ETV Bharat / state

পুরনো রূপেই ফিরছে উত্তরের 'কোহিনূর' ! হলং বাংলো পুনর্নির্মাণের শিলান্যাসে খুশি পর্যটনমহল

আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছিল ঐতিহাসিক জলদাপাড়া হলং বন বাংলো ৷ এবার কংক্রিট ও কাঠের যুগলবন্দিতে ফের তৈরি হতে চলেছে সেটি ৷

hollong bungalow
হলং বন বাংলোর নির্মাণ কাজের শিলান্যাস মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : February 26, 2026 at 5:22 PM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

অভিজিৎ বোস ও সুরজিৎ দত্ত

কলকাতা/জলপাইগুড়ি, 26 ফেব্রুয়ারি: বিধ্বংসী আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছিল জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের ঐতিহ্যবাহী হলং বন বাংলো । এবার উত্তরবঙ্গের পর্যটনের অন্যতম প্রধান সেই আকর্ষণকে পুরনো রূপে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিল রাজ্য সরকার । বুধবার ভবানীপুর থেকে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে এই বন বাংলোর পুনর্নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক শিলান্যাস করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাজ্য পর্যটনের 'কোহিনূর'-খ্যাত এই বাংলোর কাজ শুরু হতে চলায় খুশি পর্যটক থেকে শুরু করে বন দফতরের আধিকারিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা ।

হলং বন বাংলোয় অগ্নিকাণ্ড

1967 সালে নির্মিত কাঠের এই সুদৃশ্য বন বাংলোটি দেশি-বিদেশি পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বরাবরই এক বিশেষ আবেগের জায়গা । দেশের নেতা-মন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বদের স্মৃতি বিজরিত এই বাংলো । কিন্তু 2024 সালের 18 জুন রাতের এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায় আট কামরার এই বন বাংলোটি । পরবর্তী সময়ে বন দফতরের তদন্তে উঠে আসে, বাংলোর তিনতলার 3 নম্বর ঘরে শর্ট সার্কিট থেকেই আগুন লেগে গোটা ভবনটি ভস্মীভূত হয়ে যায় ।

hollong bungalow
প্রায় 4 কোটি ব্যয়ে পুনর্নির্মাণ হবে হলং বন বাংলো (নিজস্ব ছবি)

গর্বের হলং বন বাংলো পুড়ে যাওয়ায় কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে পর্যটন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে । ঘটনার পর থেকেই এই ঐতিহাসিক বন বাংলোকে তার পুরনো আদলে ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে জোরালো দাবি উঠতে শুরু করে । গত বছরেই হলং বন বাংলোটি তৈরির জন্য জলদাপাড়া বন্যপ্রাণী বিভাগের পক্ষ থেকে ডিটেইল প্রোজেক্ট রিপোর্ট রাজ্য সরকারকে দেওয়া হয় । এরপর ডিসেম্বর মাসে সেই ডিটেইলস প্রোজেক্ট রিপোর্টের অনুমোদন দেয় রাজ্য সরকার । দ্রুত বাংলোটি পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করে এর নীল নকশা চূড়ান্ত করা হয় ।

hollong bungalow
25 তারিখ কাজের শিলান্যাস হয়েছে (নিজস্ব ছবি)

হলং বাংলোর নতুন রূপ

বন দফতর সূত্রে খবর, টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সম্প্রতি একটি সংস্থাকে এই কাজের বরাত দেওয়া হয়েছে । পুরনো চেহারা অবিকল ধরে রেখেই নতুন করে সেজে উঠবে হলং বন বাংলো । তবে এবার শুধুমাত্র কাঠের ওপর ভরসা না করে পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং অগ্নি নির্বাপণের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে প্রশাসন । সেই কারণে তিনতলা এই বাংলোর মূল কাঠামোটি তৈরি করা হবে মজবুত কংক্রিট দিয়ে । এর ফলে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে । তবে কংক্রিটের কাঠামো হলেও বাইরে থেকে তা দেখে বোঝার কোনও উপায় থাকবে না । পর্যটকদের আবেগের কথা মাথায় রেখে কংক্রিটের কাঠামোর ভেতরে ও বাইরে শাল, সেগুন এবং পাইন কাঠ দিয়ে নিপুণভাবে 'উডেন ক্ল্যাডিং' বা আচ্ছাদন দেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে ।

hollong bungalow
হলং বন বাংলোর নির্মাণ কাজ শুরু (নিজস্ব ছবি)

