ETV Bharat / state

চেয়ারম্যান বদল নিয়ে ভিন্ন মতামতে বিড়ম্বনায় তৃণমূল ! প্রকাশ্যে নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্ব

পদ থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে বারাসত পুরসভার চেয়ারম্যান অশনি মুখোপাধ্যায় ও ময়নাগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান অনন্ত দেব অধিকারীকে ৷

municipality chairman change
অনন্ত দেব অধিকারী ও অশনি মুখোপাধ্যায় (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : November 8, 2025 at 3:03 PM IST

8 Min Read
Choose ETV Bharat

বারাসত/ জলপাইগুড়ি, 8 নভেম্বর: পুরসভার চেয়ারম্যান বদল নিয়ে ভিন্ন মত দলের অন্দরে ৷ অপমানিত বোধ করে কাউন্সিলর পদও ছাড়লেন এক বিদায়ী চেয়ারম্যান ৷ এই পরিস্থিতিতে বিড়ম্বনা বাড়ল তৃণমূলের ৷ ফের প্রকাশ্যে এল তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পুরনো প্রবীণ কর্মীদের দূরত্বের তত্ত্ব ৷ কটাক্ষ করতে ছাড়েনি বিজেপি ৷

মূলত বছর ঘুরলেই রাজ‍্যে ছাব্বিশের নির্বাচন ৷ তার আগে শহুরে এলাকায় মানুষের আস্থা অর্জন করতে পুর প্রশাসনে রদবদল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব । বিশেষ করে চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে যে সমস্ত পুর এলাকায় ফলাফলের নিরিখে শাসক শিবিরের থেকে বিরোধী গেরুয়া শিবির এগিয়ে রয়েছে সেই সমস্ত পুরসভার চেয়ারম্যান অথবা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বদল ঘটিয়ে বিধানসভা ভোটের আগে হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেস ।

ময়নাগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান বদল নিয়ে ভিন্ন মতামতে বিড়ম্বনায় তৃণমূল (ইটিভি ভারত)

সেই আবহেই এবার উত্তর 24 পরগনা জেলার সদর শহর বারাসত পুরসভার চেয়ারম্যান পদে ছেঁটে ফেলা হল তৃণমূল নেতা অশনি মুখোপাধ্যায়কে । সেই জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে তাঁরই সতীর্থ পুরসভার দু'বারের চেয়ারম্যান তথা শাসক দলের বরিষ্ঠ নেতা সুনীল মুখোপাধ্যায়কে । অন্যদিকে জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান অনন্ত দেব অধিকারীকেও দলের তরফে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে ৷ অনন্তকে সরিয়ে ময়নাগুড়ি পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান মনোজ রায়কে সেই পদে বসানো হয়েছে ।

তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, দলীয় নির্দেশ পেয়ে শুক্রবারই অশনি মুখোপাধ্যায় তাঁর পদত্যাগপত্র তুলে দিয়েছেন পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান তাপস দাশগুপ্ত'র হাতে । সেই সঙ্গে দলের বারাসত সংসদীয় জেলার সভাপতিকেও চিঠি পাঠিয়ে পদত্যাগের বিষয়টি জানিয়েছেন পুরসভার সদ‍্য প্রাক্তন চেয়ারম্যান । সূত্রের খবর, সোমবার পুরসভার চেয়ারম্যান পদে শপথ নিতে পারেন বোর্ড অফ কাউন্সিলার্সের বৈঠকে মনোনীত হওয়া শাসক দলের বর্ষীয়ান নেতা সুনীল মুখোপাধ্যায় ।

municipality chairman change
কাকলি ঘোষ দস্তিদার (নিজস্ব ছবি)

এদিকে, বারাসত পুরসভার চেয়ারম্যান পদ বদল ঘিরে তৃণমূলের অন্দরেই তৈরি হয়েছে ভিন্ন মত ৷ দলের সংসদীয় জেলার সভাপতি তথা তৃণমূলের চিকিৎসক-সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেছেন, "ব‍্যক্তিগত কারণেই উনি(অশনি)পদত্যাগ করেছেন । এটা ও'র নিজস্ব ব‍্যাপার । এ নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই । উনি কেন পদত্যাগ করেছেন ও'র ব‍্যাপার । আমি কী করে বলব?উনি এ নিয়ে আগে কিছুই জানাননি ।"

