রানারের লণ্ঠন-রেলের সিগন্যাল ল্যাম্প, এই শহরেই আছে আলোক বাতির আস্ত 'গ্যালারি'
যার নাম 'হবি গ্যালারি' ৷ সেখানে গেলে একটি ঘরের মধ্যে দেখা মিলবে আদি-আধুনিক আলোর বিবর্তনের ইতিহাস ৷

Published : November 15, 2025 at 9:40 PM IST
কলকাতা, 15 নভেম্বর: 'রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে' ৷ সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতা 'রানার' ৷ এই কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে রানারের জীবনচরিত ৷ কবিতায় একটি লাইন রয়েছে, 'হাতে লণ্ঠন করে ঠন ঠন জোনাকিরা দেয় আলো' ৷ একটা সময় ছিল, যখন বিদ্যুৎ ছিল না ৷ হাতে লণ্ঠন নিয়ে অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে বাড়ি-বাড়ি চিঠি পৌঁছে দিতেন রানার ৷ তাদের ব্যবহৃত সেই লণ্ঠনের দেখা মিলবে শহর কলকাতার এক সংগ্রহশালায় ।
বেলগাছিয়ার দত্তবাগান এলাকার এক চিলতে ফ্ল্যাট । সেখানেই খাটে সাজানো শ’খানেক আলোক বাতি ৷ অশীতিপর তাপস বসুর সংগ্রহে রয়েছে এই বিপুল সংখ্যক আলোক বাতি ৷ ভালোবেসে তিনি যার নাম দিয়েছেন 'হবি গ্যালারি' । বিশ্বের নানা দেশের 200 বছরের আলোক বাতির বিবর্তনের ইতিহাস সেখানে তুলে ধরা হয়েছে সযত্নে ।
কে এই সংগ্রাহক ?
জুট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ায় চাকরি করতেন তাপস বসু ৷ কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরির পাশাপাশি সময় বের করে তিনি ছুটে যেতেন এখানে-ওখানে, আলোক বাতি সংগ্রহের জন্য ৷ এটাই তাঁর শখ ৷ আর সেই শখ থেকেই তাঁর সংগ্রহে এসেছে এত আলোর উৎস ৷ 65 বছর ধরে তিনি আলোর খোঁজে রয়েছেন ৷ একে একে সংগ্রহ করেছেন নানাধরনের আলোক বাতি । এগুলি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনীও করে আসছেন গত 60 বছর ধরে ।

সংগ্রাহক তাপস বসুর কথায়, এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে তিনি বার্তা দিতে চান যে, তাঁর চিন্তাভাবনা শুধুই সংগ্রহ করা নয় । বরং কোনও জিনিসের আদি থেকে আধুনিক এই গোটা বৃত্তকে তুলে ধরা । আলোকবাতির ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি ।

রানারের লণ্ঠন
কী নেই তাপসের অন্দরমহলে ৷ সেখানে রয়েছে রানারের হাতের লণ্ঠন ৷ যা বেলজিয়াম কাচ দিয়ে তৈরি ৷ বাতিটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে প্রচণ্ড ঝড়, বৃষ্টি হলেও হাওয়া লেগে তা যেন নিভে না যায় ৷ রানারের লণ্ঠন কেরোসিন দিয়ে চলত ৷ আর এই বাতি তৈরি হত ইংলান্ডে ৷ সেখান থেকে ভারতে আসত ৷

বনকর্মীদের লণ্ঠন
এর পাশাপাশি রয়েছে জঙ্গলে বনকর্মীদের ব্যবহৃত লণ্ঠন ৷ তখন জঙ্গলে অন্ধকারে লণ্ঠন ছাড়া উপায় ছিল না ৷ আর তাই ফরেস্ট অফিসার থেকে রেঞ্জাররা কোনও কাজে এই লণ্ঠন ব্যবহার করতেন ৷ সেই লণ্ঠনও এমনভাবে তৈরি ছিল, যা ঝড়-বৃষ্টি হলে নিভে যেত না ৷ এগুলিও তখন বাইরের দেশ থেকেই তৈরি হয়ে এদেশে আসত ৷

ঘোড়ার গাড়ির বাতি
ঘোড়ার গাড়ির আলোও রয়েছে তাপস বসুর কাছে ৷ ব্রিটিশ আমলে বড়লাট ও ছোটলাটের ঘোড়ার গাড়িতে লাগানো থাকত পিতলের কাঠামোয় বড় ধরনের বেলজিয়াম কাচের এই আলোক বাতি ৷ তখন বিদ্যুৎ না-থাকায় এটিও চালিত হতো কেরোসিন দিয়ে ৷

