প্যারালাইসিসে আক্রান্ত অশীতিপর বৃদ্ধাকে নিয়ে SIR শুনানি কেন্দ্রে পরিবার, সমালোচনার মুখে কমিশন
উত্তর 24 পরগনার হিঙ্গলগঞ্জের ঘটনা৷ তৃণমূল কংগ্রেস এই নিয়ে সমালোচনায় সরব হয়েছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে৷

Published : December 29, 2025 at 9:22 PM IST
হিঙ্গলগঞ্জ (উত্তর 24 পরগনা), 29 ডিসেম্বর: অশক্ত শরীর! ঠিক মতো চলাফেরা করতে পারেন না। তার উপর প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। যার জেরে মানসিক সমস্যাতেও ভুগছেন। সেই অশক্ত শরীরেই জবুথবু হয়ে SIR শুনানি কেন্দ্রে যেতে হল 90 ছুঁইছুঁই বৃদ্ধাকে।
চলাফেরার ক্ষমতা হারানোয় অগত্যা প্যারালাইসিসে আক্রান্ত বৃদ্ধাকে পাঁজাকোলা করে শুনানি কেন্দ্রের ভিতরে নিয়ে গেলেন পরিবারের লোকেরা। এমনই ছবি ধরা পড়েছে উত্তর 24 পরগনার হিঙ্গলগঞ্জে। আর তা ঘিরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অব্যবস্থার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন বৃদ্ধার পরিবারের লোকজন।
তাঁদের দাবি, নির্বাচন কমিশন কথার সঙ্গে কাজের কোনও মিল নেই। কমিশন স্পষ্ট বলেছিল 85 বছরের ঊর্ধ্বে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সশরীরে যেতে হবে না এসআইআর-এর শুনানি কেন্দ্রে। তাঁদের জন্য ভার্চুয়ালি অথবা বাড়িতে গিয়ে শুনানির ব্যবস্থা করা হবে। তার পরেও হয়রানি পোহাতে হচ্ছে।
এই নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সুরে সুর মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনকে কার্যত হুঁশিয়ারি দিয়েছে শাসক শিবিরও। স্থানীয় প্রশাসন অবশ্য বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছে।

ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার শুনানি শুরু হতেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করেছে। কোথাও উঠেছে শুনানি কেন্দ্রে অব্যবস্থার অভিযোগ। কোথাও আবার অসুস্থ ভোটারকে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের স্বপক্ষে তথ্য তুলে ধরতে হয়েছে কমিশনের লোকজনের কাছে। এই নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অসুস্থ এবং বয়স্ক ভোটারদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করতে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
গেরুয়া শিবিরের তরফে পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে, এসআইআর-এর এন্যুমারেশন ফর্ম ফিল-আপ করতে যদি কোনও ভোটারের সমস্যা না-হয়, তাহলে শুনানিতে যেতে অসুবিধে কোথায়? দাবি এবং পাল্টা দাবি ঘিরে যখন এসআইআর-এর শুনানি প্রক্রিয়া নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজনীতির অন্দরে। সেই আবহেই এবার হিঙ্গলগঞ্জে সামনে এল 88 বছরের বৃদ্ধার করুণ এই ছবি।
কিন্তু, কেন এই বয়সে এসেও তাঁকে এসআইআর শুনানির জন্য ছুটতে হল? জানা গিয়েছে, অশীতিপর ননীবালা গাইন হিঙ্গলগঞ্জের দুলদুলি গ্রাম পঞ্চায়েতের স্বরূপকাঠি গ্রামের বাসিন্দা। 151 নম্বর বুথে তিনি নিয়মিত ভোট দেন। 2002 সালের সংশোধিত ভোটার তালিকায় নামও রয়েছে বৃদ্ধার। কিন্তু, পরবর্তীতে জানা যায় তাঁর ভোটার লিস্টে নামের জায়গায় অন্য একজনের নাম চলে এসেছে। তা ঘিরেই বিপত্তি বেঁধেছে। এসআইআর-এর এন্যুমারেশন ফর্ম ফিল-আপ করে জমা দিতেই সেই গোলযোগ ধরা পড়ে বলে অভিযোগ। ফলে কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী শুনানির নোটিশ আসে বৃদ্ধার কাছে।

এদিকে, সোমবার ছিল ওই বৃদ্ধার শুনানির দিন। কমিশনের লোকজন বাড়িতে গিয়ে শুনানি না-করায় শেষে বাধ্য হয়ে অশক্ত শরীরে টোটোয় চেপে শুনানি-কেন্দ্রে হাজির হন বৃদ্ধা ননীবালা গাইন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর পরিবারের লোকজনও। বাড়ির পাশে স্বরূপকাঠি এমএলএ হাইস্কুলের শুনানি কেন্দ্রের সামনে বৃদ্ধা হাজির হতেই ছুটে আসেন তৃণমূল নেতারা। তাঁর এই করুণ অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে যান তাঁরাও। এর পরেই টোটো থেকে কোনোরকমে পাঁজাকোলা করে শুনানি কেন্দ্রের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয় বৃদ্ধাকে।
এই বিষয়ে বৃদ্ধার আত্মীয় তপতী গাইন বলেন, "উনি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। ঠিক মতো কথাও বলতে পারেন না। ওঁর 2002 সালের সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম তো রয়েছেই। সেই সঙ্গে 1971 সালের ভোটার লিস্টেও নাম রয়েছে। 2008 সালের একটি ভোটার তালিকায় ওঁর নাম ভুল আছে। ননীবালার জায়গায় মিতা গাইন করা হয়েছে। ভোটার কার্ডে ফটো এবং এপিক নম্বর একই রয়েছে। সেই কারণেই শুনানিতে ডাকা হয়েছে। ওঁর এই অবস্থা শুনেও বিএলও পরিষ্কার বলে দেয়, বাড়িতে যাওয়া যাবে না। ওঁকে শুনানিতে সশরীরে যেতে হবে। এটা হেনস্তা ও হয়রানি ছাড়া আর কী হতে পারে!"
একই সুর শোনা গিয়েছে হিঙ্গলগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি ও তৃণমূল নেতা শহিদুল গাজীর গলাতেও। তাঁর কথায়, "ভারতের সংবিধানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। নিজেদের স্বার্থে কেন্দ্রীয় এজেন্সি-সহ নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করছে তারা।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা জানি 80 বছরের উপরে কারও বয়স হলে তাঁর বাড়িতে গিয়ে ভোট সংক্রান্ত কাজকর্ম করাটাই কমিশনের নিয়ম। কিন্তু, এক্ষেত্রে সেসব কিছুই মানা হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম সঠিকভাবে পালন করা। আসলে গায়ের জোরে সবকিছু করতে চাইছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু, গায়ের জোরে বেশিদিন সবকিছু চলে না। 2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনে মানুষ এর সমুচিত জবাব দেবে। ভদ্র ভাষায় আমরা এখনও কথা বলছি। এর পরেও যদি কমিশনের হেলদোল না-হয়, তাহলে যা করার তাই করব আমরা।"
অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে হিঙ্গলগঞ্জের বিডিও দেবদাস গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, "ঠিক কী হয়েছে, তা না-জেনে কোনও কথা বলতে পারব না। খোঁজ নিয়ে দেখছি। তার পর যা বলার বলব।"

