পাহাড়ের টানে ছুটছে বাঙালি, বিপদ কাটিয়ে কীভাবে সাফল্য ? জানালেন এভারেস্টজয়ী সৌমেন
পাহাড়ের টানে মন কাঁদে, আছে বিপদের হাতছানি ৷ কীভাবে সাফল্য ? আন্তর্জাতিক মাউন্টেন ডে'তে জানালেন এভারেস্ট জয়ী সৌমেন সরকার ৷

Published : December 11, 2025 at 3:13 PM IST
বর্ধমান, 11 ডিসেম্বর: পাহাড়ের অমোঘ টানে ছুটে চলেছে সাধারণ মানুষ, ছুটে চলেছে বাঙালি। পাহাড় মানেই পদে পদে বিপদ। বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। তবুও বিপদের হাতছানিকে পাত্তা না-দিয়ে ছুটে চলেছে মানুষ। কিন্তু কেন বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। আজ 11 ডিসেম্বর, বিশ্ব মাউন্টেন ডে ৷ কী কী নিয়ম মেনে চললে এড়ানো যাবে বিপদের সম্ভাবনা, কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ইটিভিকে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন সদ্য এভারেস্টজয়ী বাঙালি সৌমেন সরকার।
চলতি বছরের মে মাসে চারধাম যাত্রা শুরু হলে প্রথম মাসেই 84 জন পুণ্যার্থী প্রাণ হারান। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছিল কেদারনাথ যাওয়ার পথে। কেদারনাথ যাওয়ার পথে মৃত্যু হয়েছিল 38 জনের। বদ্রীনাথ যাওয়ার পথে 17 জন, গঙ্গোত্রী যাওয়ার পথে 15 জন, যমুনেত্রী যাওয়ার পথে 13 জন পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়। শুধু তাই নয়, সিকিমে পাহাড়ে বেড়াতে গিয়েও বেশ কিছু পর্যটকের মৃত্যু হয়। চলতি বছরেই মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেও বাড়ি ফিরতে পারেননি নদিয়ার রানাঘাটের বাসিন্দা পেশায় শিক্ষক সুব্রত ঘোষ (45) ৷ এভারেস্টের হিলারি স্টেপের কাছ থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু পাহাড়ের টানে দিনের পর পর দিন মানুষের আকর্ষণ যত বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও।
পাহাড়ে ওঠার সময় কী ধরনের সমস্যা দেখা দেয়
- পর্বতারোহীদের মতে পাহাড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা যেহেতু সেগুলো উচ্চ পার্বত্য এলাকা ফলে যত উপরের দিকে ওঠা যাবে ততই দেখা দেবে অক্সিজেনের ঘাটতি। বাতাসে কমে যায় অক্সিজেনের পরিমাণ ফলে পর্বতারোহীদের দেখা দেয় উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট, হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা। পাহাড়া ওঠা বা নামার ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্বতারোহীদের হাঁটতে হয়। সেক্ষেত্রে যারা কিছুটা অসুস্থ থাকেন কিংবা একটু বয়স বেশি কিংবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের কাছে এটা বিপজ্জনক ।
- সবচেয়ে বড় কথা পাহাড়ি এলাকায় আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার কারণে আবহাওয়া অতিদ্রুত বদলে যেতে থাকে। ফলে যে কোনও সময় পারদ নীচের দিকে নেমে যেতে পারে। প্রচণ্ড ঠান্ডা কিংবা বৃষ্টি অথবা অত্যাধিক তুষারপাতের কারণে শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এদিকে পাহাড়ি এলাকায় বেশিরভাগ এলাকা দুর্গম হওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থা সেইভাবে পাওয়া যায় না। প্রয়োজন মতো পাওয়া যায় না চিকিৎসক কিংবা অ্যাম্বুলেন্সও। ফলে, সবসময় প্রয়োজন মতো ওষুধ অক্সিজেন সিলিন্ডার পাওয়া যায় না।
এভারেস্টজয়ী সৌমেন সরকার