হলং বাংলো নির্মাণে খরচ

বন দফতরের তরফে আরও জানা গিয়েছে, এই সমগ্র পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে মোট খরচ ধরা হয়েছে আনুমানিক 3 কোটি 62 লক্ষ থেকে 3 কোটি 85 লক্ষ টাকার মধ্যে । এই বাংলোর অন্দরমহল এবং বাইরের রূপায়ণে কাঠের ব্যবহার হবে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত । বাংলোর ভিতরের দিকের দেওয়ালগুলিতে শাল কাঠের ফ্রেমের ওপর পাইন কাঠ দিয়ে মুড়ে দেওয়া হবে । অন্যদিকে, বাইরের দেওয়ালগুলির ক্ষেত্রে শাল কাঠের ফ্রেমের ওপর থাকবে উন্নত মানের সেগুন কাঠের আচ্ছাদন । এর জন্য প্রয়োজনীয় কাঠ বন দফতর নিজেরাই সরবরাহ করবে ।

পাশাপাশি, পুনর্নির্মিত এই ভবনে অত্যাধুনিক অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ ব্যবস্থাও মজুত থাকবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনও অনভিপ্রেত ঘটনা না ঘটে । সব মিলিয়ে হুবহু পুরনো চেহারায়, তবে আরও সুরক্ষিতভাবে জলদাপাড়ার বুকে ফের সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে চলেছে উত্তরের আবেগ এই হলং বন বাংলো ।

বনমন্ত্রীর বক্তব্য

এই নিয়ে বনবিভাগের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা ইটিভি ভারতকে বলেন, "বন দফতরের একটা বড় স্বপ্ন পূরণ হল । 2024 সালে বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে গিয়েছিল এই বন বাংলোটি । মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণাতেই এই ঐতিহ্যবাহী বন বাংলোটি আবার গড়ে তোলার সংকল্প নিয়েছিল বনদফতর । আমরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ আজ তিনি সেটির ভার্চুয়াল শিলান্যাস করলেন । খুব শীঘ্রই পুরো দমে কাজ শুরু হয়ে যাবে ।"

hollong bungalow
উত্তরবঙ্গে পর্যটনের মুকুট হলং বন বাংলো (নিজস্ব ছবি)

খুশি বন দফতর

জলদাপাড়ার ডিএফও পরভীন কাশোয়ান বলেন, "হলং বন বাংলোটি পুড়ে যাওয়ার পর আমরা বাংলোটি তৈরি করার জন্য ডিটেইল প্রোজেক্ট রিপোর্ট রাজ্য সরকারকে জমা করেছিলাম । রাজ্য সরকার আমাদের ডিপিআর অনুমোদন দেয় । মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুড়ে যাওয়া হলং বন বাংলোটির নতুন করে নির্মাণের ভার্চুয়ালি শিলান্যাস করলেন । আমরা খুব খুশি সরকার ফের বাংলোটি তৈরি করে দিচ্ছে । আগে হলং বাংলোটি যেমন ছিল ঠিক আগের মতো করেই সেটি তৈরি করা হবে । কংক্রিটের পিলারের ওপর কাঠের বাংলো তৈরি করা হবে । পাশাপাশি আগের জায়গাতেই বাংলো তৈরি করা হচ্ছে । প্রতি বছর গড়ে 1 লক্ষ 10 হাজার পর্যটক জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে এসে থাকেন ৷ এই বাংলোটি হওয়ার ফলে জাতীয় উদ্যানের জৌলুস আরও বাড়বে ।"

পর্যটনমহলেও আশার আলো

উত্তরবঙ্গে পর্যটনের একটি মুকুট ছিল এই হলং বন বাংলোটি । উত্তরবঙ্গে আসা পর্যটকদের প্রথম পছন্দের জায়গা বলা চলে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের হলং বন বাংলো । শুধু তাই নয়, এই হলং বাংলোটি দেখতে দূরদুরান্ত থেকে প্রচুর পর্যটক জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে আসতেন । এমনকি এই বাংলোটিতে থাকার জন্য পর্যটকরা উৎসুক হয়ে থাকেন । বাংলোটি পুড়ে যাওয়ায় তা পর্যটন ব্যবসাতেই আঘাত হানে । পর্যটকরা অনেকেই মুখ ফিরিয়েছেন জলদাপাড়া থেকে, এমনটাই অভিযোগ ৷ ফলে পর্যটন ব্যবসায়ীরাও চাইছেন তাড়াতাড়ি হলং বাংলো তৈরি করে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হোক । অবশেষে বাংলো তৈরির কাজের সূচনা হওয়ায় তাই খুশি পর্যটন ব্যবসায়ী থেকে পর্যটকরাও । নতুন করে আশার আলো দেখছে পর্যটনমহল ।

ডুয়ার্স ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক সঞ্জয় দাস বলেন, "পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের কাছে খুব ভালো খবর । আমরা অনেক দিন থেকেই দাবি জানিয়ে আসছিলাম হলং বাংলোটি তাড়াতাড়ি তৈরি করে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হোক । অবশেষে কাজটি শুরু হচ্ছে খুব ভালো লাগছে ৷"