ভোটার তালিকায় শতাধিকের বাবা-মার জায়গায় একই গুরুপিতার নাম ! মায়াপুরে শোরগোল
একই বাবার নাম থাকার ঘটনাকে পুরোপুরি সংবিধান বিরোধী কাজ বলছে কংগ্রেস ৷ বিজেপির দাবি, ছদ্মবেশী ভণ্ড বাবাতে ভরে গিয়েছে মায়াপুর ৷

Published : November 14, 2025 at 2:36 PM IST
মায়াপুর, 14 নভেম্বর: 2002 সালের ভোটার তালিকায় ইসকন ভক্তদের বাবা কিংবা মায়ের নামের জায়গায় রয়েছে গুরু মহারাজের নাম । অর্থাৎ গুরুপিতা জয়পতাকার স্বামী দাসের নাম । আর তাও এক দুই নয়, প্রায় শতাধিক ভক্তদের বাবা-মার জায়গায় একই গুরুপিতার নাম ৷ নদিয়া জেলার মায়াপুর ইসকনের ঘটনায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজ্যজুড়ে ৷
এসআইআর আবহে রাজ্যজুড়ে মানুষ যখন 2002 সালের ভোটার তালিকা সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তখনই অন্য চিত্র দেখা গেল মায়াপুর ইসকনের ক্ষেত্রে । জানা গিয়েছে, মায়াপুর ইসকনে থাকা অসংখ্য ভক্ত 77 নবদ্বীপ বিধানসভা কেন্দ্রের 10 নম্বর অংশে শ্রীশ্রী ঠাকুর ভক্তিবিনোদ নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়ে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন । কিন্তু দেখা যাচ্ছে, 2002 সালের সেই তালিকায় বিভিন্ন গুরু মহারাজের নাম পিতা হিসেবে গণ্য হয়েছে । কিন্তু কেন ভোটার তালিকায় নিজের দীক্ষিত নাম, এমনকি গুরুপিতার নাম রয়েছে ?
নবদ্বীপ বিধানসভার ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার অর্ণব চিহ্না বলেন, "এটায় বিতর্কের কিছু নেই ৷ এটা নতুন কোনও ব্যাপার না ৷ এটা দীর্ঘদিন ধর চলে আসছে ৷ দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ মানুষ যারা ইসকনের ওখানে দীক্ষা নিয়ে আছেন তারা নিজের বাবার পরিবর্তে গুরুপিতার নাম ব্যবহার করেন ৷ এক্ষেত্রেও একই বিষয় হয়েছে ৷ যারা যারা ওই গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়েছেন তারা পিতার জায়গায় ওনার নাম ব্যবহার করেছেন ৷ এটা তৎকালীন সময় একটা নির্দেশ ছিল হয়ত ৷ এবারের তালিকার ক্ষেত্রে আমরা দায়িত্বে থাকা ইআরও-কে সতর্ক করেছি এবং বিএলওকে বলে দিয়েছি ৷ আরও একবার আমরা ভালোভাবে বলে দেব ৷ ওই অংশগুলোর নাম আমরা ভালোভাবে দেখে তুলব এবং এর সঙ্গে সঙ্গে আমরা সাধারণ জনগণকে বলতে চাই, এ বিষয়ে কোনও ভীত বা অতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই ৷ আমাদের কাছে নির্বাচন কমিশনের যে গাইডলাইন আছে সেই অনুযায়ী নাম যাচাই করে তালিকায় তুলব ৷"
কৃষ্ণনগর সদর মহকুমা শাসক শারদ্বতী চৌধুরী বলেন, "রাজ্যের যেকোনও অংশে বাবা-মায়ের নাম থাকতেই পারে । কোনও দীক্ষিত গুরু বা গুরু মহারাজদের নাম দিয়ে নতুনভাবে সংযোগ করা যাবে না । পূর্ববর্তী সময়ে নিজের নাম বা পরিচয় পত্রে যে অবস্থায় ছিল সেটাই লিখতে হবে বর্তমানে । কিন্তু বাবা-মায়ের পরিচয়পত্র লিখতেই হবে । তবে বর্তমানে ভোটার তালিকায় তারা নতুন করে সংশোধন করেছে কি না, বাবা বা মায়ের নাম তা ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বলতে পারবেন ।"

