রাজ্যের মদ ব্যবসায় ব্যাপক দুর্নীতি ! কোটি কোটি টাকার তছরুপে নাম জড়াল অভিষেকের
রাজ্যের মদ ব্যবসায় অন্তত 100 কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতিতে নাম জড়িয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে জাহাঙ্গির খানের। এই দুর্নীতির শিকড়-সন্ধানে ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি পাপড়ি চট্টপাধ্যায় ৷

Published : June 10, 2026 at 11:08 PM IST
|Updated : June 11, 2026 at 8:31 PM IST
কলকাতা, 11 জুন: রাজ্যে মদের ব্যবসায় একাধিক অনিয়মের কথা ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। তবে এবার এই বিষয় আরও বড় একটি আর্থিক তছরুপের খবর প্রকাশ্যে এলো। রাজ্যে মদের দোকানিদের থেকে 'beer carrying cost' খাতে নির্দিষ্ট অংকের টাকা নেওয়া হয়, যার বিলে কোনও উল্লেখ থাকে না। আর এই খাতে অন্তত 100 কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলেই বিস্ফোরক দাবি করেছে ওয়েস্ট বেঙ্গল লিকার অ্যাসোসিয়েশন। মদের ব্যবসা নিয়ে একাধিক আর্থিক তছরুপের খবর প্রকাশ্যে আসার পরই এবার মুখ খুলেছে ওয়েস্ট বেঙ্গল লিকার অ্যাসোসিয়েশন।
অ্যাসোসিয়াশের দাবি যে, এর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাঁদের সমস্যার কথা জানালেও তাঁদের কথায় কোনরকম গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁদের বিভিন্নভাবে ভয় দেখিয়ে বা হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, এবার রাজ্যে পালাবদলের পর তারা কিছুটা সাহস ও ভরসায় ভর করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন ৷ এরই সঙ্গে তারা তাদের দীর্ঘদিনের সমস্যা নিয়ে অর্থ দফতরের অ্যাডিশনাল চিফ সেক্রেটারি এবং রাজ্যের এক্সাইজ কমিশনারকে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন।
রাজ্য সরকারের বেভারেজ কর্পোরেশন বেভকো (Bevco)। এখানে বলে রাখা ভালো যে, বেভকো (Bevco) দেশের অন্যান্য রাজ্যে শুরু হলেও সেগুলি মুখ থুবড়ে পড়ে। তাই হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি রাজ্যেই এখন বেভকো (Bevco) রয়েছে। ডব্লিউবি লিকার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি সেক্রেটারি বিজন পাত্র ইটিভি ভারতকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, ডিস্ট্রিবিউটরদের থেকে মদের দোকানদাররা অর্ডারের মাধ্যমে যেই মাল নিতেন, ওই মাল দোকানে পৌঁছে দেওয়ার দ্বায়িত্ব ছিল ডিস্ট্রিবিউটরদেরই। বেভকো (Bevco) গঠন হওয়ার পর তারা যে মাল ডিস্ট্রিবিউটরদের দিতেন, সেই মাল কীভাবে তারা বিতরণ করবে, সেই বিষয় স্পষ্ট করে বেভকো (Bevco)-র গেজেটে উল্লেখ করা রয়েছে। সেই গেজেট নোটিফিকেশনে কোথাও বলা হয়নি যে, লাইসেন্সিদের থেকে এর জন্য কোনও রকম carrying বাবদ টাকা নেওয়া হবে। বরং, সেখানে খুব স্পষ্ট করেই লেখা রয়েছে যে, মালের অর্ডার দেওয়ার পরে বেভকো (Bevco)-র দায়িত্ব সেই মাল দোকানে দোকানে পৌঁছে দেওয়া।

'বিয়ার ক্যারিং কস্ট' বাবদ তোলাবাজি
কিন্তু, 2023 সাল থেকেই দেখা গেল বিয়ারের ক্যারিং কস্ট হিসাবে ওনারা একটা টাকার অঙ্ক দোকানদারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন। প্রতি ক্রেটের জন্য 10 টাকা করে ক্যারিং চার্জ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। বিজন পাত্র জানান যে, এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করায় তাঁদের জানানো হয় যে, এই টাকা না দিলে ডিস্ট্রিবিউটরদের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। অথচ, সেই টাকার কোনও লিখিত অর্ডার লাইসেন্সিদের কখনও দেওয়া হয়নি। এই টাকা বিলে কোথাও দেখানো হতো না।
এর ফলে ইনকাম ট্যাক্সের থেকে লাইসেন্সিদের একাধিক প্রশ্ন করা হয় ৷ জানতে চাওয়া হয়, এই যে তাঁরা 'ক্যারিং কস্ট' হিসাবে টাকা দিচ্ছে, সেটা তাঁরা কেন দিচ্ছে ? কারণ, বেভকোর নির্দেশিকাতে তো এমন কোনও টাকা দেওয়ার কথা বলা নেই ৷ অর্থাৎ, যে আর্থিক স্ক্যামটা চলছে, তাতে লাইসেন্সিরাও জড়িত রয়েছে।

