পাকিস্তানের জেলে বন্দি নামখানার তিন মৎস্যজীবী, ফিরিয়ে আনার আবেদন পরিবারের
বুধবার ওই তিন মৎস্যজীবীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন মথুরাপুরের সাংসদ তৃণমূলের বাপি হালদার৷ তিনি ওই তিন মৎস্যজীবী ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছেন৷

Published : February 25, 2026 at 6:22 PM IST
নামখানা (দক্ষিণ 24 পরগনা), 25 ফেব্রুয়ারি: রুটি-রুজির তাগিদে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে দেশের অন্যান্য রাজ্যে কাজে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা নেহাত কম নয়৷ অনেককে বিপদেও পড়তে দেখা গিয়েছে সাম্প্রতিক অতীতে৷ তবে ভিনরাজ্যে কাজে গিয়ে পাকিস্তানের জেলে বন্দি হয়ে যাওয়ার ঘটনা কার্যত নজিরবিহীন৷ আর সেই নজিরবিহীন ঘটনাই ঘটেছে দক্ষিণ 24 পরগনার নামখানায়৷
সেখানকার তিন মৎস্যজীবী পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে গিয়েছিলেন গুজরাতে৷ মূলত, মাছ ধরার কাজ করার জন্যই তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন৷ সেখান থেকে আরবসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে তাঁরা ঢুকে পড়েন পাকিস্তানের জলসীমায়৷ তার পর পাক-নেভির হাতে বন্দি হয়ে তাঁদের ঠাঁই হয় জেলে৷
তার পর কেটে গিয়েছে তিন বছর৷ এখনও ফেরেননি তাঁরা৷ বিভিন্ন জায়গায় দরবার করেও সুরাহা হয়নি পরিবারের৷ ফলে ওই তিনজন এখন কোন পরিস্থিতিতে রয়েছেন, তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে পরিবারের৷ তাঁদের কাতর আর্জি, মানুষগুলোকে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হোক৷ তাঁদের সেই আর্জি পৌঁছেছে মথুরাপুরের সাংসদ বাপি হালদারের কাছে৷ তিনি ওই পরিবারগুলির সঙ্গে বুধবার দেখা করেন৷ ওই তিনজনকে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন৷
নামখানার তিন মৎস্যজীবী বন্দি পাকিস্তানের জেলে
তপন মহাপাত্র, কাশীনাথ মণ্ডল ও দিলীপ বাগ৷ তিনজনই মৎস্যজীবী৷ তাঁদের বাড়ি দক্ষিণ 24 পরগনার নামখানার নাদাভাঙা গ্রামে৷ বছর পঞ্চাশের তপন, বছর আটান্নর কাশীনাথ এবং বছর আটচল্লিশের দিলীপ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে গুজরাতে গিয়েছিলেন 2023 সালে৷ মাছ ধরার কাজের জন্য তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন৷

পরিবারের দাবি, গুজরাত থেকে একটি ট্রলার নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান তাঁরা। মাছ ধরার সময় অসাবধানতাবশত আন্তর্জাতিক জলসীমা অতিক্রম করে পাকিস্তানের জলসীমায় ঢুকে পড়ে তাঁদের ট্রলার৷ তখন পাকিস্তানের নৌসেনা তাঁদের আটক করে। প্রথমে বিষয়টি পরিবারের কাছে অজানা ছিল৷ কিন্তু ঘটনার 20 দিন পর ট্রলারের মালিকের মাধ্যমে পরিবার বিষয়টি জানতে পারে।
উৎকণ্ঠায় তিন মৎস্যজীবীর পরিবার
বিষয়টি জানতে পেরে চিন্তায় পড়েন ওই তিন পরিবারের সদস্যরা৷ তাঁদের দাবি, পাকিস্তানের জেল থেকে পরিবারকেও চিঠি লিখেছেন ওই তিনজন৷ তবে 2024 সালের পর আর কোনও চিঠি আসেনি৷ ফলে তিনটি পরিবারই উৎকণ্ঠায় কাটাচ্ছে৷ তার উপর তপন-কাশীনাথ-দিলীপ, তিনজনই তাঁদের নিজেদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সদস্য ছিলেন৷ তাই তাঁদের উপস্থিতিতে আর্থিক সমস্যায় পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা৷