তবে বিভিন্ন মঠ মন্দিরের সন্ন্যাসীদের ক্ষেত্রে গুরুপিতার নাম দিয়ে সচিত্র পরিচয়পত্র করা যায় বলে দাবি করেছেন নবদ্বীপ ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক । বিডিও মণীশ গুপ্ত বলেন, "সন্ন্যাস গ্রহণের পর যেহেতু সংসার ত্যাগ করেন অনেকেই তাই গুরুকে অভিভাবক হিসেবে বেছে নেন । তখন তার সচিত্র পরিচয়পত্র গুরুপিতার নাম দিয়েই তৈরি হয় । অনেক সময় দেখা যায় সচিত্র পরিচয়পত্র তৈরি হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় তারা আবার আগের নাম বা বাবা মায়ের নামে পরিচয়পত্র তৈরি করে । অনেক সময় দেখা যায় প্রথমে যে পরিচয়পত্র তৈরি হয়, পুনরায় নতুন করে আগের নাম বা পরিচয় ফিরে আসতে গিয়ে আটকে যেতে হয়েছে । তবে বর্তমানে তাদের পরিচয় পত্রের কী অবস্থা সেটা না দেখে বলা যাবে না ।"
তিনি আরও বলেন, "সন্ন্যাস নিয়ে গুরু মহারাজ বা গুরুপিতার নামে পরিচয়পত্র তৈরি করে পুনরায় আবার নিজের নাম বা বাবার নামে পরিচয়পত্র তৈরি করেছে অতীতে সেগুলো দেখা গিয়েছে । যদি দেখা যায় যে 2002 সালের ভোটার তালিকায় একরকম আছে এবং বর্তমানে অন্য আরেকরকম সচিত্র পরিচয়পত্র রয়েছে, তাহলে সেই ব্যক্তিকে প্রমাণ করতে হবে ৷ এমনকি তার শুনানি হতে পারে । যদি 2002 সালের রোলে গুরু মহারাজ বা গুরুপিতার নাম থাকে তাহলে অসুবিধা হওয়ার কথা না ।"

ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছে রাজ্যের বিরোধী দলগুলি ৷ নবদ্বীপ শহর কংগ্রেস সভাপতি নির্মল সাহা বলেন, "এই ঘটনাটি পুরোপুরি সংবিধান বিরোধী । ভারতীয় সংবিধানে সম্পূর্ণ নিয়ম বিরোধী কাজ হয়েছে । তার কারণ নবদ্বীপে অনেক দূরদূরান্ত থেকে দেশের বাইরে থেকেও মানুষ আসে । বিভিন্ন মহারাজরা আছেন । আর কে কখন কাকে ধর্মগুরু পাতিয়ে ভোটার লিস্টে নাম তুলে নিচ্ছে তা মোটেই কাম্য নয় । যিনি অভিযুক্ত তিনি যদি প্রমাণ করতে পারেন তার এতগুলো সন্তান তাহলেও তাকে গ্রেফতার করা উচিত । তার কারণ ভারতীয় সংবিধানে কখনোই এতগুলো সন্তানের জন্মগ্রহণ করতে দেওয়ার অধিকার দেয়নি তাকে । এসআইআর এবং স্বচ্ছ ভোটার তালিকা যখন হচ্ছে, তখন সঠিক নিয়ম সুনির্দিষ্টভাবে পালন করেই হোক এটাই আমরা চাই ।"
বিজেপি নেত্রী সোমা মুখোপাধ্যায় বলেন, "আসলে এরা মায়াপুরটাকে মিয়াপুর বানিয়ে রেখেছে । আর মিয়াপুরের ছদ্মবেশী ভণ্ড বাবারা তারা এই মায়াপুরের সৃষ্টি করেছে । এখানে বিভিন্ন দূরদূরান্ত থেকে এবং দেশের বাইরে থেকে বহু মানুষ ছদ্মবেশে থাকে । তারাই রাজ্য সরকারের ছত্রছায়ায় এসে যত দুর্নীতির করার কাজ করে গিয়েছে । তবে সব ভোটার তালিকার নাম যে ভুল সে কথা বলব না ৷ কিন্তু ভোটার তালিকাটা অস্বচ্ছতাই ভরে গিয়েছে । অবিলম্বে এর বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন ।"

