ETV Bharat / state

কমবে মধ্যপ্ৰদেশ-গুজরাতের উপর নির্ভরশীলতা, বাংলার মাটিতে শুরু উন্নতমানের রসুন চাষ

উদ্যান পালন দফতরের দাবি, পশ্চিমবঙ্গে প্রথম হুগলি জেলায় বিপুল আকারে চাষ হচ্ছে নাসিকের বিশেষ জাতের রসুন । যা আগামীতে দিশা দেখাবে বাকি জেলাদের ৷

garlic cultivation
হুগলিতে হচ্ছে নাসিকের রসুন চাষ (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : November 3, 2025 at 8:10 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

বলাগড়, 3 নভেম্বর: পেঁয়াজের পর এবার রসুন ৷ মধ্যপ্ৰদেশ-গুজরাতের মতো রাজ্যের উপর রসুন আমদানিতে নির্ভরশীলতা কমাতে উদ্যোগী হল পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৷ বাংলার স্বনির্ভরতা বাড়াতে কৃষকদের দিয়ে নাসিক থেকে আনা নতুন জাতের রসুনের চাষ করাচ্ছে হুগলি জেলার উদ্যান পালন দফতর ।

বাংলার অভ্যন্তরীণ বাজারে রসুনের দামের ওঠা-নামা দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা । প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে বা ট্রান্সপোর্টের খরচের কারণেই হোক, রসুনের দাম বেড়ে যায় । সেই কারণেই নাসিকের উন্নতমানের রসুন চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন উদ্যান পালন দফতরের আধিকারিকরা । তাতে ভালো চাষ হলে বাজারে কম দামে রসুন পাবেন সাধারণ মানুষ ।

কমবে মধ্যপ্ৰদেশ-গুজরাতের উপর নির্ভরশীলতা, বাংলার মাটিতে শুরু উন্নতমানের রসুন চাষ (ইটিভি ভারত)

রসুন চাষের উর্বর জমি হুগলিতে

হুগলি জেলায় পেঁয়াজ চাষে অন্যতম ব্লক বলাগড় । আগে থেকেই হুগলির বলাগড়, তারকেশ্বর ও গোঘাট কয়েকশো বিঘা জমিতে রসুন চাষ হয় । কিন্তু সেগুলি দেশি রসুন হাওয়ায় ফলন কম পান কৃষকরা । হুগলি জেলায় বলাগড়ে সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয় । পেঁয়াজ চাষের জন্য বলাগড়ের মাটি খুবই উর্বর । পেঁয়াজ চাষের সঙ্গে রসুন চাষের সাদৃশ্য থাকায় উপযুক্ত উর্বর মাটি ও আবহাওয়া রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা ।

মূলত সবচেয়ে বেশি রসুন চাষ হয় মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র ও গুজরাতে । সেখানকার চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের মাটি অনেক উর্বর । শীতকালীন সময়ে পেঁয়াজের সঙ্গে রসুন চাষ করলে আবহাওয়া কোনও সমস্যা হবে না বলে জানাচ্ছে উদ্যান পালন বিভাগ । পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্যই ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকার নানা পদক্ষেপ করেছে । কৃষকরা, নিজের বাড়িতেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছেন । তার সঙ্গে রসুন সংরক্ষণও করা যাবে এখানেই । তিন মাস এই ফসল মজুত রাখতে পারলেই আলুর চেয়েও দাম বেশি পাবেন কৃষকরা । এতে রসুন আমদানিতে অন্য রাজ্যের উপর থেকে নির্ভরতা কমানো যাবে বলে মনে করা হচ্ছে ।

রসুন চাষের পরিমাণ

রাজ্যে যা রসুন চাষ হয়, তার পাঁচ গুণ বর্তমানে আমদানি করতে হয় ভিনরাজ্য থেকে । তাই উন্নত রসুন চাষ করলে কৃষক ও রাজ্যের মানুষ লাভবান হবে । বর্তমানে বলাগড়ে 1800 বিঘা জমিতে রসুন চাষ হয় । এখানে দেশীয় প্রজাতির গঙ্গাজুলি ও কটকি নামে রসুন চাষ হয় । কিন্তু তার গুণগত মান খুব একটা ভালো নয় । জাতীয় উদ্যান পালন দফতরের গবেষকরা তামিলনাড়ুর নাসিকে উন্নতমানের রসুনের জাতের আবিষ্কার করেছিলেন, যা এ রাজ্যে ব্যাপক আকারে চাষ হয়নি । এই রসুনের বীজ আমদানি করে চাষ করলে দ্বিগুন ফলন পাবেন চাষিরা ।

garlic cultivation
হুগলি জেলার উদ্যান পালন দফতর উদ্যোগ নিয়েছে রসুন চাষে (নিজস্ব ছবি)

