলিশের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক বলেন, "বুধবার নরেন্দ্রপুর থানায় একটা অভিযোগ দায়ের হয়েছে ৷ আমরা তদন্ত করে দেখছি ৷ ঘটনাস্থলের সমস্ত সিসিটিভ ফুটেজ চেয়েছি ৷ যা যা করার করছি ৷"
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত মঙ্গলবার সকালে হস্টেলে ফ্লাস্ক থেকে অত্যন্ত গরম চা পান করার পর আচমকাই অসুস্থ হয়ে পড়েন দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র 18 বছরের দীপ্তাংশু মাহাতো । প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, চা পান করার পর থেকেই তিনি প্রবল কাশতে শুরু করেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয় । পরে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন ।
কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী তথা মৃত ছাত্রের বাবা মনোরঞ্জন মাহাতো এই ঘটনায় নরেন্দ্রপুর থানায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন । তাঁর অভিযোগ, স্কুল কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি এবং সময়মতো চিকিৎসার ব্যবস্থা না করার ফলেই তাঁর ছেলের মৃত্যু হয়েছে । মনোরঞ্জন মাহাতো বলেন, "মঙ্গলবার সকাল প্রায় 11টা 20মিনিটে আমি আদালতে থাকাকালীন বিদ্যালয় থেকে ফোন পাই যে, আমার ছেলে অসুস্থ । আমি দ্রুত স্কুলে পৌঁছে দেখি, দীপ্তাংশুর অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক । সে ঠিকমতো কথা বলতে পারছিল না এবং অনবরত কাশছিল ।"
পরিবারের অভিযোগ, সকাল পৌনে দশটা থেকে দশটার মধ্যে ফ্লাস্ক থেকে অত্যন্ত গরম চা পান করার পরই তাঁর এই অবস্থার সৃষ্টি হয় । ছাত্রটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়নি । বরং কর্তৃপক্ষ তাঁর বাবার আসার জন্য অপেক্ষা করছিল । স্কুলের চিকিৎসকও অবিলম্বে বড় হাসপাতালে রেফার না করে পরে এন্ডোস্কোপি করার পরামর্শ দেন বলে অভিযোগ । পরে মনোরঞ্জন মাহাতো নিজেই ছেলেকে গাড়িতে করে প্রথমে একটি স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান । সেখানে ভর্তি না নেওয়ায় সল্টলেকের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা দীপ্তাংশুকে মৃত ঘোষণা করেন ।
প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, অতিরিক্ত গরম তরল পান করার ফলে তাঁর পরিপাকতন্ত্রে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে অবস্থার অবনতি ঘটে । মনোরঞ্জন মাহাতো আরও প্রশ্ন তুলেছেন, চা অতিরিক্ত গরম বুঝতে পারার পরও তাঁর ছেলে সেটি ফেলে দিল না কেন । তাঁর দাবি, দীপ্তাংশু জানিয়েছিলেন, মেঝে নোংরা হয়ে যাবে এই ভয়ে তিনি চা বাইরে ফেলেননি । ঘটনার সময় হাউস মাস্টার কোথায় ছিলেন এবং কেন ছাত্রটির পাশে কেউ ছিলেন না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি ।
এই ঘটনার পর ছাত্র ও অভিভাবকদের একাংশ হস্টেলের পরিবেশ নিয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এনেছেন । তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্রদের উপর শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হতো । হাউস মাস্টার, পিজি এবং কয়েকজন হস্টেল কর্মীর বিরুদ্ধে মারধর ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে । এমনকি এক কর্মীর বিরুদ্ধে প্রতি শুক্রবার নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছাত্রদের নির্যাতনের অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে । তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হয়নি ।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের সম্পাদক স্বামী শাস্ত্রজ্ঞানন্দ মহারাজ ছাত্র ও অভিভাবকদের নিয়ে বৈঠক করেন । সেখানে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও অনেকেই সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন । তাঁদের দাবি, শুধুমাত্র কয়েকজন কর্মীকে সাসপেন্ড করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; ঘটনার জন্য যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে ।
এদিকে দীপ্তাংশুর মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন তাঁর সহপাঠীরা । তাঁদের অভিযোগ, সময়মতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলে হয়তো এই মর্মান্তিক পরিণতি এড়ানো যেত । একইসঙ্গে হস্টেলে ছাত্রদের নিরাপত্তা, তদারকি এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে ।

