তল্লাশির সময় জরুরি নথি জোর করে নিয়ে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী, অভিযোগ ইডি-র
ইডি ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ দায়ের কলকাতা ও বিধাননগর পুলিশের কাছে৷

Published : January 8, 2026 at 7:39 PM IST
কলকাতা, 8 জানুয়ারি: ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আইপ্যাকের সল্টলেকের অফিস এবং সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে বৃহস্পতিবার তল্লাশি অভিযান চালায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)৷ সেই সময় দু’টি জায়গাতে উপস্থিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ নথি জোর করে নিয়ে চলে গিয়েছেন, এমনটাই অভিযোগ তোলা হয়েছে ইডি-র তরফে৷
এদিকে ইডির তল্লাশি অভিযান নিয়ে পালটা দু’টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে কলকাতা ও বিধাননগর পুলিশের কাছে৷ কলকাতা পুলিশে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে প্রতীক জৈনের পরিবার ও পুলিশের তরফে৷ অন্যদিকে আইপ্যাকের অফিসে তল্লাশি নিয়ে বিধাননগর পুলিশের কাছে দায়ের হয়েছে একটি অভিযোগ৷
কয়লা-কাণ্ডে ইডির তল্লাশি অভিযান
ইডির তরফে জানানো হয়েছে, 2020 সালের 27 নভেম্বর অনুপ মাজি ও আরও অনেকের বিরুদ্ধে কয়লাপাচার কাণ্ডে অভিযোগ দায়ের করে সিবিআই৷ পরদিন, ইডির তরফে এই বিষয়ে আর্থিক তছরূপ সংক্রান্ত মামলা দায়ের করা হয়৷ তদন্তে উঠে আসে যে অনুপ মাজি পরিচালিত এই চক্র ইসিএলের ইজারাভুক্ত এলাকা থেকে কয়লা চুরি করত৷ তা বিক্রি করা হতো বাঁকুড়া, বর্ধমান, পুরুলিয়া ও অন্যান্য জেলার বিভিন্ন কারখানা বা প্ল্যান্টে৷

ইডির দাবি, তদন্তে আরও জানা যায় যে এই কয়লার একটি বড় অংশ শাকম্ভরী গ্রুপ অফ কোম্পানিজকে বিক্রি করা হয়েছিল। তদন্তে হাওয়ালা অপারেটরদের সঙ্গেও যোগসূত্রের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তির জবানবন্দি-সহ একাধিক প্রমাণ হাওয়ালা যোগসাজশের বিষয়টি নিশ্চিত করে। কয়লাপাচারের টাকা যেসব হাওয়ালা অপারেটরের কাছে গিয়েছিল, তাদের একজন আইপ্যাককে কয়েক কোটি টাকা লেনদেনে সাহায্য করে৷
ইডি জানিয়েছে, সেই বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহে বৃহস্পতিবার তল্লাশি চালানো হয়৷ কয়লাপাচারের মাধ্যমে যারা টাকা পেয়েছে, হাওয়ালা অপারেটর এবং হ্যান্ডলারদের বিরুদ্ধেই অভিযান চালানো হয়৷ আইপ্যাকও হাওয়ালার অর্থের সঙ্গে যুক্ত একটি সংস্থা৷ সেই কারণে তাদেরও তল্লাশির আওতায় আনা হয়৷
মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ইডির অভিযোগ
এদিন তল্লাশির খবর ছড়িয়ে পড়তেই লাউডন স্ট্রিটে হাজির হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ পরে তিনি সল্টেলেকে আইপ্যাকের অফিসেও যান৷ তিনি এই নিয়ে বিজেপি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন৷ দুই জায়গা থেকেই তাঁকে কিছু নথি নিয়ে যেতেও দেখা যায়৷ পরে প্রেস বিবৃতি জারি করে এই নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোপ দাগে ইডি৷
তাদের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লি মিলিয়ে দশটি জায়গায় এদিন তল্লাশি চালানো হয়৷ এর মধ্যে ছ’টি জায়গা ছিল পশ্চিমবঙ্গে৷ কলকাতায় তল্লাশির সময় কলকাতা পুলিশের তরফে ঘটনাস্থলে এসে তদন্তকারী আধিকারিকদের পরিচয়পত্র যাচাই করা হয়৷ সেখানে কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ কুমার ভার্মাও এসেছিলেন বলে ইডি জানিয়েছে৷