- চলতি বছরেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের রেকর্ড গড়েন বাঙালি অভিযাত্রী বর্ধমান শহরের বাসিন্দা সৌমেন সরকার। চলতি বছরের 15 মে তিনি এভারেস্টের চূড়ায় ভারতের বিজয় পতাকা উড়িয়েছেন।
- প্রায় 21 বছর ধরে বিভিন্ন পর্বত অভিযানে যাচ্ছেন 54 বছর বয়সি সৌমেন সরকার। পূর্ত দফতরের জাতীয় সড়ক সাব ডিভিশনের সহকারী বাস্তুকার হিসেবে তিনি কর্মরত হলেও তাঁর নেশা পর্বত অভিযান। ইতিমধ্যেই তিনি পাঁচটি পর্বত শৃঙ্গ জয় করেছেন ৷ 2018 সালের মাউন্ট স্টক কাংগ্রি, 2022 সালে মাউন্ট নুন, 2022 সালে মাউন্ট ইউনাম, 2023 সালে রাশিয়ার মাউন্ট এলব্রুস ও 2024 সালে মাউন্ট ডেও টিব্বা তিনি জয় করেন।
সৌমনের মতে, "মূলত দুর্গম আবহাওয়ার কারণে এভারেস্ট জয় করা খুব কঠিন। অন্যান্য অভিযানের সঙ্গে এভারেস্ট অভিযান সম্পূর্ণ আলাদা। এই অভিযানে তিনটে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আছে। খুম্ব গ্লেসিয়ার, হিলারি স্টেপ ও এভারেস্ট উইন্ডো। এই তিনটি পয়েন্ট খুব বিপজ্জনক। ফলে এভারেস্ট অভিযাত্রীদের এই তিন পয়েন্ট পার করতে গিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। এভারেস্ট অভিযানে যাওয়ার আগে ভারতের প্রথম এভারেস্ট জয়ী মহিলা বাচেন্দ্রী পালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি।

পাহাড়ে জলবায়ু কীভাবে পরিবর্তন হয় ?
- সাম্প্রতিক জলবায়ু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হিমালয়ের গড় তাপমাত্রা 0.3 ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে 0.7 ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে- যা বিশ্বের গড়ের চেয়েও বেশি ৷ এর ফলে দ্রুত গতিতে হিমবাহ গলে যাচ্ছে ৷ গত গ্রীষ্মে এরকমই একটি হিমবাহ ফেটে মাউন্ট এভারেস্টের কাছে অবস্থিত নেপালের থেম নামক জায়গাটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে ৷ ওই থেমেই জন্মেছেন কামি রিতা। যিনি একবার বা দু'বার নয় 31 বার এভারেস্ট পর্বতশৃঙ্গ আরোহণ করে নিজের রেকর্ড নিজেই ভেঙেছেন ৷ তিনি নেপালে 'এভারেস্ট ম্যান' নামে খ্যাত ৷
- 1953 সালের 29 মে নিউজিল্যান্ডের স্যর এডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নোরগে শেরপা পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গে প্রথম আরোহণ করেছিলেন ৷ হিলারি-তেনজিংয়ের সময়ের মতোই অধিকাংশ পর্বতারোহী সহজ ও নিরাপদ উপায়ে এভারেস্টে পৌঁছতে সাপ্লিমেন্ট অক্সিজেন সিলিন্ডারের উপর নির্ভর করেন ৷ কিন্তু ব্রিটিশ পর্বতারোহীরা নেপালে আসার আগে জার্মানির একটি পরীক্ষাগারে জেনন গ্যাস ব্যবহার করেছিলেন ৷ এই গ্যাস ক্রীড়াবিদদের জন্য নিষিদ্ধ ৷ জেনন গ্যাসের এই ব্যবহার এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে ৷
- কিন্তু জানা গিয়েছে, এই জেনন গ্যাস ব্যবহারের ফলে মানবদেহে অক্সিজেন বহনকারী লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ৷ এইভাবে, ব্রিটিশ পর্বতারোহীরা প্রাকৃতিক প্রভাব এড়িয়ে গিয়েছেন ৷ সাধারণত, এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছতে পর্বতারোহীদের সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে যায় ৷ কিন্তু পাহাড়ে ওঠা মানেই কিন্তু বিপদকে আহ্বান করা নয়।
বেশ কিছু নিয়ম কানুন মেনে চললে বিপদের সম্ভাবনা অনেক কমে যায় এমনটাই মত এভারেস্ট জয়ী সৌমেন সরকারের। ইটিভি ভারতের মুখোমুখি হয়ে এভারেস্ট বিজয়ী বাঙালি সৌমেন সরকার বলেন, "আমরা প্রকৃতিকে ভালোবেসে পাহাড়ে যাই। সেখানকার মাটি, জল, বাতাস মানুষের সঙ্গে আমরা একাত্ম হয়ে যাই। বিদেশে কিন্তু স্কুল জীবন থেকেই পাহাড় কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করে দেওয়া হয়। এভারেস্ট কিন্তু সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আর আট হাজার মিটারের উপরে একটা ডেথ জোন আছে তাই শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি তো থেকেই যায়। তবে দীর্ঘ প্রস্তুতি নিতে হবে। মানসিক ও শারিরীক সক্ষমতা থাকতে হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বেঁচে ফিরে আসা। কারণ ওঠার থেকে নামা বেশি কঠিন।"

