আদি গঙ্গায় ব্যারেজ তৈরি নিয়ে সোচ্চার পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা ! মেয়রের দাবি, ওটা লকগেট
নদী বাঁচাও কমিটির দাবি, প্রস্তাবিত আদি গঙ্গার উপর এই ব্যারেজ প্রকল্প সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী ৷

Published : January 8, 2026 at 9:27 PM IST
কলকাতা, 8 জানুয়ারি: কলকাতা পুরনিগম আদি গঙ্গার উপর দইঘাটে তৈরি করছে ব্যারেজ । এই প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞপ্তি । আদি গঙ্গায় কার পরামর্শে এমন সিদ্ধান্ত? এর প্রাসঙ্গিকতা ও পরিবেশের সুদীর্ঘ প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে সোচ্চার হল নদী বাঁচাও কমিটি । কোনও ব্যারেজ নয়, লকগেট হচ্ছে সেখানে, পালটা দাবি কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ।
আদি গঙ্গা রক্ষার লড়াই জোরদার করার বার্তা দিয়ে বুধবার কলকাতা পুরনিগমের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নদী বাঁচাও আন্দোলনের সংগঠকরা । এদিন সাংবাদিক সম্মেলনে ছিলেন, কলকাতা পুরনিগমের প্রাক্তন ডিজি টাউন প্ল্যানিং দীপঙ্কর সিনহা, প্রাক্তন কেআইটির প্ল্যানার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিবেশ বিজ্ঞানী তপন সাহা-সহ অন্যান্যরা ।
নদী বাঁচাও কমিটির তরফে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় ব্যারেজ তৈরির । তাতে জানানো হয়েছে, কলকাতা পুরনিগম হুগলি নদীর মুখে একটি ব্যারেজ দিয়ে আদি গঙ্গার জলস্রোত নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৷ এই আদি গঙ্গা অতীতে ছিল হুগলি নদীর মূল গতিপথ । পরে নদী মজে গেলে খনন ও সংস্কার করার পর এই জলধারা টালিনালা নামে পরিচিত হয় । ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন নিকাশি নালার অপরিশোধিত তরল ও কঠিন বর্জ্য অবাধ নিক্ষেপে আদি গঙ্গা অত্যন্ত দূষিত হয়েছে । এর উপরে এই জলপথের মাঝ বরাবর মেট্রোরেলের পিলারের সারি নির্মাণে জলস্রোত আরও রুদ্ধ করেছে ।
কিছুদিন আগেও আদি গঙ্গায় জোয়ার-ভাটার স্রোত ছিল এবং মৎস্যজীবীদেরও জীবিকা অর্জনের সহায়ক ছিল, যা দূষণের ফলে মাছ তো দূরের কথা, কোনও জলজ প্রাণ বেঁচে থাকার অযোগ্য । পরিবেশ দফতরের প্রকাশিত তথ্যে বর্ষাকালে জোয়ারের সময়েও আদি গঙ্গা সমেত হুগলি নদীর জল স্নানের যোগ্যতা মানের ধারে কাছেও নয় ।
নদী বাঁচাও কমিটির দাবি, এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন ছিল জলপথে ফেলার আগেই নিকাশি নালার তরল বর্জ্য বিজ্ঞানসম্মতভাবে পরিশোধন করা, পূর্ণ উদ্যোগ নিয়ে সমস্ত কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ করে অঞ্চলকে ও এই জলপথকে দূষণ মুক্ত করা । অতীতের বহু তথাকথিত উন্নয়নের কাজের প্রভাবে পরিবেশ আরও দূষিত হয়েছে । আজকের আদি গঙ্গার পরিস্থিতির কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষের অর্থে কিছু মানুষের বা কর্তৃপক্ষের অবিমৃষ্যকারিতার ফল ।
আর এই পরিস্থিতিতে নদী বাঁচাও কমিটি কিছু বিষয় তুলে ধরতে চেয়েছে । সেগুলি হল- নদী অববাহিকা অঞ্চলে দূষণ হ্রাস এবং গঙ্গা নদীর সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে ব্যাপক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আন্তঃক্ষেত্রীয় সমন্বয়কে উৎসাহিত করা । জলের গুণমান এবং পরিবেশগতভাবে সুস্থিতিশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঙ্গা নদীতে ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহ বজায় রাখা ।