বিবৃতিতে এর পরের অংশেই ইডি তোপ দাগে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে৷ আইপ্যাকের কর্ণধারের বাড়িতে মুখ্যমন্ত্রীর যাওয়া নিয়ে তারা লিখেছে, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ-কর্মকর্তাকে নিয়ে আসার আগে পর্যন্ত কাজ শান্তিপূর্ণ ও পেশাদারভাবে চলছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতীক জৈনের বাড়িতে আসেন এবং নথি ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস-সহ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নিয়ে চলে যান।’’
সল্টলেকে আইপ্যাকের অফিসে যে মুখ্যমন্ত্রী গিয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রেস বিবৃতিতে ইডি লিখেছে, ‘‘এরপর মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি আই-প্যাকের কার্যালয়ে যায়৷ যেখান থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর সহযোগীরা এবং রাজ্য পুলিশের কর্মীরা জোরপূর্বক নথি ও ইলেকট্রনিক প্রমাণ সরিয়ে ফেলেন।’’ ইডি জানিয়েছে, এই পদক্ষেপ তাদের তল্লাশি অভিযানে বাধা সৃষ্টি করেছে৷
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তল্লাশির অভিযোগ খারিজ
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আরও দাবি, প্রমাণের ভিত্তিতে এদিন তল্লাশি অভিযান চালানো হয়৷ কোনও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে উদ্দেশ্য করে এই তল্লাশি অভিযান চালানো হয়নি৷ কোনও দলের কার্যালয়েও তল্লাশি করা হয়নি৷ এর সঙ্গে নির্বাচনের কোনও সম্পর্ক নেই৷ এই অভিযান অর্থপাচারের বিরুদ্ধে নিয়মিত করা পদক্ষেপেরই অংশ৷ আইন মেনেই তল্লাশি অভিযান চলছে৷
ইডির বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ
এদিন সকাল 6টা নাগাদ প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি অভিযান শুরু করে৷ প্রায় ন’ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চলে৷ দুপুর 3টে নাগাদ ইডির আধিকারিকরা ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান৷ তার পরই ইডি ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে দু’টি অভিযোগ দায়ের হয়৷ কলকাতা পুলিশের অধীনস্ত শেক্সপিয়র সরণি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন প্রতীক জৈনের স্ত্রী৷ পুলিশ সূত্রে খবর, ইডির বিরুদ্ধে তিনি বাড়ি থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি চুরির অভিযোগ দায়ের করেছেন৷
এদিকে লালবাজারের একটি সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, পুলিশের তরফেও একই সঙ্গে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে৷ সেই অভিযোগ দায়ের হয়েছে অজ্ঞাতপরিচয় ইডি ও সিআরপিএফ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে৷
প্রতীক জৈনের বাড়ি শেক্সপিয়র সরণি থানা এলাকায়৷ তাই তাঁর পরিবার সেখানে অভিযান জানিয়েছেন৷ তবে আইপ্যাকের অফিস সল্টলেকে৷ তা বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট এলাকার ইলেকট্রনিক্স কমপ্লেক্স থানা এলাকায় অবস্থিত৷ অফিসে তল্লাশি সংক্রান্ত বিষয়ে ইডির বিরুদ্ধে বিধাননগরের ইলেকট্রনিক্স কমপ্লেক্স থানাতেও একটি অভিযোগ দায়ের হয়েছে৷