তাঁদের অনুপস্থিতিতে সংসার কার্যত থমকে গিয়েছে। ধার-দেনা করে চলছে নিত্যদিনের খরচ। সন্তানদের পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে৷ চিকিৎসার খরচ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তপন মাহাপাত্রের স্ত্রী মমতা মহাপাত্র বলেন, ‘‘আমার কোনও কিছুর প্রয়োজন নেই৷ শুধু আমার স্বামীকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে দিলেই হবে৷ আমি হাতজোড় করে অনুরোধ করছি৷’’
ঘটনাস্থলে তৃণমূলের সাংসদ
বিষয়টি জানতে পেরে বুধবার ঘটনাস্থলে যান মথুরাপুরের সাংসদ তৃণমূলের বাপি হালদার৷ তিনি ওই তিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন৷ ওই তিনজনকে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন৷ সাংসদ বলেন, ‘‘এটা আমাদের মানবিক কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে৷ গত পরশুদিন মিডিয়া ও সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি আমরা জানতে পারি৷ আমরা জেনে অবাক হলাম যে তিন বছর হয়ে গিয়েছে, আমাদের কাছে কোনও মেসেজ বা কোনও খবর পৌঁছায়নি৷’’
তৃণমূল সাংসদের দাবি, ‘‘ওঁরা মাননীয় শিশির অধিকারীর বাড়িতে গিয়েছিলেন৷ শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ রেখেছিলেন৷ তাঁরা বলেছিলেন এনে দেবেন৷ ওঁরা বললেন যে সেই কারণেই আমাদের কাউকে জানাননি৷ এটা আমাদের কাছে খুব খারাপ লেগেছে৷ জানাতেও দেয়নি৷ আবার করে দেয়নি৷’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘মানুষকে ভালো রাখাই আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য৷ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়টি জেনেছেন৷ এই তিনজনকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে বলেছেন৷ তিনি নিজেও বিদেশমন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন৷ সমস্ত তথ্য নিয়েছেন তিনি৷ যত দ্রুত সম্ভব এই তিনজনকে বাড়িতে ফেরানোর চেষ্টা করছি৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ও বিষয়টি দেখছেন৷ সর্বোচ্চ চেষ্টা করব এই তিনজনকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার৷’’
বাপি হালদারের আরও বক্তব্য, ‘‘এই বিষয়ে সংসদে সরব হব৷ নামখানার পাঁচটি পরিবার ইরাকে আটকেছিল৷ আমরা বলেছি৷ কিন্তু কিছু করেনি কেন্দ্র৷ পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে বিদেশমন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন৷ তার পর ওই পাঁচটি পরিবারকে আমরা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হই৷’’
সাংসদ যে স্বামীকে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছেন, সেকথা জানিয়েছেন তপন মহাপাত্রের স্ত্রী মমতা মহাপাত্রও৷ এখন দেখার পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে কবে বাড়ি ফেরেন নাদাভাঙা গ্রামের তিন মৎস্যজীবী তপন মহাপাত্র, কাশীনাথ মণ্ডল ও দিলীপ বাগ!
বিজেপি কী বলছে?
বিজেপির মথুরাপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি নবেন্দুসুন্দর নস্কর বলেন, ‘‘2023 সালে মথুরাপুর লোকসভা কেন্দ্রের নামখানার তিন মৎস্যজীবী-সহ কাঁথির চারজন মৎস্যজীবী মোট সাতজন মৎস্যজীবী গুজরাতে একটি ট্রলার মালিকের ট্রলারে মাছ ধরার সময় আরব সাগরে পাকিস্তানের উপকূল রক্ষী বাহিনীর হাতে জলসীমানা লঙ্ঘন করার অভিযোগে গ্রেফতার হয়।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আটক হওয়া মৎস্যজীবীর পরিবারের লোকজন তৎকালীন কাঁথির সাংসদ শিশির অধিকারীর দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তৎকালীন সাংসদ শিশির অধিকারী মৎস্য দফতর-সহ প্রশাসনিক বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে জানানো হয় ও বিদেশমন্ত্রকে জানানো হয়। জেলবন্দি অবস্থায় মৃত্যু হয় কাঁথির মৎস্যজীবী স্বপন রানার।’’
নবেন্দুসুন্দর নস্কর আরও বলেন, ‘‘সেই সময় প্রশাসনিকভাবে বহু চেষ্টা করা হয়েছে৷ পাকিস্তানের জেলে বন্দি থাকা মৎস্যজীবীদের ফেরানোর জন্য মথুরাপুর বিজেপি সংগঠনিক জেলার পক্ষ থেকে আবারও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন জানানো হবে। যাতে দ্রুত মৎস্যজীবীরা পরিবারের কাছে ফিরে আসেন, সেই ব্যবস্থা করা হোক প্রশাসনের পক্ষ থেকে।’’

