ওড়িশায় মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিক খুনে বিজেপিকে তোপ তৃণমূলের
বাংলা ভাষায় কথা বলাই যেন অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে । ওড়িশার সম্বলপুরে মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিক খুনে বিজেপিকে তোপ তৃণমূলের ৷

Published : December 25, 2025 at 7:10 PM IST
সুতি ও কলকাতা, 25 ডিসেম্বর: বাংলায় কথা বলায় বাংলাদেশি সন্দেহে ওড়িশায় মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিককে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ ৷ ঘটনায় আরও দুই পরিযায়ী শ্রমিক গুরুতর জখম হয়ে হাসপাতালে ভর্তি । এই ঘটনায় বিজেপি'র বিরুদ্ধে আক্রমণ শানাল তৃণমূল ৷
বাংলা ভাষায় কথা বলাই যেন অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে। সেখানে বাঙালিদের টার্গেট করা হচ্ছে ৷ 'বাংলাদেশি' তকমা দিয়ে চলছে অত্যাচার। বৃহস্পতিবার ক্রিসমাসের দিন সাংবাদিক বৈঠক করে এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী শশী পাঁজা। ওড়িশার সম্বলপুরে বাংলা ভাষায় কথা বলার 'অপরাধে' মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হামলার ঘটনাকে হাতিয়ার করে বিজেপিকে 'বাংলাবিরোধী' ও 'সংবিধানবিরোধী' বলে তীব্র আক্রমণ করেন তিনি।
সাংবাদিক বৈঠকে শশী পাঁজা বলেন, "মুর্শিদাবাদের তিন শ্রমিক—আকির শেখ, পলাশ শেখ এবং জুয়েল রানা—ওড়িশার সম্বলপুরে কাজ করতে গিয়েছিলেন। সেখানে শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীরা তাঁদের 'বাংলাদেশি' তকমা দিয়ে নৃশংসভাবে মারধর করে।" এই ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বাকি দুজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তৃণমূলের প্রশ্ন, কেন বিজেপি নেতারা এই ঘটনায় নীরব ? কেন এই ধরণের ঘটনা ক্রমাগত ঘটে চলেছে ?
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বঙ্গসফর ও স্লোগান প্রসঙ্গ টেনেও এদিন কড়া সমালোচনা করেন শশী পাঁজা। তিনি বলেন, "প্রধানমন্ত্রী নদিয়ার সভায় উপস্থিত হতে না-পারলেও, মঞ্চের সামনে লেখা ছিল—'বাঁচতে চাই, বিজেপি তাই'। তাঁর ভাষণেও একই সুর শোনা গিয়েছে । এটা কি সরাসরি হুমকি নয় ? এর অর্থ কি এটাই যে, বেঁচে থাকতে হলে বিজেপি করতে হবে ?" শশী পাঁজার দাবি, বাংলা ভাষায় কথা বললে এবং বিজেপির সঙ্গে না-থাকলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে । অসম ও ওড়িশার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, "বাংলা ভাষায় কথা বলা এখন বিজেপিশাসিত রাজ্যে অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে ৷ যা সম্পূর্ণ সংবিধান বিরোধী।"
বুধবার রাতে ঘটনাটি ঘটেছে ওড়িশার সম্বলপুরে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে মুর্শিদাবাদের সুতিতে । মৃত যুবকের নাম জুয়েল শেখ (21)। তাঁর বাড়ি মুর্শিদাবাদের সুতি থানার চকবাহাদুরপুর এলাকায় ৷ ঘটনায় দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, মৃতের পরিবার ৷ জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার সুপার অমিত কুমার সাউ জানান, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে ।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজমিস্ত্রির কাজে গত 20 ডিসেম্বর ওড়িশায় সম্বলপুরে গিয়েছিলেন জুয়েল । সেখানে অন্যান্য বাংলার শ্রমিকদের সঙ্গে নির্মাণকাজে যুক্ত ছিলেন তিনি । বুধবার ঘরে রান্না করছিলেন তাঁরা। অভিযোগ, সেই সময় স্থানীয় কয়েকজন দুষ্কৃতী হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে । তাঁদের বাংলাদেশি সন্দেহে ঘরে প্রবেশ করে বেধড়ক মারধর শুরু করে। নির্মম মারধরের জেরেই গুরুতর আহত হন জুয়েল শেখ-সহ আরও দু'জন। তিন জনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে পথে মৃত্যু হয় জুয়েলের।
যদিও ওড়িশা পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, এই পরিযায়ী শ্রমিকরা কাজ থেকে ফেরার সময় পথে 6 জন লোক তাঁদের কাছে বিড়ি চায় ৷ বিড়ি নিয়ে তাঁদের মধ্যে বচসা হয় ৷ দুই পক্ষের ঝামেলায় জুয়েল গুরুতর আহত হয় ৷ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয় ৷ এই ঘটনায় 6 জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ৷ ওড়িশা পুলিশের আইজি (নর্দান রেঞ্জ) হিমাংশু কুমার লাল বলেন, "এই ঘটনায় আমরা 6 জনকে গ্রেফতার করেছি ৷ ঘটনার তদন্ত চলছে ৷"
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মৃত যুবকের গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারের একমাত্র সন্তানের অকাল মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনরা। পরিবারের দাবি, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না-হলে ন্যায়বিচার মিলবে না। পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর না-ঘটে, সেই দাবিও তুলেছে মৃতের পরিবার।
ঘটনাটি সামনে আসার পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয় । ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া বাংলার শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে । প্রশাসনের তরফে এখনও পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনও তথ্য না মিললেও পরিবারের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে ৷

