একই 'সংসারে' শোভন-বৈশাখী-রত্না, কাননের ধমনিতে শুধুই তৃণমূল
বিজেপিতে যোগ দেওয়ার সাত বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূলে ফিরলেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় ৷ এদিন তাঁর সঙ্গে দলে যোগ দিলেন বান্ধবী বৈশাখীও ৷

Published : November 3, 2025 at 6:30 PM IST
কলকাতা, 3 নভেম্বর: ঘরের ছেলে যে ঘরে ফিরছেন, সেই ইঙ্গিত আগেই মিলেছিল ৷ সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূলে ফিরলেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী শোভন চট্টোপাধ্যায় ৷
বছর সাতেক আগে দল ছেড়েছিলেন শোভন ৷ তার বেশ কয়েকদিন আগে থেকে বৈশাখীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ঘিরে বিভিন্ন মহলে তুমুল চর্চা শুরু হয় ৷ ব্যক্তিগত জীবনের টানাপড়েনের জেরেই শেষমেশ দলত্যাগ করেন শোভন ৷ তাঁর অনুপস্থিতিতে তৃণমূলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন স্ত্রী রত্না ৷ এখন তিনি বিধায়ক ও কাউন্সিলর ৷ স্বামী শোভনের কেন্দ্র বেহালা পূর্ব থেকেই দাঁড়িয়েছিলেন রত্না ৷ বিজেপি প্রার্থীকে পরাজিত করে জয়ও পেয়েছিলেন ৷ সম্প্রতি আলিপুর আদালতে তাঁদের বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলা খারিজ হয়ে যায় ৷ দীর্ঘ আট বছর ধরে এই মামলা চলছিল ৷ স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ চেয়ে এই মামলা দায়ের করেছিলেন শোভন ৷ কিন্তু শোভনের আবেদন খারিজ হয়ে যায় ৷ এমনই ঘটনাবহুল আবহে তৃণমূলে নিজের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করছেন কানন ৷
এদিন দুপুরে তৃণমূল ভবনে তাঁর গলায় তৃণমূলের উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয় ৷ সঙ্গে ছিলেন বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ যোগদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি ও মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ৷ তাঁরা জোড়াফুলের উত্তরীয় পরিয়ে শোভন ও বৈশাখীকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলে স্বাগত জানান ৷
এরপর শোভন ও বৈশাখী তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের অফিসে যান ৷ সেখানে তাঁদের পাশে নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন ডায়মন্ডহারবারের তৃণমূল সাংসদ ৷ দলে শোভন-বৈশাখীকে কী দায়িত্ব দেওয়া হবে সেই প্রসঙ্গে তৃণমূলের অধুনা সেকেন্ড ইন কমান্ড বলেন, "এটা দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বৈঠকে ঠিক করা হবে ৷ দলনেত্রী ও ওয়ার্কিং কমিটি আলোচনা করে স্থির করবে ৷"
শোভন-বৈশাখীর দলে যোগ নিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য
2018 সালে দল ছেড়েছিলেন শোভন চট্টোপাধ্যায় ৷ সাত বছর বাদে তিনি দলে ফিরলেন ৷ তৃণমূল কেন মনে করল শোভনকে দলের প্রয়োজন ? এক সাংবাদিকের এহেন প্রশ্নে অভিষেকের জবাব, "এটা প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় ৷ প্রত্যেকের নিজের পছন্দের রাজনৈতিক দল বেছে নেওয়ার অধিকার আছে ৷ তিনি সেই দলের জন্য কাজ করতে চান ৷ এবার দলের শীর্ষ নেতৃত্ব স্থির করবে যে, কাউকে দলে নেওয়া হবে কি হবে না ৷ এক্ষেত্রে শোভন চট্টোপাধ্যায় গত 5-7 বছর ধরে দলের চেয়ারপার্সন (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন ৷ আজ তিনি ফিরে এসেছেন ৷ দলের চেয়ারপার্সনও তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন ৷ তিনিও এবার দলের নিচু স্তরের কাজকর্মে অংশ নেবেন ৷ দলকে শক্তিশালী করার কাজ করবেন ৷"
এদিন সাংবাদিক বৈঠকে দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি বলেন, "মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ অনুযায়ী আজ শোভন চট্টোপাধ্যায় এবং বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিচ্ছেন ৷ তাঁদের দলে ফিরে পেয়ে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ৷"
Placing their trust in the visionary leadership of Hon’ble Chief Minister Mamata Banerjee, Sovan Chatterjee and Baisakhi Banerjee have joined the All India Trinamool Congress.