বর্তমানে কেন্দ্রীয় জলশক্তি দফতরের হাতে এই দায়িত্ব ও বর্তমানে প্রকল্প পরিচালন কর্তৃপক্ষের নামকরণ পরিবর্তন করে হয়েছে, 'ন্যাশনাল গঙ্গা কাউন্সিল' (NGC) বা 'জাতীয় গঙ্গা পরিষদ'। এই পরিষদের অধীনে গঠিত 'ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা' (NMCG) ও রাজ্যের মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে গঠিত স্টেট গঙ্গা প্রোটেকশান অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কমিটি কাজ করছে । আইনানুযায়ী, এর দায়িত্ব গঙ্গা নদী সমেত এর সব শাখা নদী, উপনদী, খাল ও জলধারা একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা হিসাবে বিবেচিত করে তার দূষণ মুক্তি ও পুনরুজ্জীবনের সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ । প্রতি জেলাস্তরে রচিত পরিকল্পনা জনসমক্ষে প্রকাশ করে মতামত নেওয়া এবং জনসচেতনতারও উদ্যোগ নেওয়া প্রকল্পের আবশ্যিক কাজ । কিন্তু কলকাতা সন্নিহিত অঞ্চলে বিগত কয়েক বছরে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ ও পরিকল্পনা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে দাবি নদী বাঁচাও কমিটির ।
এদিন পরিবেশ বিজ্ঞানী তপন সাহা বলেন, "কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিকল্পনা কখনই জনসমক্ষে প্রকাশিত করে মানুষের অভিমত নেওয়া হয়নি । কেইআইপি-র অধীনে বেশ কয়েক হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যেই খরচ হয়ে গিয়েছে । সামান্য বৃষ্টিতেই শহর ভাসছে । আমরা আশা করেছিলাম বিভিন্ন নদী-খাল ইত্যাদির সঙ্গে ওই 'নমামি গঙ্গে' প্রকল্পে ঐতিহাসিক আদি গঙ্গার সত্যিই পুনরুজ্জীবন হবে । কিন্তু লোকচক্ষুর আড়ালে প্রায় 782 কোটি টাকা খরচে এতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রচনা ও রূপায়নের পদ্ধতি আমাদের সন্দিগ্ধ করে তুলছে ।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা লক্ষ্য করলাম যে আদি গঙ্গা পুনরুজ্জীবনের কথা বলা হলেও মোট প্রায় 75 কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের শুধুমাত্র 15.5 কিলোমিটার জলপথকে এই প্রকল্পের অধীনে আনা হয়েছে । দুই 24 পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্রকল্পের বাইরে থেকে গিয়েছে । বাকি অংশের পুনরুজ্জীবন কেন হবে না, আমরা জানি না । হুগলি নদী ও আদি গঙ্গার মিলন ক্ষেত্র দইঘাটে প্রায় 132.42 কোটি টাকা ব্যায়ে প্রস্তাবিত ব্যারেজের দীর্ঘকালীন পরিবেশগত প্রভাব অথবা 'এনভায়রনমেন্ট ইম্প্যাক্ট এসেসমেন্ট রিপোর্ট' (EIA) জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি । আদি গঙ্গার উপরে স্লইশ গেট বা ব্যারেজ নির্মাণ করলে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা ও স্রোত রুদ্ধ হবে, যা জাতীয় 'নমামি গঙ্গে' মিশনের ঘোষিত নীতির বিরোধী ।"
