ETV Bharat / state

যদি বন্ধু হও...! নেই দুটো হাত, সংগৃহীত খাবারে খিদে মিটিয়ে অভুক্তদের 'মসিহা' সুলভ

হাত দুটো বাড়াতে পারেননি ৷ জন্ম থেকে হাত দুটোই নেই ৷ তাতে কী ! বন্ধু হওয়া থেকে তাঁকে কেউ আটকাতে পারেননি ৷ সমীরণ পাণ্ডের প্রতিবেদন৷

Born without hands
নেই দুটো হাত, সংগৃহীত খাবারে খিদে মিটিয়ে অভুক্তদের 'মসিহা' সুলভ (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : August 27, 2026 at 8:56 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

পুরুলিয়া, 27 অগস্ট: যদি বন্ধু হও, তবে বাড়াও হাত...৷ না, হাত দুটো বাড়াতে পারেননি পুরুলিয়ার সুলভ বুধিয়া ৷ কারণ জন্ম থেকে তাঁর হাত দুটোই নেই ৷ তাতে কী ! বন্ধু হওয়া থেকে তাঁকে কেউ আটকাতে পারেননি ৷ নিজের এলাকার অসহায়, নিরন্ন, ক্ষুধার্ত মানুষগুলির তিনি পরম বন্ধু ৷ প্রতিদিন অভুক্তরা তাঁর কাছেই ছুটে আসেন পেটের খিদে মেটাতে ৷ অনুষ্ঠান বাড়ি থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার সংগ্রহ করে 'রোটি ব্যাংক' তৈরি করেছেন বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষটি ৷ যাঁর নিজের সংসারই চলে কোনও রকমে, তিনিই রোজ বহু লোকের অন্নসংস্থান করে হয়ে উঠেছেন এলাকার 'মসিহা'৷

পুরুলিয়া শহরের চাইবাসা রোডের বাসিন্দা সুলভ বুধিয়া ৷ জন্ম থেকেই দুটি হাতের অর্ধেক অংশ নেই । তবে তাকে কখনওই নিজের প্রতিবন্ধকতা হতে দেননি সুলভ ৷ অনটনের সংসারেও রীতিমতো সংগ্রাম চালিয়ে বাণিজ্যে স্নাতক পাশ করেছেন ৷ বাড়িতে আছেন মা, স্ত্রী, দিদি, ভাই আর ভাইয়ের বউ ৷ সবার দায়িত্বই সুলভের কাঁধে ৷ ইলেকট্রিকের সামগ্রীর দোকান থেকে হওয়া আয়ে কোনওরকমে সংসার চালান ৷ সেসব সামাল দিতে দিতেই একদিন তাঁর চোখে পড়ে, রাস্তার ছোট ছোট বাচ্চারা ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছে ৷ সেই দৃশ্য সুলভের মনকে নাড়িয়ে দেয় ৷ তিনি ঠিক করেন, অভুক্তদের মুখে খাবার তুলে দিতে কিছু করবেন ৷

নেই দুটো হাত, সংগৃহীত খাবারে খিদে মিটিয়ে অভুক্তদের 'মসিহা' সুলভ (ইটিভি ভারত)

কোথাও কোনও অনুষ্ঠান বাড়ি হলেই সেখানে পৌঁছে যান তিনি । বাড়ির মালিকদের জানিয়ে দেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়তি খাবার যেন তাঁকে দিয়ে দেওয়া হয় । সেই খাবার যাঁদের প্রয়োজন, তাঁদের বিলিয়ে দেন সুলভ । এছাড়াও তাঁর 'রোটি ব্যাংক' নামে সোশাল মিডিয়ায় একটি গ্রুপ রয়েছে । সেই গ্রুপে যে কেউ খাবার কিংবা খাদ্যসামগ্রী দান করতে পারেন । সেই খাবারও পৌঁছে যায় অভুক্তদের কাছে । প্রায় আট বছর ধরে এভাবেই মানুষের সেবায় নিরলস কাজ করে চলেছেন বিশেষভাবে সক্ষম এই যুবক ।

Born without hands
সস্ত্রীক সুলভ বুধিয়া (ইটিভি ভারত)

জেলাবাসীর কাছে তাঁর আবেদন, "থালায় কেউ প্রয়োজনের বেশি খাবার নেবেন না ৷ আপনার ফেলে দেওয়া খাবার এক অভুক্তের মুখে হাসি ফোটাতে পারে ।" চাইলেই যে অসহায়দের সাহায্য করা যায়, নিরন্ন মানুষদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া যায়, তার জীবন্ত উদাহরণ সুলভ । অবশ্য শুধু খাদ্য বিতরণেই তিনি থেমে থাকেননি ৷ মুমূর্ষু রোগীদের রক্তদান, বিশেষভাবে সক্ষমদের হুইল চেয়ার বিতরণও করেন । তাঁর এই মহৎ কাজের জন্য সুলভের কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে সংবর্ধনা প্রদান করেছে । সংবর্ধনা দিয়েছেন আরও অনেকে ।