— All India Trinamool Congress (@AITCofficial) November 3, 2025
They were formally welcomed into the party by Hon’ble State President Shri Subrata Bakshi and Hon’ble… pic.twitter.com/RPEPyqTMWV
দলে ফিরে প্রাক্তন মেয়র শোভন বলেন, "তৃণমূল কংগ্রেস আমার ঘর, আমার পরিবার ৷ আমার শিরা-ধমনিতে এই দলের রক্ত বইছে ৷ আজ ঘরের ছেলে ঘরে ফিরল ৷ আগামিদিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলকে আরও শক্তিশালী করতে আমি সর্বশক্তি নিয়োগ করব ৷ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুব্রত বক্সি, অরূপ বিশ্বাস— সবাই আমার ভাইয়ের মতো ৷ দলের নির্দেশ মেনে সংগঠনের কাজে আমি আত্মনিবেদন করব ৷"
তিনি আরও যোগ করেন, “সরকারের তরফে আমাকে সম্প্রতি একটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেখানে আমি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করব ৷ দল যেভাবে আমাকে ব্যবহার করবে, সেভাবেই আমি কাজ করব— সর্বোচ্চ সম্মান ও সততার সঙ্গে ৷" গত 17 অক্টোবর নিউটাউন কলকাতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনকেডিএ)-এর চেয়ারম্যান করা হয় শোভন চট্টোপাধ্যায়কে ৷ এবার ঘর ওয়াপসি হল মমতার প্রিয় কাননের ৷
দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমোদনক্রমে তাঁদের পুনরায় অন্তর্ভুক্তি সম্পন্ন হয়েছে ৷ রাজনৈতিক মহলে এই 'ঘর ওয়াপসি'কে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে ৷ কারণ, একসময় কলকাতা পুরনিগমের মেয়র হিসেবে এবং দক্ষিণ কলকাতার প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে শোভনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ ৷
কলকাতার মেয়র থেকে বিজেপিতে যোগ
2010 সালের 16 জুন প্রথম বার কলকাতার মেয়র হন শোভন ৷ এরপর দ্বিতীয় বার কলকাতা পুরনিগমের দায়িত্ব পান 2015 সালের 18 মে ৷ 2016 সালে বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়ে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফেলে তৃণমূল ৷ তখন তিনি মেয়র থাকাকালীন মন্ত্রী হন ৷ কিছুদিন পর থেকে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে ৷ এক এক করে কলকাতার মেয়র এবং রাজ্যের মন্ত্রীর পদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও দলীয় পদ ছাড়তে শুরু করেন শোভন ৷ শেষমেশ তৃণমূল ত্যাগ করেন ৷
কিছুদিন রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পর 2018 সালের 22 নভেম্বর দিল্লিতে তৎকালীন বিজেপির কার্যকরী সভাপতি জেপি নাড্ডার উপস্থিতিতে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন শোভন ও বৈশাখী ৷ কিন্তু গেরুয়া শিবিরের সঙ্গে সখ্য খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি ৷ 2021 সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে শোভনকে তাঁর বরাবরের কেন্দ্র বেহালা পূর্ব থেকে টিকিট না-দেওয়ায় অসন্তোষ তৈরি হয় শোভন-বৈশাখীর মনে ৷
এমনকী বৈশাখীকে প্রার্থী না-করায় বিজেপির সঙ্গে মনোমালিন্য তৈরি হয় ৷ বেহালা পূর্ব বিধানসভা আসন থেকে সেবার পায়েল সরকারকে প্রার্থী করে গেরুয়া শিবির ৷ এরপর বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করেন দুজনেই ৷ ততদিনে প্রথমে কাউন্সিলর পরে তৃণমূলের বিধায়ক হয়েছেন শোভনের স্ত্রী রত্না ৷ প্রায় সেই সময় থেকেই দু'জনের বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা চলেছে ৷ শোভনের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙতে চাননি রত্না ৷ সম্প্রতি তাঁর পক্ষেই রায় দিয়েছে আদালত ৷ এবার এক সংসারেই শোভন-বৈশাখী-রত্না ৷