তাঁর কথায়, "ভাঁটির দিকের সংস্কার না করে উজানের দিকে ব্যারেজ নির্মাণ করে নিকাশি জল ক্রমাগত ফেললে আদিগঙ্গাকে বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত করবে, যা আরও দূষণের সহায়ক হবে, পলি জমে আরও নাব্যতা ও ধারণক্ষমতা হারাবে শুধু নয়, দক্ষিণের শহর ও শহরতলির নীচু এলাকার মানুষের আরও বানভাসি হয়ে জীবন-জীবিকা বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে পারে । আমরা নানা সূত্রে জেনেছি যে, এই ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্প 'নমামি গঙ্গে' প্রকল্পে উল্লেখ নেই, এটি জাতীয় ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির (NDMA) অধীনে আরবান ফ্লাড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামে (UFRMP) জাতীয় অর্থে (NDMF) আলাদা করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে । একই নদীতে একটি বৃহৎ প্রকল্প শেষ না করেই একই ধরনের আর একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হল৷ আমাদের সন্দেহ, প্রস্তাবিত এই ব্যারেজ প্রকল্প সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী ।"
এদিন নদী বাঁচাও সংগঠনের তরফে এই ব্যারেজ তৈরির নির্মাণের আগে বেশ কিছু দাবি করা হয় । সেগুলি হল -
- কলকাতা ও সন্নিহিত অঞ্চলের নিকাশি ব্যবস্থা নিয়ে সামগ্রিক পরিকল্পনা নিয়ে সাধারণের মতামত সংগ্রহ করতে হবে ।
- আদি গঙ্গার দক্ষিণ অংশ সমেত পূর্ণ দৈর্ঘ্য ও কলকাতা সন্নিহিত সমস্ত নদী ও খালের সংস্কার করতে হবে । আদি গঙ্গা সমেত সব নদী ও খালে বিজ্ঞানসম্মতভাবে দুষিত তরল ও কঠিন বর্জ্য নিষ্কাশন সম্পূর্ণ রোধ করতে হবে ।
- আদি গঙ্গা সমেত এই অঞ্চলের সমস্ত নদী ও খালগুলির পলি নিয়মিত উত্তোলন করে নাব্যতা বজায় রাখতে হবে ।
- আদি গঙ্গা সমেত সব গুরুত্বপূর্ণ নদী ও খালগুলির অন্তত ত্রিশ মিটার তীরভূমি নির্মাণ মুক্ত রাখতে হবে ।
- হুগলি নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি করতে হবে ও দুই পাড়ের পঞ্চাশ মিটার তীরভূমিতে নির্মাণ নিষিদ্ধ করতে হবে ।
- দইঘাটে প্রস্তাবিত ব্যারেজের কাজের আগে 'এনভায়রনমেন্ট ইম্প্যাক্ট এসেসমেন্ট রিপোর্ট' জনসমক্ষে প্রকাশিত করতে হবে । কলকাতা ও সন্নিহিত অঞ্চলে 'নমামি গঙ্গে' প্রকল্প ও ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প নিয়ে জন-শুনানির ব্যবস্থা করতে হবে ।
- কলকাতা শহরের নিকাশি ব্যবস্থা নুন্যতম প্রতি এক বছরের সর্বাধিক গড় বৃষ্টিপাত অনুযায়ী নির্মাণ করতে হবে ।
- প্রতিটি কারখানায়, বড় বড় আবাসনে নিজস্ব ব্যবস্থায় বর্জ্য সম্পূর্ণ শোধন করতেই হবে ।
- সমস্ত বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে ও অব্যবস্থার জন্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে ।
- নদী ও খাল জোনিং রেগুলেশন তৈরি করে প্রয়োগ করতে হবে ।
- রামসার সাইট ঘোষিত পূর্ব কলকাতা জলাভূমির জলাশয় ও খাল সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে । বেআইনি নির্মাণ বন্ধ করতে হবে ।
এই দাবি যখন আদি গঙ্গার রক্ষার লড়াইয়ের বার্তা দিয়ে তুলে ধরেছেন আন্দোলনকারীরা, তখন পালটা তাঁদের তোপ দেগেছেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম । তিনি বলেন, "এখন সব জায়গা থেকে পরিবেশবিদরা এসে দাঁড়িয়ে পড়ছেন । বাম আমলে এরা কোথায় ছিলেন? 650 কোটি টাকা ব্যয় করে আদি গঙ্গাকে পুনরুজ্জীবিত এবং সংস্কারের কাজ চলছে । কোথাও কোনও ব্যারেজের ঘোষণা করা হয়নি । একটি লকগেট তৈরি করা হয়েছে । এর সঙ্গে ব্যারেজের কোনও সম্পর্ক নেই ।"