স্টিমার ও ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি
প্রাক্তন সরকারি চাকুরিজীবীর সংগ্রহে আরও রয়েছে স্টিমারের আলোক বাতি ৷ বিদ্যুৎ পরিষেবা চালু যখন হয়নি, তখন স্টিমারের পিছনে লাগানো থাকত কেরোসিনচালিত এই আলোক বাতি । এদিকে ইলেকট্রিক বা অটোমেটিক সিগন্যাল আসার আগে রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ রঙিন ল্যাম্প ব্যবহার করতেন ৷ যা থাকত পুলিশের হাতে ৷ সেটিও ছিল কেরোসিনচালিত ৷ সেই ল্যাম্পও রয়েছে তাপস বসুর সংগ্রহশালায় ৷

রেলের সিগন্যাল বাতি
এছাড়াও রয়েছে ভারতীয় রেলের সিগন্যাল বাতি ৷ এই বাতি একটি থাকত স্টেশন মাস্টার ও আরেকটি গার্ডের কাছে ৷ বাতি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রং বদলে তৎকালীন সময়ে তা গার্ডকে দেখাতেন স্টেশন মাস্টার । আর তা দেখেই গার্ড আবার একই বাতির রং দেখাতেন ট্রেন চালককে । এটিও ছিল কেরোসিন নির্ভর রঙিন কাচ লাগানো বাতি ৷ তাতে মূলত তিনটে রঙে থাকতো লাল, হলুদ ও সবুজ ৷

যখন বিদ্যুৎ ঘরে ঘরে পৌঁছয়নি, তখন বাড়িকে আলোকিত করতে ব্যবহার হত হরেকরকম হ্যারিকেন, হেচাক ও ল্যাম্প । শুধু দেশে নয়, বিদেশেও সেইসব ব্যবহার হতো । যেমন জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান, ইংল্যান্ড-সহ একাধিক দেশে ব্যবহৃত হত এগুলি ৷ এমনই একাধিক রংবেরঙের বাতিও রয়েছে তাপসের সংগ্রহে ।

আধুনিক আলো
এটাতো গেল বিদ্যুৎ সংযোগ আসার আগের কথা । বিদ্যুৎ সংযোগ বাড়ি বাড়ি হওয়ার পর টেবিল ল্যাম্প থেকে ঘরের আলো কেমন ছিল, 'হবি গ্যালারি'তে এলে দেখা মিলবে সেগুলিরও । আছে খনির ভিতর কাজ করার সময় ব্যবহৃত আলো । আছে ব্যাটারি চালিত টেবিল ল্যাম্প, বিভিন্ন ধরনের ডুম, ইমার্জেন্সি লাইট, এলইডি থেকে আধুনিক আলোক বাতি ।

সংগ্রাহকের কথা
গোটা দুই শতাব্দীর আলোক বাতির বিবর্তন যেন 6 ফুট প্রস্থ, 7 ফুট দৈর্ঘ্যের খাটে এনে সাজিয়েছেন তাপস বসু । তিনি বলেন, "আমার অনেক ধরনের জিনিস সংগ্রহে আছে । আসলে অনেক সংগ্রাহক আছেন যাঁরা নানা পুরোনো জিনিস নিজেদের সংগ্রহে রাখেন । তবে আমার সংগ্রহ অনেকটাই আলাদা । আমি এক একটি জিনিস আদি থেকে আধুনিক সবটাই সংগ্রহে রেখে থাকি । তেমনই এই আলোক বাতি । আদি থেকে আধুনিক বিবর্তন । কেরোসিন বেস বাতি থেকে বিদ্যুৎ চালিত সবটাই রেখেছি । বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন সময় উন্নতি ও তার প্রভাব এখানে স্পষ্ট ফুটে ওঠে । ফুটে ওঠে দুশো বছর আগের মানুষজনের প্রযুক্তিগত চিন্তাভাবনাও । এমন অনেক জিনিস সংগ্রহে আছে আমার ।"

তবে কেবল আলোক বাতির বিপুল সম্ভার নয়, তাপস বসুর সংগ্রহে রয়েছে আরও নানাজিনিস ৷ তাপসের যত বয়স বাড়ছে, তত এই সংগ্রহের তালিকা লম্বা হচ্ছে ৷ তবে সংগ্রহের কাজ বা শখে এতটুকুও ভাঁটা পড়েনি ৷ আর তাঁর এই সংগ্রহের শখের জন্য নানাসময়ে তিনি সমৃদ্ধ হয়েছেন বিভিন্ন সম্মানে ৷ পাশাপাশি সান্নিধ্যে এসেছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় থেকে নানাগুনী ব্যক্তিদের ৷