ডব্লিউবি লিকার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি আরও জানান যে, বিয়ারের ডিস্ট্রিবিউটার এককভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং একমাত্র এই রাজ্যেই 'বিয়ার ক্যারিং কস্ট' বাবদ টাকা নেওয়া হয়। এই বিষয় নিয়ে দোকানদাররা তীব্র আপত্তি জানালে ডিস্ট্রিবিউটররা কিছুটা নড়েচড়ে বসে। এই পাহাড়প্রমাণ অঙ্কের টাকা কার কাছে যেত, সেটা তারা জানতেন না। তবে তারা স্পষ্ট জানিয়েছন, যেভাবে তাঁদের দিনের পর দিন শোষণ করা হয়েছে, তাতে ব্যবসা চালিয়ে যেতে তাঁদের নাভিশ্বাস উঠেছে।
কোভিড কালে স্পেশাল ফি এবং রাউন্ড আপ
এখানেই শেষ নয়, কোভিড কালে স্পেশাল ফি এবং রাউন্ড আপ বলে দুটি বিষয় চালু করা হয়। এই বিষয় বিজন পত্র জানান যে 2021 সালে করোনার সময়ে রাজ্য সরকার প্রতি বোতল মদের স্পেশাল পারপাস ফি চালু করেছিল। পাশাপাশি, রাউন্ড অফ (Round-off) বলে আরও একটি বিষয় চালু করে। বেভকো (Bevco) থেকে মদ কেনার সময় প্রতি বিলে টাকার অঙ্ক রাউন্ড-অফ বা পূর্ণ সংখ্যায় নিয়ে যাওয়ার নামে বাড়তি টাকা নেওয়া হয়েছে। এই দুটি নিয়মও বন্ধ করা দাবি তোলা হয়েছে ডব্লিউবি লিকার অ্যাসোসিয়েশনের তরফে।

বর্তমানে সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে খুচরো বিক্রেতাদের হাতে মাত্র 3.5 থেকে 4 শতাংশ লাভ থাকে। তাঁরা দাবি করেন যে এই লাভের অংশ বাড়িয়ে কমপক্ষে 10 শতাংশ করা হোক। এছাড়াও, লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় যত্রতত্র নতুন মদের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করতে হবে। বিজন পত্র জানান যে, বাড়তি করের বোঁঝায় তাঁদের ব্যবসা চালানো দায় হয়ে পড়েছে। তাই তাঁরা নতুন সরকারের কাছে এই নিয়মগুলি পুনর্বিবেচনা করার আর্জি জানিয়েছেন।
রাজ্যে পালাবদলের পর গত সরকারের আমলে যে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে, একে একে তার সামনে আসতে শুরু করেছে। এবার মদের ব্যবসার ক্ষেত্রেও যে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এবং মদ বিক্রেতাদের থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে যেভাবে তোলাবাজি করা হয়েছে সেই নিয়ে সরব হয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল লিকার অ্যাসোসিয়েশন।

কীভাবে এই আর্থিক তছরুপ শুরু হল?
কীভাবে এই আর্থিক তছরুপ শুরু হল এই বিষয় জানতে হলে আমাদের বেশ কিছুটা পিছিয়ে যেতে হবে। 2017 সালের আগে পর্যন্ত মদের ব্যবসায় সরাসরি রাজ্য সরকারের কোনও হস্তক্ষেপ ছিল না। তবে 2017 সালের পর ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট বেভারেজেস কর্পোরেশন লিমিটেড বা WBSBCL গঠন করা হল। এরপর থেকেই মদের ব্যবসায় সরাসরি রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ শুরু হল। এরপর 2021 সাল পর্যন্ত সবকিছুই ঠিকঠাক চললেও তারপর থেকেই মদ বিক্রেতাদের বিভিন্ন ধরনের আর্থিক চাপ ও শোষণের মুখে পড়তে হল, এর ফলে তাঁদের একাধিক খাতে অর্থ ব্যয় হয়েছে, লোভাংশ কমে গিয়েছে। একের পর এক বাড়তি খরচের জেরেই তাঁদের ব্যবসার লাভ কমে যাচ্ছে এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

