ETV Bharat / state

গঙ্গাসাগর মেলায় 'ভিআইপি কালচার' বরদাস্ত নয়, প্রস্তুতির রূপরেখা বেঁধে দিয়ে কড়াবার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

এবারের গঙ্গাসাগর মেলায় 'ভিআইপি কালচার' কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না ৷ সোমবার প্রস্ততি বৈঠকে স্পষ্টবার্তা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ৷

CM MAMATA BANERJEE
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : December 15, 2025 at 8:15 PM IST

4 Min Read
Choose ETV Bharat

​কলকাতা, 15 ডিসেম্বর: কুম্ভমেলার পরেই দেশের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় সমাগম এই গঙ্গাসাগর মেলা। দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগম হয় সাগর তটে ৷ সেই মেলা যাতে নির্বিঘ্নে এবং সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়, তার জন্য প্রতি বছরের মতো এবারও কোমর বাঁধল রাজ্য প্রশাসন। 2026 সালের গঙ্গাসাগর মেলা শুরু হবে 10 জানুয়ারি ৷ চলবে 17 জানুয়ারি ৷ তবে 14 জানুয়ারি মকর সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে সবচেয়ে বেশি পুণ্যার্থী সমাগমের আশা করা হচ্ছে ৷

মেলা শুরুর আগে সোমবার নবান্নে উচ্চপর্যায়ের প্রস্তুতি বৈঠকে বসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেই বৈঠকেই আধিকারিক ও মন্ত্রীদের উদ্দেশে তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ, মেলায় কোনওভাবেই 'ভিআইপি কালচার' বরদাস্ত করা হবে না ৷ লাল বাতির দাপটে সাধারণ পুণ্যার্থীদের যাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে না-হয় বা তাঁদের যাতায়াতে যাতে বিন্দুমাত্র সমস্যা না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে প্রশাসনকে ৷ মুখ্যমন্ত্রীর সাফ কথা, এই মেলা সাধারণ মানুষের ৷ তাই তাঁদের সুবিধাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

চলতি বছরের শুরুতেই প্রয়াগরাজে কুম্ভমেলায় পদপিষ্টের ঘটনার পর গঙ্গাসাগর নিয়ে আরও বেশি সতর্ক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ কারণ 29 জানুয়ারি, মৌনী অমাবস্যায় শাহি স্মান উপলক্ষ্যে কুম্ভমেলায় প্রচুর পুণ্যার্থীর সমাগমে পদপিষ্টের ঘটনায় 30 জনের মৃত্যু হয় এবং আহত হন 90 জনের বেশি ৷ এ কথা মাথায় রেখে আসন্ন গঙ্গাসগর মেলায় নিরাপত্তায় কোনও ফাঁক রাখতে চাননি মুখ্যমন্ত্রী ৷

তাই, আসন্ন গঙ্গাসাগর মেলা উপলক্ষ্যে জনসমাগম সামলানোই এখন প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ৷ সেই লক্ষ্যেই এদিনের বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ৷ ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং পুণ্যার্থীদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে এবারও প্রযুক্তির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে । মেলা চত্বর, কপিল মুনি আশ্রম এবং স্নানঘাটে কড়া নজরদারি চালাতে ব্যবহার করা হবে ড্রোন এবং সিসিটিভি ক্যামেরা। পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকদের পাশাপাশি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার সিভিল ডিফেন্স ভলেন্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবক। তাঁদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে মেলায় পাঠানো হবে, যাতে তাঁরা যাত্রাপথ থেকে শুরু করে সাগর তট পর্যন্ত পুণ্যার্থীদের গাইড করতে পারেন। এছাড়া, ভিড়ের মধ্যে যাতে কেউ হারিয়ে না-যান বা কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে, যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তার জন্য প্রত্যেক পুণ্যার্থীর হাতে থাকবে বিশেষ আইডি কার্ড এবং রিস্ট ব্যান্ড।

রাজ্য সরকারের মানবিক মুখের পরিচয় মিলল এদিনের বৈঠকের আরেকটি সিদ্ধান্তে ৷ গঙ্গাসাগরে আগত সমস্ত পুণ্যার্থীর জন্য বিমা বা ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থা থাকছে ৷ যাত্রাপথে বা মেলা প্রাঙ্গণে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আর্থিক সহায়তা পায়, তা নিশ্চিত করেছে রাজ্য। পরিবহণ দফতর তরফেও ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছে ৷ পুণ্যার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্যে পৌঁছে দিতে প্রায় 2500টি বাস রাস্তায় নামানো হচ্ছে । জলপথে পারাপারের জন্য থাকছে 250টি লঞ্চ এবং 21টি জেটি। মুড়িগঙ্গা ও সাগরে ড্রেজিংয়ের কাজও দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৷

​মেলা পরিচালনার ক্ষেত্রে যাতে কোনও ফাঁকফোকর না-থাকে, তার জন্য মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞ সদস্যদের ওপর বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। আগামী 12 জানুয়ারি থেকেই মন্ত্রীরা তাঁদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব বুঝে নিতে স্পটে পৌঁছে যাবেন ৷ মেলা প্রাঙ্গণ অর্থাৎ গ্রাউন্ড জিরো থেকে পরিস্থিতির তদারকি করবেন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, সুজিত বসু, বেচারাম মান্না, পুলক রায়, স্নেহাশিস চক্রবর্তী এবং মানস ভুইয়া। অন্যদিকে, কলকাতায় থেকে বিষয়টি মনিটরিং ও কো-অর্ডিনেশনের দায়িত্বে থাকবেন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও ব্রাত্য বসু।

​এদিনের বৈঠকে মেলার প্রস্তুতির পাশাপাশি উপকূলবর্তী এলাকার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। বিশেষ করে মৎস্যজীবীদের সুরক্ষার বিষয়টি তিনি পুলিশকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। অনেক সময় দেখা যায়, মাছ ধরতে গিয়ে মৎস্যজীবীরা ভুলবশত বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে পড়েন এবং আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়েন। কেন বারবার এমন ঘটনা ঘটছে, তা খতিয়ে দেখতে এবং মৎস্যজীবীদের সচেতন করতে পুলিশকে বিশেষ ভূমিকা নিতে বলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

​সব মিলিয়ে, গঙ্গাসাগর মেলা যাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে রাজ্যের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে, তার জন্য কোনও খামতি রাখতে চাইছেন না মুখ্যমন্ত্রী। সরকারি দফতরের মধ্যে সমন্বয় বা 'তালমিল' বজায় রাখার বার্তা দিয়েছেন তিনি। জানা গিয়েছে, খুব শীঘ্রই প্রস্তুতির কাজ সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে মুখ্যমন্ত্রী নিজে গঙ্গাসাগরে যাবেন। প্রশাসনের শীর্ষস্তর থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মী—সকলকে সতর্ক ও তৎপর থাকার নির্দেশ দিয়েই এদিনের বৈঠক শেষ করেন তিনি।