প্রয়াণ দিবসে নিজভূমে ব্রাত্য হাস্যসম্রাট, চাঁচলে জন্মভিটেয় শিবরাম চক্রবর্তী বিস্মৃতির অন্ধকারে
চরম অনটনেও শিবরাম চক্রবর্তী বলতেন 'খাসা আছি' ৷ রসসম্রাটের প্রয়াণ দিবসে তাঁর মূর্তিতে মালা দিল না কেউ ৷ রিপোর্ট ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি অভিষেক সাহার ৷

Published : August 28, 2026 at 11:56 PM IST
মালদা, 28 অগস্ট: তিনি বেঁচে থাকলে গোয়েন্দা কল্কেকাশির দাপটে এযুগে কল্কে পেত না এআই চ্যাটজিপিটিরা ৷ আর একবিংশ শতকে প্রযুক্তি নিয়ে হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন ঠিক কিছু না কিছু এমন কাণ্ড বাঁধিয়ে বসতেন, যা কৃত্রিম মেধার কল্পনারও অতীত ৷ আজীবন বাঙালির ছোট-বড় সব বয়সের রসবোধের খোরাক জুগিয়েছেন যে 'ঈশ্বর' সেই শিব্রাম চক্রবর্তীর প্রয়াণ দিবস 28 অগস্ট ৷
বাঙালি কি তাঁকে ভুলে গেল ? বিশেষত তাঁর জন্মভিটে মালদার চাঁচল কি ভুলে গেল তার গর্বের সন্তানকে ? যাঁর কলমে মজে থাকত আপামর বাঙালি, যাঁর রসবোধ এযুগেও অবিস্মরণীয় সেই রসসাহিত্যিক শিবরাম চক্রবর্তী তাঁর প্রয়াণ দিবসে নিজের জন্মভিটেতেই রইলেন বিস্মৃতির অন্ধকারে ৷
সকাল গড়িয়ে বিকেল এবং তারপর সন্ধ্যা নামল ৷ চাঁচলে শিব্রাম চক্রবর্তীর ভিটেয় আবক্ষ মূর্তিতে একটি মালা দিয়েও শ্রদ্ধা জানাল না কেউ ৷ চারদিকে ঝোপঝাড়ের মাঝে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন হাসির সম্রাট ৷ আজ বেঁচে থাকলে তিনি হয়তো বলতেন, "খাসা আছি ৷ ফাইন আছি ৷ জিনিসপত্র সব বাঁধা হয়ে গেছে ৷ এবার একটা ট্যাক্সি পেলেই চলে যাব ৷"
এদিন রাজ্য তথা দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে রাখি উৎসব ৷ সারাদিনই রয়েছে সামাজিক, রাজনৈতিক নানাবিধ অনুষ্ঠানের ছড়াছড়ি ৷ কিন্তু দ্য গ্রেট শিবরাম চক্রবর্তীর জন্য কোনও সরকারি অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়নি ৷ রসিক বৃদ্ধের স্মরণে নেই পুষ্পার্ঘ্য ৷ প্রয়াত সাহিত্যিকের জন্মস্থলে এমন অবহেলায় ক্ষোভ শিবরাম-অনুরাগী থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ৷
চাঁচলের ইতিহাস মানে চাঁচলের রাজ পরিবারের ইতিহাস । সেই রাজ পরিবারের আত্মীয় শিবরাম চক্রবর্তী ৷ পৈত্রিক ভিটে মুর্শিদাবাদে হলেও চাঁচলের পাহাড়পুরেই কেটেছে এই কিংবদন্তি সাহিত্যিকের শৈশব ও কৈশোর ৷ ঐতিহ্যবাহী চাঁচল সিদ্ধেশ্বরী ইনস্টিটিউশনের ছাত্র ছিলেন তিনি ৷
মাত্র 16 বছর বয়সে রাজ পরিবারের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে চাঁচল ছেড়েছিলেন ঠিকই । কিন্তু বারবার তাঁর লেখায় চাঁচলের হাট, গ্রন্থাগার এবং বিভিন্ন জনপদের কথা উঠে এসেছে ৷ অতীতে বহুবার শিবরামকে উপেক্ষা এবং অবহেলার অভিযোগ উঠেছে ৷ কিন্তু পালাবদলের বাংলাতেও দেখা গেল একই ছবি ৷ পাহাড়পুরে শিবরাম চক্রবর্তী বাড়িতে তাঁর আবক্ষ মূর্তিতে পুরোনো একটি মালা পরানো রয়েছে । তেমনই রইলেন আজও ৷ গত বছর মালদার চাঁচলের পাহাড়পুরের বিধায়ক তহবিল থেকে তাঁর নিজস্ব বাসভবনের সামনে একটি আবক্ষ মূর্তি বসানো হয় ৷ মূর্তিটির উন্মোচন করেন চাঁচল বিধানসভার পূর্বের তৎকালীন বিধায়ক নীহার রঞ্জন ঘোষ ৷