মদ ব্যবসায় অনিয়মের বিষয়টি প্রাসঙ্গিকতা পেল কীভাবে?
সম্প্রতি 8 জুন আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর পক্ষ থেকে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ অফ ইন্ডিয়া-কে একটি চিঠি পাঠানো হয় ৷ সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, সম্প্রতি আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব মনোজ কুমার আগরওয়ালকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন যেখানে সংস্থা জানিয়েছে যে, কীভাবে মদের ব্যবসা করতে গিয়ে আইএফবি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিস লিমিটেড সমস্যা পড়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে যে, ব্যবসা করতে গিয়ে রাজ্যের এক্সাইজ অথরিটিসের পক্ষ থেকে তাঁদের প্রতি পদে 'ইললিগ্যাল ইন্টারফিয়ারেন্স' হয়েছে, যার ফলে তাঁদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই এই বিষয় একটি স্বতন্ত্র তদন্ত করার আবেদন জানিয়েছে সংস্থা। এখানে বলে রাখা ভালো যে, 2020 সালের 25 জুন দক্ষিণ 24 পরগনার নুরপুরে এই সংস্থার প্ল্যান্টে ভাঙচুর চালায় এবং প্ল্যান্টের কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগে কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
এই ভাঙচুর- হামলার ক্ষেত্রে অভিযোগের তীর ছিল ফলতার প্রাক্তন তৃণমূল কংগ্রেস নেতা জাহাঙ্গির খানের দিকেই। জাহাঙ্গির খানের পাঠানো গুন্ডা বাহিনী আইএফবি-র নুরপুরের প্ল্যান্টের ভাঙচুর চালায় বলেই অভিযোগ ওঠে। সেই সময় বিষয়টি জেলাশাসক থেকে শুরু করে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। এরপর পুলিশি নিরাপত্তা নিয়ে ফের 3 জুলাই নূরপুরের প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছিল।
আইএফবি-র ঘটনাটি শুধু একমাত্র ঘটনা নয়। এই ধরনের একাধিক ঘটনা় এই রাজ্যে পূর্বতন সরকারের আমলে ঘটেছে যেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মাপের ব্যবসা রাজ্য সরকারের বিভিন্ন ধরনের তোলাবাজির চাপের মুখে পরে কোমায় চলে গিয়েছে। আর যাঁরা প্রতিবাদ করেছে, তাদের আইএফবি-র মতোই দশা হয়েছে। তবে আইএফবি একটি বড় মাপের লিস্টেড (NSE) সংস্থা বলেই হয়তো শেষ রক্ষা পেয়েছিল।

প্রসঙ্গত, 2017 সালের আগে পর্যন্ত রাজ্যের মদের লাইসেন্সি (যারা লাইসেন্স নিয়ে মদের দোকান চালান) তাঁরা খুব নির্ঝঞ্ঝাটে ব্যবসা করতে পেয়েছেন এবং যথাযথ লভ্যাংশ ও পেয়েছন ৷ কিন্তু, যেদিন থেকে সরকার নিজের হাতে মদের ব্যবসা নিয়েছে, সেদিন থেকেই ডিস্ট্রিবিউটরশিপ, হোলসেলার ট্রেডগুলিকে বন্ধ করে দিয়েছে, সেদিন থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হতে শুরু করে। অর্থাৎ, আর্থিক গ্যাঁড়াকলে পড়ে হেনস্থার শিকার হতে হয় রাজ্যের মদ ব্যবসায়ীদের।
'বোতল-পিছু পিসি-ভাইপোকে টাকা পাঠাতে হতো'
এই বিষয় সিটু অনুমোদিত আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন লিমিটেড-এর শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি শমীক লাহিড়ী জানিয়েছেন যে, আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ-এর নুরপুরের প্ল্যান্টে ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গুন্ডা বাহিনী দিয়ে তোলা তুলতেন। তিনি বলেন, "শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্তৃপক্ষকে চাপ দেওয়া হয় যে, কর্তৃপক্ষ যদি টাকা দিতে থাকে তাহলে ব্যবসা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে না। তাই আইএফবি টাকা দিতে অস্বীকার করায় তৃণমূল কংগ্রেসের গুন্ডাবাহিনীর প্ল্যান্টে ভাঙচুর চালায়। এরপর আমি জেলাশাসক, এসপি এবং শিল্পমন্ত্রীকে এই নিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু, কোনও কাজের কাজ হয়নি ৷ কারণ, তৎকালীন সরকারের মাথায় ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বোতল-পিছু পিসি-ভাইপোকে টাকা পাঠাতে হতো।"
তিনি আরও দাবি করেন যে, ফলতাতে সেজ ও গ্রোথ সেন্টারে যেখানে এক সময় বহু মানুষ কাজ করতেন, সেটা এখন কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে। সবাই এই তোলাবাজির জন্য পালিয়েছে। আরও একটি বিষয় তিনি জানান যে, 2024 সালের নির্বাচনী বন্ডে আইএফবি তৃণমূলকে টাকা দিয়েছিল। যেই টাকার কিছু অংশ তৃণমূলের পার্টি ফান্ডে গেলেও খুব আশ্চর্যজনকভাবে বিহারের একটি রাজনৈতিক দলের ফান্ডে বাকি টাকা গিয়েছিল।

