সুড়ঙ্গে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলেও থমকাবে না চাকা, দেশে প্রথম নয়া প্রযুক্তি কলকাতা মেট্রোয়
কলকাতা মেট্রো নেটওয়ার্কের ব্লু লাইনে চালু করা হয়েছে এই নয়া ব্যবস্থা ৷ যেখানে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলেও আটকে যাবে না মেট্রো ৷

Published : February 26, 2026 at 8:27 AM IST
কলকাতা, 26 ফেব্রুয়ারি: বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য হঠাৎই সুড়ঙ্গপথে আটকে পড়ে মেট্রো ৷ স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যাত্রীরা ৷ একাধিকবার এমন ঘটনার সাক্ষী হয়েছে কলকাতা মেট্রো ৷ তবে এবার সেসব দিন অতীত হতে চলেছে ৷ এমন এক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে যেখানে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও স্তব্ধ হবে না মেট্রো রেক ৷ নয়া প্রযুক্তি নির্ভর ব্যাটারির মাধ্যমে সচল থাকবে পরিষেবা ৷ কলকাতা মেট্রো নেটওয়ার্কের ব্লু লাইনে বসানো এই প্রযুক্তির নাম Battery Energy Storage System বা (BESS)। ভারতের মধ্যে কলকাতা মেট্রোতেই প্রথম এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি চালু করা হল ।
মূলত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেও যাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবিচ্ছিন্ন থাকে সেটাই ব্যাটারি ব্যাকাপের মাধ্যমে সুনিশ্চিত করা হবে । ইনভার্টার এবং অ্যাডভান্সড কেমিস্ট্রি সেল (ACC) ব্যাটারি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা গ্রিড ফেলিউর হলে ব্যাটারির সঞ্চিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে । এর ফলে হঠাৎই মেট্রো আটকে গেলেও সঞ্চিত বিদ্যুৎ দিয়ে ট্রেনটিকে পরের স্টেশন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যাবে । এছাড়াও গ্রিডের সমস্যা দেখা দিলেও মেট্রো চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে না । অন্যদিকে, এই ব্যবস্থা চালু হওয়ার ফলে অনেকটাই কমবে বিদ্যুতের খরচ ৷ অন্যদিকে, এটি পরিবেশবান্ধবও বটে ।

বিষয়টি নিয়ে মেট্রো রেলওয়ে কলকাতার জেনারেল ম্যানেজার সুব্রাংশু শেখর মিশ্র বলেন, "সেন্ট্রাল সাব-স্টেশনে 6.4 মেগাওয়াট ঘণ্টা বিইএসএস সফলভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে ৷ এটি দেশের কোনও মেট্রো স্টেশনে স্থাপিত প্রথম মাইক্রোগ্রিড সিস্টেম ৷ যার প্রতিটিতে 88টি র্যাক রয়েছে, সেগুলিতে একটি অন্তর্নির্মিত অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে ।এই ব্যাক-আপ অ্যাপ্লিকেশনটি কোনও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ক্ষেত্রে যাত্রীবাহী ট্রেনগুলিকে টেনে নিয়ে যাবে এবং যাত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য রেকটিকে নিকটতম স্টেশনে নিয়ে যাবে । এছাড়াও, যদি বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়, তাহলে টানেল ভেন্টিলেশন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাটি কাজ চালিয়ে যাবে এবং যাত্রীদের শ্বাসকষ্টের সম্মুখীন হতে হবে না ।"

একদিন আগে পরিচালিত একটি সফল পরীক্ষার পর এই উদ্যোগটিকে একটি প্রাথমিক প্রকল্প হিসাবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, "এটি একটি শুরুর পর্যায়, এবং আমরা ধীরে ধীরে এটিকে প্রসারিত করব । ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় আমরা এই বিইএসএসে আরেকটি পাওয়ার কনভার্টার উপাদান যুক্ত করতে চাই যাতে এটি অতিরিক্ত শক্তি শোষণ করতে পারে ৷ যা মেট্রো রেক অ্যাক্সিলারেটিভ মোডে না থাকার কারণে ব্যবহার করা যায় না ।"
ডেল্টা ইলেকট্রনিক্স ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন নায়ক এই পাওয়ার কনভার্টারটি তৈরি করেছেন ৷ তাঁর কথায়, "BESS দমদম থেকে মহানায়ক উত্তম কুমার পর্যন্ত পুরো টানেল অংশে সহায়ক বিদ্যুৎ প্রেরণ এবং যে কোনও ট্রেন চালাতে সক্ষম ।"
বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং স্মার্ট গ্রিন সলিউশনের একটি শীর্ষস্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের আধিকারিক বলেন, "BESS-এর মোতায়েনের ফলে ভারতজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক অবকাঠামো সরবরাহের আমাদের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ব্লু লাইনে শক্তি-সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সমাধান প্রদান করা হবে ৷"

2021 সালে ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অন অ্যাডভান্সড কেমিস্ট্রি সেল ব্যাটারি স্টোরেজ বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোচনা শুরু হয়েছিল । ওই বছরই ক্যাবিনেটের সম্মতিক্রমে এই 4 MW BESS এর কাজ শুরু হয় । 6.4 মেগাওয়াট সম্পন্ন লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (LFP) ব্যাটারি দ্বারা চালিত হয় ৷ সেই ব্যাটারিতে যে সংখ্যক বিদ্যুৎ সংগ্রহ করা থাকবে তাতে একটি রেককে ঘণ্টায় 55 km/hr গতিতে পরের স্টেশনে নিয়ে যাওয়া যাবে । এছাড়াও ভূগর্ভস্থ স্টেশনগুলিতে টানেল ভেন্টিলেশন এবং পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে এই প্রযুক্তি । এতে গ্রিন ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে ৷ যার ফলে এই ব্যবস্থা 14 বছর পর্যন্ত একটানা কাজ করে যেতে পারবে ।
উল্লেখ্য, গত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি অফিস টাইমে কলকাতা মেট্রো নেটওয়ার্কের ব্লু লাইনে হঠাৎই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় । যার জেরে সুড়ঙ্গ পথের মাঝে স্তব্ধ হয়ে যায় মেট্রো । ব্যস্ত সময় হওয়ায় মেট্রোর ভিতরে স্বাভাবিকভাবেই বহু যাত্রী ছিলেন । বাধ্য হয়ে থার্ড রেলে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে সুড়ঙ্গ দিয়ে হাঁটিয়ে বাইরে বের করা হয় যাত্রীদের ৷
প্রসঙ্গত, ব্লু লাইনে (দক্ষিণেশ্বর-শহিদ ক্ষুদিরাম রুটে) মেট্রো বিভ্রাট যেন নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে উঠেছে । কখনও রেক আটকে পড়ে আবার কখনও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য পরিষেবা ব্যাহত হয় তো আবার কখনও জানা যায়, সাপ্লাইয়ের সমস্যার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে মেট্রো ছাড়ছে না । তাই যাত্রীদের চূড়ান্ত হেনস্থার শিকার হওয়া থেকে ভারতের প্রথম কলকাতা মেট্রোয় এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি চালু করা হল ৷