পাহাড়পুরের বাসিন্দা রাজু পান্ডে বলেন, “শিবরাম চক্রবর্তী শুধু চাঁচলের নন, তিনি সমগ্র বাংলার গর্ব ৷ তাঁর লেখায়, তাঁর রসবোধে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ হেসেছে ৷ অথচ তাঁর মৃত্যুদিনে নিজের জন্মভূমিতেই আবক্ষ মূর্তিতে একটি মালা পর্যন্ত দেওয়া হল না ৷ এটা সত্যিই দুঃখজনক ও লজ্জার ৷ প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের উচিত ছিল দিনটি যথাযথ মর্যাদায় পালন করা ৷ আগামিদিনে যেন নিজের জন্মভূমিতে যেন তাঁকে এভাবে অবহেলিত হতে না হয় ৷"
অন্যদিকে চাঁচল সিদ্ধেশ্বরী ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক জয়শঙ্কর চৌধুরী বলেন, "শিবরাম চক্রবর্তীর যে স্কুলে পড়াশোনা করেছেন আমি সেখানকার শিক্ষক ৷ আজ যা হল তা আমার কাছে সত্যি লজ্জার ৷ শিবরাম চক্রবর্তী আমাদের চাঁচলের গর্ব ৷ এই মাটির সঙ্গে তাঁর স্মৃতি, তাঁর শৈশব এবং তাঁর শিক্ষাজীবন জড়িয়ে রয়েছে ৷ যে মানুষটি তাঁর লেখনী ও অসাধারণ রসবোধের মাধ্যমে বাঙালির মনে জায়গা করে নিয়েছেন, তাঁর মৃত্যুদিনে নিজের জন্মভূমিতে এমন নীরবতা সত্যিই বেদনাদায়ক ৷ আমি চাই তাঁর স্মৃতি ও সাহিত্যকীর্তিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হোক ৷"
ইটিভি ভরতের ক্যামেরার সামনে ভুল স্বীকার করে নিলেন চাঁচল গ্রাম পঞ্চায়েতের বিজেপির জনপ্রতিনিধি ৷ বিজেপির গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য তথা জেলা বিজেপি যুব মোর্চার সাধারণ সম্পাদক প্রসেনজিৎ শর্মা সাফাই দিয়ে বলেন, "রাজনৈতিক কর্মসূচির ব্যস্ততায় ভুলে গিয়েছিলাম তবে এই ভুলের জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী ৷" অন্যদিকে চাঁচল বিধানসভার ঋতব্রত-পন্থী তৃণমূল বিধায়ক প্রাক্তন আইপিএস প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করলেন, তিনি বিধানসভা এবং ব্যক্তিগত কর্মসূচিতে কলকাতায় থাকার ফলে মালা দিতে পারেননি ৷ প্রশাসনের উচিত ছিল বিষয়টি নজরে রাখার ৷ এটা প্রশাসনের ব্যর্থতা ৷
যতদিন বেঁচে ছিলেন অভাব-অনটন নিত্য সঙ্গী ছিল শিবরাম চক্রবর্তীর ৷ কিন্তু 'খাসা আছি'তে কখনও মরচে ধরেনি ৷ কলকাতার মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের একটি মেসবাড়িতে জরাজীর্ণ ঘরে কাটিয়েছেন জীবনের শেষ পর্যন্ত ৷ ঘরের রংচটা দেওয়ালে লিখে রাখতেন পরিচিতদের নাম, ফোন নম্বর ৷ আর থাকত হিসেব-নিকেশ বা বলা ভালো পাওনাগণ্ডার অঙ্ক ৷ তাঁর সহজ-সরল চরিত্রের সুযোগে সারা জীবন অনেকেই ঠকিয়েছেন ৷ কিন্তু শিবরাম চক্রবর্তী আপশোস করতে জানতেন না ৷ জীবনের শেষ সময়ে আর্থিক অনটন তো ছিলই, তার সঙ্গে ছিল একাকীত্ব ৷ 1980 সালের 28 অগস্ট বহু প্রতীক্ষিত 'ট্যাক্সি'তে করে রওনা দিয়েছিলেন সেই অমৃতলোকে, যেখান থেকে কেউ ফিরে আসে না ৷ কিন্তু প্রয়াণের মাত্র 46 বছরেই তাঁকে ভুলে গেল চাঁচল আর বাঙালিও ! আজও তিনি একাই...