এক বিঘা জমিতে গঙ্গাজুলির ফলন 8 থেকে 9 কুইন্টাল । সেই জায়গায় উন্নত এই রসুন ফলন 20 থেকে 22 কুইন্টাল । এখন দেশি রসুনের সঙ্গে 10 কিলো নতুন রসুন চাষ করানো হচ্ছে উদ্যান পালন দফতরের তরফে । ক্লাস্টারের মাধ্যমে এই চাষ করার পরিকল্পনা নিয়েছে হুগলি জেলা উদ্যান পালন দফতর । ধীরে ধীরে এই বীজ থেকেই চাষ বাড়ানো হলে কৃষকরা লাভবান হবে । রাজ্যে রসুনের চাষে স্বনির্ভর করানোর জন্যই এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার ।

রসুন চাষে উদ্যোগী চাষিরা

বলাগড়ের জিরাটে 22 জন চাষিকে নিয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে । জিরাটের আরাজি ভবানীপুর ও ভবানীপুর চর মৌজায় রসুন চাষ হয় বহুদিন ধরেই । কৃষক কার্তিক দাস বলেন, "জিরাটে বহুদিন ধরেই রসুন চাষ হয়ে আসছে । বহু পুরনো জাতের রসুন চাষ হয় । বেশিবার চাষ করার ফলে তার ফলন ক্ষমতাও কমে গিয়েছে । উদ্যান পালন দফতর আমাদের একটি নতুন প্রজাতির রসুন বীজ দিয়েছে । দফতর জৈব সারের ব্যবহারে রসুন চাষের জন্য উৎসাহ জোগাচ্ছেন । রাসায়নিক সারের ব্যবহার কম করার জন্য বলা হচ্ছে সরকারি তরফে । আমরাও এই ব্যাপারে উৎসাহী হয়েছি । আমাদের এখানে কটকী ও গঙ্গাজুলি জাতের রসুন চাষ হয় । আপাতত আমরা যমুনা সফেদ প্রজাতিটি অল্প চাষ করে দেখছি । পরবর্তীকালে ফলন বেশি হলে আরও চাষ বাড়াবার চিন্তা-ভাবনা করব ।"

garlic cultivation
উন্নতমানের রসুন চাষ হবে (নিজস্ব ছবি)

রাজ্যে প্রথম নাসিকের রসুন চাষ

হুগলি উদ্যানপালন দফতরের আধিকারিক শুভদীপ নাথ বলেন, "পশ্চিমবঙ্গ ও আমাদের জেলাতে যথেষ্টই রসুনের ঘাটতি রয়েছে । ভিনরাজ্যের নির্ভরতা কমাতেই রসুন চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে । নতুন এই রসুন চাষে দ্বিগুন ফলন আনতে পারি আমরা । নাসিকের যে কেন্দ্রের গবেষণা রয়েছে সেখান থেকে (G-282) যমুনা সফেদ থ্রি এই জাতের বীজ আমাদের এখানে আনানো হয়েছে । সার্টিফাইড বীজ চাষিদেরকে দেওয়া হচ্ছে । চাষিরা কিনে চাষ করছে তাতেও কিছুটা ভর্তুকি দিচ্ছে রাজ্য সরকার । এবারে রসুন কিনে চাষ করলে পরের বছর থেকে সেটাকেই বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন কৃষকরা । চাষও বাড়াতে পারবেন ।"

তিনি আরও বলেন, "দেশীয় অনুন্নত রসুন বীজকেও পরিবর্তন করা যাবে । সেই সঙ্গে ফলনও বেশি পাবে এই নতুন রসুন চাষে । গত বছরই রসুন 300 থেকে 350 টাকা পাইকারি দামে বিক্রি হচ্ছিল । সরকারি তরফে কম খরচে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ভর্তুকিও দেওয়া হচ্ছে । আর এখানেই রসুনও সংরক্ষণ করা যাবে । সংরক্ষণের জন্য আর নতুন কোনও ব্যবস্থা করা হবে । তিনমাস সংরক্ষণ করলেই আড়াইশো টাকা দাম পাবে কৃষকরা । আমরা ধাপে ধাপে এই নতুন রসুনের চাষ বাড়াব । এবছর এক বিঘা জমিতে কৃষকরা 60 কিলো পুরনো রসুন ও 10 কিলো নতুন জাতের রসুন চাষ হবে । পরের বছর সেই বীজ বৃদ্ধি পাবে । এবছর 75 বিঘা উন্নত রসুন চাষ করাচ্ছি । পশ্চিমবঙ্গে প্রথম হুগলি জেলায় এই বিপুল আকারে চাষ হচ্ছে নাসিকের এই বিশেষ জাতের রসুনের ।"