যদিও কাকলির দাবি উড়িয়ে সদ‍্য পুরসভার চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারিত অশনি মুখোপাধ্যায় আবার এ নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন । তাঁর কথায়, "উনি(কাকলি)কেন ব‍্যক্তিগত বলছেন, সেটা ও'র ব‍্যাপার । আমি এটুকু জানি দলের নির্দেশ ছিল । সেই নির্দেশ মেনেই আমি পদত্যাগ করেছি । দলের বারাসত সংসদীয় জেলার সভাপতি ও সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার নিজেই আমাকে ফোন করেছিলেন । তিনি ফোনে জানিয়েছিলেন, দলের তরফে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আমি যেন আমার পদত্যাগপত্র পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যানের হাতে তুলে দিই । সেই নির্দেশ মোতাবেক আমি আমার পদত্যাগপত্র তুলে দিয়েছি ভাইস চেয়ারম্যানের হাতে । দলের জেলা সভাপতির কাছেও পদত্যাগের প্রতিলিপি পাঠিয়েছি । আমি শুধুমাত্র কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নির্দেশ পালন করেছি ।"

municipality chairman change
অশনি মুখোপাধ্যায় পদত্যাগপত্র তুলে দিলেন তাপস দাশগুপ্তের হাতে (নিজস্ব ছবি)

পুরসভার চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণের বিষয়ে অশনি বলেন, "সংগঠনের ভালো হবে নিশ্চিত ভেবেই দলীয় নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে । পুরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দল আশানুরূপ যা চেয়েছিল হয়তো তা পূরণ করতে পারিনি । তবে, এটুকুই বলব যবে থেকে চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি তবে থেকেই মানুষের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছি । কখনও হয়তো কাজ করতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছি । কিন্তু, দায়িত্ব পালন করা থেকে সরে আসেনি । এর রদবদলের ফলে দলের উপকার হবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস ।"

কাকলি-অশনির দাবি এবং পালটা দাবি ঘিরে ভোটের মুখে বিড়ম্বনা বেড়েছে শাসক দলের অন্দরেই । যা নিয়ে আবার কটাক্ষ করতে ছাড়েনি গেরুয়া শিবির । বিজেপির রাজ‍্য কমিটির সদস্য তাপস মিত্র বলেন, "পুরসভার চেয়ারম্যান পদ বদল নিয়েও তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে এসেছে । তা স্পষ্ট কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং অশনি মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্য থেকেই । দু'জনে ভিন্ন মত পোষণ করছেন । আসল সত্য হল তোলাবাজি, কাটমানির ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দ্বন্দ্ব চলছিল সদ‍্য প্রাক্তন ও বর্তমান চেয়ারম্যানের মধ্যে । সেই দ্বন্দ্বেরই মাশুল দিতে হল অশনি মুখোপাধ্যায়কে ।"

municipality chairman change
বারাসত পুরসভার বিদায়ী চেয়ারম্যান অশনি মুখোপাধ্যায় (নিজস্ব ছবি)

অন্যদিকে দলের অন্যান্য কাউন্সিলররা কেউ কাকা, কেউ জ্যেঠু, কেউ দাদা বলে ডাকেন । তাঁদের পেছনের বেঞ্চে বসা সম্ভব নয় ৷ তাই দলের নির্দেশে কেবল ময়নাগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান হিসাবে নয়, কাউন্সিলর পদ থেকেও একইসঙ্গে ইস্তফা দিলেন তৃণমূলের অনন্ত দেব অধিকারী ।

গত বৃহস্পতিবার ময়নাগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে রদবদল করে তৃণমূল কংগ্রেস । অনন্ত দেব অধিকারীর দাবি, তাঁকে না জানিয়েই চেয়ারম্যান পদে অন্য কাউকে বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং দলের তরফে তাঁকে পদত্যাগ করতে বলা হয় । আর এতেই অপমানিত বোধ করেন তিনি । আর এরপরেই শুধু চেয়ারম্যান নয়, কাউন্সিলর পদও ছাড়লেন অনন্ত দেব অধিকারী । জলপাইগুড়ি সদর মহকুমা শাসকের দফতরে এসে শুক্রবার তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন ।

maynaguri municipality chairman change
বারাসত পুরসভার চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পাওয়া সুনীল মুখোপাধ্যায় (নিজস্ব ছবি)

এদিন ময়নাগুড়ি পুরসভার বিদায়ী চেয়ারম্যান অনন্ত দেব অধিকারী বলেন, "দলের নির্দেশ আমাকে পুরসভার চেয়ারম্যান হিসাবে পদত্যাগ করতে হবে । তাই আমি পদত্যাগপত্র জমা দিতে এসডিও অফিসে এসেছি । আমি চেয়ারম্যান পদ শুধু নয়, কাউন্সিলর পদ থেকেও সরে যাচ্ছি । কারণ আমার পক্ষে কেবল চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দিয়ে কাউন্সিলর হয়ে পেছনের বেঞ্চে বসা সম্ভব নয় । তাই কাউন্সিলর হিসাবেও পদত্যাগ করছি । অন্যান্য কাউন্সিলররা সবাই আমার থেকে ছোট ৷ স্নেহের পাত্র । অন্যান্য কাউন্সিলররা কেউ কাকা, কেউ জ্যেঠু, কেউ দাদা বলে ডাকেন । তাদের পেছনের বেঞ্চে বসা সম্ভব নয় ৷"

তিনি আরও বলেন, "আমি আমার ওয়ার্ডের মানুষকে ডেকে বোঝাব । আমি দীর্ঘদিনের রাজনীতির লোক । কোনও দিন গ্রাম পঞ্চায়েতের ভোটে দাঁড়ায়নি । পঞ্চায়েত সমিতিতে দাঁড়িয়ে ভোটে জিতেছি । এরপর বিধায়ক হয়েছি । আমিই ময়নাগুড়ি পুরসভার দাবি আদায় করেছি । আমিই পুরসভার প্রথম চেয়ারম্যান হয়েছি । কিন্তু চেয়ারম্যান হিসাবে পদত্যাগ করতে হবে আমাকে কেউ আগে জানায়নি । আমি হতবাক । অপমানিত বোধ করলাম । আমি দলের নির্দেশ পালন করেছি । আগামীতেই দল যা বলবে সেটাই করব । তবে আমি 1978 সাল থেকে আমি জনপ্রতিনিধি । এমন অবস্থা কোনদিন হয়নি ।"

Ananta Deb Adhikari
মহকুমা শাসকের দফতরে পদত্যাগপত্র জমা দেন অনন্ত দেব অধিকারী (নিজস্ব ছবি)

তাঁর কথায়, "তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে বিধায়ক হয়েছি । তাছাড়া এই সরকারের আমলে অনেক বড় বড় পদে ছিলাম । এখন কেবল কাউন্সিলর হয়ে থাকতে হবে এটা মেনে নিতে পারছি না । চেয়ারম্যান পদ থেকে সরাবে সেটা নিয়েই দল আমার সঙ্গে আলোচলা করেনি । অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পুরনো প্রবীণ কর্মীদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে এটা বাস্তব কিন্তু বলা কঠিন ।"

প্রসঙ্গত, ময়নাগুড়ির দু'বারের বিধায়ক অনন্ত দেব অধিকারী ৷ তাঁর হাত ধরেই ময়নাগুড়ির পুরসভা তৃণমূলের হাতে এসেছে । 2022 সালে ময়নাগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান হিসাবে নির্বাচিত হন তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা অনন্ত দেব অধিকারী । সেসময় থেকে ভাইস চেয়ারম্যান হিসাবে ছিলেন মনোজ রায় । এবার অনন্তকে সরিয়ে ময়নাগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান করা হয়েছে সেই মনোজকে । পাশাপাশি মনোজের জায়গায় ময়নাগুড়ি পুরসভার 4 নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সোমেশ সান্যালকে ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়েছে ।

উল্লেখ্য, গত লোকসভা নির্বাচনে বারাসত আসনটি তৃণমূল জিতলেও পুর এলাকার ফলাফল একেবারেই আশানুরূপ হয়নি শাসক দলের । পুরসভার মোট 35টি ওয়ার্ডের মধ্যে 29টি ওয়ার্ডেই পিছিয়ে ছিল তারা । বাকি 6টি ওয়ার্ডে কোনও রকমে বিজেপির থেকে এগিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস । ভোটের আগে পুরসভা ভিত্তিক এই ফলাফল তৃণমূল দলের কাছে অশনি সঙ্কেত বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল । শহরাঞ্চলে ভোট কমার কারণ খুঁজতে গিয়ে শাসক দলের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে উঠে আসে নাগরিক পরিষেবা নিয়ে পুরসভার ব্যর্থতা । এছাড়া, পুর-পরিষেবা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ এবং প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তো রয়েছেই ৷

এমন রিপোর্ট উঠে আসার পরেই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দোপাধ্যায় উদ্যোগী হন পুরসভা বা জেলা নেতৃত্ব বদল করার । গত কয়েক মাস ধরে শাসক দলের জেলা ও ব্লক স্তরের নেতৃত্ব বদলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে । এবার শুরু হয়েছে পুরসভার চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যান রদবদলের প্রক্রিয়া । তারই অংশ হিসেবে বদল করা হল বারাসত ও ময়নাগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যানকে ৷