আবহাওয়া সম্বন্ধে জেনে তবে পাহাড়ে ওঠা উচিত
এভারেস্ট বিজয়ীর কথায়, "আর যেহেতু আট হাজারের উপরে 'ডেথ জোন' তাই সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। আমি 21 বছর ধরে পাহাড়ে যাচ্ছি । ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিতে থাকি। পাহাড়কে যত্ন করে ব্যবহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে পাহাড়ে যাতে দূষণ না-হয় কারণ পাহাড় দূষিত হলে প্রকৃতির রোষানলে পড়তে হবে। আমাদের কিছু কু-অভ্যাসের জন্য মাঝেমধ্যে বিপর্যয় নেমে আসে। ফলে পাহাড় সুস্থ থাকলে আমরাও সেখানে বেড়াতে যেতে পারব। আর আগামী প্রজন্মের কাছে আবেদন পাহাড় মানেই মৃত্যু নয়। আসলে অভিজ্ঞতা না-থাকার কারণে পাহাড়ে উঠতে গেলে বিপদের মুখে পড়তে হয়। আমরা যদি যে পাহাড়ে যাব তার প্রকৃতি তার পরিবেশ তার আবহাওয়া সম্বন্ধে না-জেনে ওঠার চেষ্টা করি তাহলে বিপদের হাতছানি তো থাকবেই।"

জীবন আগে পরে পর্বত ভ্রমণ
সৌমেন সরকার আরও বলছেন, আমরা যারা মাউন্টেনিয়ার তারা কিন্তু প্ল্যান করি। একটা প্রোগ্রাম করতে গেলে ছয় থেকে আট মাস আগে প্রস্তুতি নিতে হয়। কোন সময় আবহাওয়া ভালো থাকবে। এমনকী সেখানে গিয়েও আবহাওয়া নিয়ে খোঁজ খবর নিতে হবে। সব কিছু জানার পরেই আমরা রওয়ানা দিই। কিন্তু এত কিছুর প্রস্তুতির পরেও কিন্তু সব ভেস্তে যেতে পারে। নীচে শুনলাম ভালো আবহাওয়া কিন্তু উপরে গিয়ে দেখা গেল খুব তুষারপাত হচ্ছে । সমস্ত রুট বন্ধ ফলে সেই সময় কিন্তু আর ঝুঁকি নিয়ে উপরের দিকে ওঠা যাবে না। কারণ জীবন আগে। জীবন থাকলে আবার ওঠা যাবে। বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে।
পাহাড় কিন্তু পাহাড়েই থাকবে
এভারেস্টজয়ী বাঙালি সবশেষে বলেন, "সব সময় যে সফল হবেন, তা নয় ৷ ব্যর্থতা স্বীকার করে শিখতে হবে। ফলে সামিট না-করে ফিরে যেতে হবে। তবে আগের তুলনায় এখন পাহাড়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে টান বেড়েছে । তবে বাংলার সব জেলা যে পাহাড় নিয়ে বেশি আগ্রহ তা নয়। হুগলি, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া-সহ বেশ কিছু জেলা পাহাড় নিয়ে বেশি উৎসাহী ৷ সেই তুলনায় বর্ধমান পিছিয়ে। তবে সব মিলিয়ে আমাদের রাজ্য অনেক এগিয়ে। মনে রাখতে হবে পাহাড় কিন্তু পাহাড়েই থাকবে, তাই ধীরে সুস্থে নিয়ম মেনে প্রস্তুতি নিতে পারলে বিপদের ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।"

