বিশ্ববিদ্যালয় বিলে ধাক্কা, আচার্য পদে মুখ্যমন্ত্রী নয়; রাজ্যপালের ক্ষমতায় সিলমোহর রাষ্ট্রপতির
মুখ্যমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আচার্য পদে বসানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার ৷ তবে রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আচার্য হিসেবে রাজ্যপালই বহাল থাকছেন।

Published : December 15, 2025 at 9:58 PM IST
|Updated : December 15, 2025 at 10:21 PM IST
কলকাতা ও নয়াদিল্লি 15 ডিসেম্বর: রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণের পরিধি আরও বাড়াতে পদক্ষেপ করেছিল রাজ্য সরকার। বিধানসভায় বিল পাস করে রাজ্যপালকে সরিয়ে খোদ মুখ্যমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আচার্য পদে বসানোর উদ্যোগ নিয়েছিল নবান্ন। কিন্তু বড় ধাক্কা খেতে হল । রাজ্য-সহায়তাপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী বিলে সম্মতি দিলেন না রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। আচার্য পদে পরিবর্তনের যে প্রস্তাব রাজ্য সরকার পাঠিয়েছিল, তা কার্যত খারিজ হয়ে গেল। রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আচার্য হিসেবে রাজ্যপালের ভূমিকাই বহাল থাকছে।
রাজভবন (নাম পরিবর্তনের পর লোকভবন) ও নবান্নর মধ্যে সংঘাত নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে উপাচার্য নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে রাজ্য সরকার ও রাজভবনের মধ্যে তীব্র দড়ি টানাটানি চলছে। এই আবহেই আচার্য হিসেবে রাজ্যপালের ক্ষমতা 'খর্ব' করতে সক্রিয় হয়েছিল রাজ্য সরকার। 2022 সালে বিধানসভায় পাস করানো হয় ‘পশ্চিমবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় আইন (সংশোধনী) বিল’। পাশাপাশি, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও আচার্য বা 'আমির-ই-জামিয়া' পদে রাজ্যপালের বদলে মুখ্যমন্ত্রীকে বসানোর জন্য পাশ হয় আলাদা বিল। সাংবিধানিক নিয়ম মেনে বিলগুলি রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস রাষ্ট্রপতির বিবেচনার জন্য পাঠিয়েছিলেন। রাজভবন সূত্রে খবর, গত 2024 সালের 20 এপ্রিল পাঠানো সেই বিল দুটিতে সই করেননি রাষ্ট্রপতি।

কেন এই বিল এনেছিল রাজ্য?
নবান্নের যুক্তি ছিল, নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর হাতেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার রাশ থাকা উচিত। শিক্ষামহলের একাংশের মতে, উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বারবার রাজভবনের সঙ্গে মতপার্থক্যের জেরে প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা আসছিল। সেই ‘অচলাবস্থা’ কাটাতে এবং উচ্চশিক্ষার প্রসারে গতি আনতেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে আচার্য বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিরোধীরা, বিশেষ করে বিজেপি, প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসছিল যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাড়াতেই এই বিল আনা হয়েছে। তাদের দাবি ছিল, এতে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন ক্ষুণ্ণ হবে।
আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতা
রাষ্ট্রপতির এই অসম্মতির পেছনে বড় কারণ হিসেবে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশ আইনি জটিলতার কথা তুলে ধরছেন। বর্তমানে আইনের কাঠামো অনুযায়ী, রাজ্যপাল পদাধিকার বলে রাজ্যের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আচার্য। এই প্রথা ভেঙে মুখ্যমন্ত্রীকে সেই পদে বসানো সংবিধানের মূল কাঠামোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিলই। রাষ্ট্রপতির সম্মতি না মেলায় এটা স্পষ্ট যে, এই সংশোধনীগুলি সাংবিধানিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফলে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে কোনও বড় বদল আসছে না, বরং স্থিতাবস্থাই বজায় থাকছে।

স্বস্তিতে রাজভবন, অস্বস্তিতে নবান্ন
রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তির হাওয়া রাজভবনে। বর্তমান আইন অনুযায়ী, রাজ্যের সমস্ত সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আচার্য বা চ্যান্সেলর হিসেবে রাজ্যপালই দায়িত্বে থাকছেন। অন্যদিকে, বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও নিজেদের পাস করা বিল কার্যকর করতে না পারা রাজ্য সরকারের কাছে নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ধাক্কা।
ভবিষ্যৎ কী?
রাষ্ট্রপতির 'না'-এর পর এখন প্রশ্ন উঠছে, রাজ্য সরকার কি এই ইস্যুতে আদালতের দ্বারস্থ হবে? নাকি নতুন কোনও আইনি পথে হাঁটবে? যদিও এ বিষয়ে নবান্নের তরফে এখনও সরকারিভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিধানসভার ভোটের আগে বা পরে এই ইস্যু ফের কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের নতুন কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আপাতত রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উপাচার্য নিয়োগ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাজভবনের ভূমিকা বা ক্ষমতা—কোনোটিতেই কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না।

