রাসায়নিক ছাড়া রঙের চমক ! মন্দিরবাজারে ভেষজ আবিরের চাহিদা তুঙ্গে
মন্দিরবাজারের আবির শুধু জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই । কলকাতা, উত্তর 24 পরগনা-সহ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসছেন আবির কিনতে ।

Published : February 28, 2026 at 8:00 PM IST
মন্দিরবাজার, 28 ফেব্রুয়ারি: 'মধুর অমৃতবাণী বেলা গেল সহজেই, মরমে উঠিল বাজি বসন্ত এসে গেছে !' ঋতুরাজের আগমনী বার্তায় ইতিমধ্যেই রঙিন হয়ে উঠছে চারপাশ । দোল ও হোলির আর বেশি দেরি নেই । বসন্তের মিঠে হাওয়ায় রঙের উচ্ছ্বাসে মেতে উঠবে রাজ্যবাসী । আর সেই রঙের উৎসবকে ঘিরেই চরম ব্যস্ততা দক্ষিণ 24 পরগনার মন্দিরবাজারের বিভিন্ন আবির কারখানায় ।
প্রতি বছরের মতো এবারও উৎসবের আগে উৎপাদন তুঙ্গে । সকাল হতেই কারখানায় শুরু হয়ে যায় কাজ । গভীর রাত পর্যন্ত চলে রং মেশানো, শুকোনো, ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নেওয়া এবং প্যাকেটজাত করার প্রক্রিয়া । নাওয়া-খাওয়া ভুলে কারিগররা দিনরাত এক করে আবির তৈরির কাজ করে চলেছেন । কারখানার ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে রঙের বাহার ৷ টকটকে লাল, উজ্জ্বল হলুদ, সবুজ, নীল, গোলাপি, কমলা, বেগুনি ও সাদা-মোট আট ধরনের আবির তৈরি হচ্ছে এখানে ।
এবারের দোলের বিশেষ আকর্ষণ রাসায়নিকমুক্ত সুগন্ধি আবির । ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে সম্পূর্ণ কেমিক্যালবিহীন উপাদান দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এই আবির । ফলে ত্বকের কোনও ক্ষতির সম্ভাবনা নেই বলেই দাবি করেছেন প্রস্তুতকারকরা । বর্তমানে সচেতনতার কারণে অনেকেই কৃত্রিম রঙের পরিবর্তে প্রাকৃতিক ও নিরাপদ আবিরের দিকেই ঝুঁকছেন । আর সেই কারণেই মন্দিরবাজারের আবিরের চাহিদা বেড়েছে চোখে পড়ার মতো ।
আবির কারখানার মালিক অভিজিৎ পুরকাইত বলেন, "গত বছরের তুলনায় এ বছর আবিরের চাহিদা অনেক বেশি । আমাদের এখানে যে আবির তৈরি হয়, তাতে কোনও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না । সম্পূর্ণ নিরাপদ উপাদান দিয়ে তৈরি । তাই ব্যবসায়ীরা নির্ভয়ে কিনছেন । এবার দোল উৎসবের আগে প্রচুর অর্ডার এসেছে ।"

মন্দিরবাজারের আবির শুধু দক্ষিণ 24 পরগনাতেই সীমাবদ্ধ নেই । কলকাতা, উত্তর 24 পরগনা-সহ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসছেন আবির কিনতে । কাকদ্বীপ, নামখানা, ডায়মন্ড হারবার, ক্যানিং, পাথরপ্রতিমা, বজবজ-সহ একাধিক এলাকায় এখানকার আবির সরবরাহ করা হয় । জেলার মধ্যে এই আবিরের আলাদা সুনাম রয়েছে বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও । চাহিদা সামাল দিতে স্থানীয় শ্রমিকদের পাশাপাশি ভিনরাজ্য থেকেও কারিগর-শ্রমিক আনা হয়েছে ।

বিহার থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিক চিন্টু খুশবা বলেন, "আমরা 10 জন বিহার থেকে এখানে কাজ করতে এসেছি । বছরে প্রায় দু'মাস এই আবিরের কাজ হয় । এই সময়টা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ । দিনরাত পরিশ্রম করে মাসে 15-16 হাজার টাকা আয় করি ।" তাঁর কথায়, "কাজ কঠিন হলেও উৎসবের আনন্দে নিজেদের অংশীদার করতে পারার আনন্দ আলাদা ।"

স্থানীয় রং ব্যবসায়ী গৌর মজুমদার বলেন, "এখন আবিরের চাহিদা রঙের চেয়ে অনেক বেশি । প্রতি বছর আমরা এখান থেকেই আবির কিনে নিয়ে যাই । মান ভালো, দামও সঠিক । তাই ক্রেতাদের আস্থা রয়েছে ।"

বসন্ত মানেই নতুনের ডাক, আনন্দের উচ্ছ্বাস । আর সেই উচ্ছ্বাসকে রঙিন করে তুলতে মন্দিরবাজারের কারখানাগুলোতে এখন কর্মচাঞ্চল্য চরমে । কারিগরদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হচ্ছে রঙিন আবির, যা খুব শিগগিরই ছড়িয়ে পড়বে বাংলার ঘরে ঘরে । বসন্তের উৎসবকে কেন্দ্র করে তাই মন্দিরবাজার এখন যেন রঙের এক প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে-যেখানে শ্রম, স্বপ্ন আর উৎসবের রং একসূত্রে গাঁথা ।