Born without hands
অভুক্তদের খাবার বিতরণ (ইটিভি ভারত)

তাঁর এই কাজে সর্বত ভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে তাঁর পরিবার ৷ তিনি বলেন, "আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন অসহায়দের পাশে থাকা উচিত । আমার পরিবার আমার পাশে না-থাকলে দীর্ঘদিন ধরে এই বিরাট কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হত না । অনেক মানুষ নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন । সামান্য থেকে সামান্যতম দানও সাদরে গ্রহণ করি । প্রচুর অভুক্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে হবে যে ।"

Born without hands
হাসপাতালে রোগীর পরিবারদের খাবার বিতরণ (ইটিভি ভারত)

সেই সঙ্গে জেলা তথা শহরের যে কোনও অনুষ্ঠান বাড়ির মালিকদের কাছে তিনি করজোড়ে আবেদন করেন, যাতে উদ্বৃত্ত খাবার তাঁর 'রোটি ব্যাংক'-এ তুলে দেওয়া হয় । সেই খাবার তিনি পৌঁছে দেবেন অভুক্তদের কাছে । এভাবেই সংগৃহীত খাবারের পাত্র নিয়ে সুলভ পৌঁছে যান স্থানীয় মেডিক্যাল কলেজেও । সেখানে ভর্তি থাকা রোগীর পরিবার পরিজনদের বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করেন তিনি । সুলভের স্ত্রী মিতালি মুর্মু বলেন, "স্বামীর এই কাজ আমার খুবই ভালো লাগে । তাই রান্নার কাজে স্বামীকে যথাসম্ভব সাহায্য করি । আমি চাই তিনি এই কাজ চালিয়ে যান ।"

সুলভকে নিয়ে গর্বিত তাঁর প্রতিবেশীরাও ৷ এক পড়শি সোমনাথ দত্ত বললেন, "আমাদের পাড়ার দাদার এই কাজের জন্য আমরা সকলেই গর্ব বোধ করি । প্রায় আট বছর ধরে উনি এভাবেই কাজ করে যাচ্ছেন । পুরুলিয়া সদর হাসপাতালে রোগীর পরিবার পরিজনদের বিনামূল্যে খাবার দিচ্ছেন ৷ আমরাও কখনও কখনও তাঁকে সাহায্য করি ।"

Born without hands
রোটি ব্যাংক বানিয়েছেন সুলভ (ইটিভি ভারত)

আর যাঁরা সুলভের কাছ থেকে বিনে পয়সায় পেটপুরে দুটো খেতে পাচ্ছেন, তাঁরা দু হাত ভরে আশীর্বাদ করছেন বিশেষভাবে সক্ষম এই মানুষটিকে ৷ হাসপাতালে মেয়ে ভর্তি রয়েছে কেন্দা থানা এলাকার মানিক মাহাতোর । বুধবার তিনিও লাইনে দাঁড়িয়ে সুলভের দেওয়া খাবার নেন । তিনি বলেন, "কোনও টাকাপয়সা লাগছে না ৷ বিনা পয়সায় এই খাবার দেওয়ায় আমাদের খুব সুবিধে হচ্ছে ৷ ও ভালো থাক ৷" লাইনে থাকা আরেক মহিলা কল্পনা মাহাতো বললেন, "বিনামূল্যে খাবার পেয়ে খুব উপকার হয় । করোনার সময় থেকেই উনি এভাবে রোগীর আত্মীয় পরিজনদের খাবার দেন ৷" জয়পুর থানা এলাকার বাসিন্দা অনিল কুমারের বক্তব্য, "দাদা ভর্তি থাকায় হাসপাতালে রয়েছি । ওঁর দেওয়া খাবারই খেয়েছি ৷ দুর্দিনে মানুষের পেটে খাবার জোগানো, এটা কি কম পুণ্যের কাজ !"

সুলভ আগামী দিনেও এভাবেই মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান ৷ তাঁদের দিকে বাড়িয়ে দিতে চান তাঁর সাহায্যের হাত ৷ তবে এর জন্য প্রয়োজন অর্থের । নিজের সামান্য ইলেকট্রিক সামগ্রী বিক্রির দোকানের লভ্যাংশের সামান্য অর্থ ও সহৃদয় ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায় দেওয়া দানের মাধ্যমে এই বিশাল কর্মকাণ্ড কতদিন তিনি চালিয়ে যেতে পারবেন তা হয়তো সময় বলবে । তবে তাঁর এই মহৎ উদ্যোগের কথা ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ।