'নন্দীগ্রাম সুস্থ থাকলে আমিও ভালো থাকব', উপনির্বাচনের আগে ঘরের মাটিতে শুভেন্দুর 'উন্নয়ন-বার্তা'
32 রাস্তা, 11,700 বাড়ি, হাসপাতালের শয্যা দ্বিগুণ, 67 হাজার মহিলার অ্যাকাউন্টে 3 হাজার টাকা- সর্বোপরি নন্দীগ্রামকে 'অগ্রাধিকারের শীর্ষে' রাখার বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর ৷

Published : August 31, 2026 at 10:29 PM IST
নন্দীগ্রাম, 31 অগস্ট: 'নন্দীগ্রাম', শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্র নয় । শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা একটি নাম । সেই নন্দীগ্রামেই আবার ফিরে এসে সোমবার একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ।
রেয়াপাড়ার প্রশাসনিক সভা থেকে রাস্তা, আবাসন, স্বাস্থ্য, সেতু, রেল, দমকল কেন্দ্র তৈরি থেকে শুরু করে মহিলাদের আর্থিক সহায়তা- একাধিক ক্ষেত্রে প্রকল্পের কথা জানালেন তিনি । সেই সঙ্গে বললেন, "নন্দীগ্রাম সুস্থ থাকলে আমিও সুস্থ থাকব । মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সমগ্র রাজ্যের উন্নয়ন তো করবই, সেই সঙ্গে নন্দীগ্রাম সবসময় আমার অগ্রাধিকারের জায়গায় থাকবে ।"
সময়টা তাৎপর্যপূর্ণ । 2026-এর বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর- দুই কেন্দ্র থেকেই জিতেছিলেন শুভেন্দু । মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে সাংবিধানিক নিয়ম মেনে নন্দীগ্রাম আসনটি ছেড়ে দিয়েছেন । সেই আসনেই এবার উপনির্বাচন । ইতিমধ্যে বিজেপি সেখানে প্রস্তুতি শুরু করেছে । ফলে উপনির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রীর নন্দীগ্রাম সফর এবং একের পর এক প্রকল্প ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও স্বাভাবিক ভাবেই চর্চা শুরু হয়েছে ।
তবে এদিনের মঞ্চে শুভেন্দুর কথায় উন্নয়নের খতিয়ানের পাশাপাশি বার বার ফিরে এসেছে নন্দীগ্রামের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ । তাঁর বক্তব্য, "আজকের দিনটা নন্দীগ্রামের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দিন । আপনারা আমাকে আগে নির্বাচিত করেছিলেন, এ বারও করেছেন ।" মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সময় খুব বেশি না গেলেও নন্দীগ্রামের জন্য যে কাজ শুরু হয়েছে, তা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি জানান, ইতিমধ্যেই 32টি নতুন রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ হয়েছে । কোথাও উদ্বোধন, কোথাও আবার নতুন রাস্তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছে । 17টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত নন্দীগ্রামের গ্রামীণ পরিকাঠামোয় এই কাজকে 'নতুন দিগন্ত' বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী । পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতর, পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ এবং হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদকে এ জন্য ধন্যবাদও জানান তিনি ।
রাস্তার পর আবাসন । মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, চলতি বছরে নন্দীগ্রামে 11 হাজার 700টি নতুন বাড়ি তৈরি করা হবে । ইতিমধ্যেই প্রথম কিস্তির 60 হাজার টাকা দেওয়ার কথাও জানান তিনি । পাশাপাশি 125 দিনের কাজের সূচনার কথাও বলেন । তাঁর দাবি, এই প্রকল্পে বিভিন্ন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হবে এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির অ্যাকাউন্টেও অর্থ পাঠানো হয়েছে ।
মহিলাদের আর্থিক সহায়তার প্রসঙ্গেও এদিন বড় অঙ্ক তুলে ধরেছেন শুভেন্দু । তাঁর বক্তব্য, নন্দীগ্রামে এখনও পর্যন্ত 67 হাজার মহিলার অ্যাকাউন্টে মাসে 3 হাজার টাকা করে পাঠানো হয়েছে । আরও প্রায় পাঁচ হাজার উপভোক্তার যাচাই বা প্রক্রিয়া চলছে । তবে এ দিনের ঘোষণার অন্যতম বড় অংশ স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ।
নন্দীগ্রামের রেয়াপাড়া হেলথ সেন্টারের শয্যাসংখ্যা 30 থেকে বাড়িয়ে 60 করার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী । মহেশপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উন্নয়ন, নন্দীগ্রাম জেলা হাসপাতালে নতুন 'মা-মাতৃ' ভবনের কাজ এবং রোগীদের পরিজনদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির কথাও জানান তিনি । নন্দীগ্রাম সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে জনৌষধি কেন্দ্র চালুর কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী । পাশাপাশি চালু হয়েছে 'মা-আহার' ক্যান্টিন । সেখানে মাত্র 5 টাকায় খাবার মিলবে বলে ঘোষণা । সপ্তাহে দু'দিন মাছ দেওয়ার কথাও জানান তিনি ।
এত দিন নন্দীগ্রামে অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে ময়নাতদন্তের জন্য তমলুকে যেতে হত । এ বার সেই সমস্যারও সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন শুভেন্দু । নন্দীগ্রামেই মর্গ তৈরির ঘোষণা করেছেন তিনি । পাশাপাশি হরিপুরে দমকল কেন্দ্রের উদ্বোধন হয়েছে । যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একাধিক ঘোষণার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী । হলদিয়া-নন্দীগ্রাম সংযোগকারী সেতুর কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি । ভূমিপুজোয় নিজে আসার কথাও জানান । এমনকী সেতু তৈরি হলে তার উপর দিয়ে প্রথম গাড়ি নিজেই চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার কথাও বলেন । নন্দীগ্রামের রেল প্রকল্প নিয়েও শুভেন্দুর দাবি, জমি-জট কাটাতে ইতিমধ্যেই সাড়ে তিন একর জমি রেলকে দেওয়া হয়েছে । বাকি জমিও দেওয়া হবে বলে জানান তিনি ।
স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী । খাল সংস্কার, কাঠের পুল সরিয়ে নতুন সেতু, আধুনিক বাসস্ট্যান্ড তৈরি এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া বাস পরিষেবা আরও বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন তিনি । একই সঙ্গে নন্দীগ্রামের বিভিন্ন 'মিথ্যা মামলা' প্রত্যাহারের কাজ শুরু হয়েছে বলেও দাবি করেন ।
প্রশাসনিক সভা হলেও এদিন রাজনীতিও ছিল যথেষ্ট । আগের সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে শুভেন্দু স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন । একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে বার বার উঠে আসে নন্দীগ্রামের মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক ।
সেই সম্পর্কের শিকড় অবশ্য আরও গভীরে । বাম জমানায় জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামের আন্দোলনই শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সোপান । 2016 সালে প্রথম বার নন্দীগ্রাম থেকে বিধায়ক হন তিনি । 2021-এ বিজেপির প্রার্থী হয়ে সেই আসনেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেন । 2026-এও নন্দীগ্রাম তাঁর দখলেই থাকে । এ বার ব্যবধানও বেড়েছে ।
তবে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য নন্দীগ্রাম ছাড়তে হয়েছে তাঁকে । ভবানীপুরের বিধায়ক হিসেবেই মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন তিনি । নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরও অবশ্য বার্তা দিয়েছিলেন, আসন ছাড়লেও নন্দীগ্রামের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হবে না । নন্দীগ্রাম তাঁর অগ্রাধিকারের জায়গাতেই থাকবে ।
সোমবার রেয়াপাড়ার মঞ্চে যেন সেই কথাই ফের মনে করিয়ে দিলেন শুভেন্দু । শুধু উন্নয়নের তালিকা নয়, নন্দীগ্রামকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক পথচলার কথাও তুলে ধরলেন । ভোটারদের মনে করিয়ে দিলেন, 2021 সালে তাঁকে যে বিপুল ব্যবধানে জিতিয়েছিল নন্দীগ্রাম, সেই আস্থার কথা । এ বার তাঁর আবেদন আরও স্পষ্ট, "আমাকে 82 হাজার ভোটে জিতিয়েছিলেন । এ বার রেকর্ড ভাঙবেন তো ?"
উপনির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তার রাজনৈতিক পাঠ তাই বেশ পরিষ্কার । নন্দীগ্রামকে শুধু একটি ছেড়ে দেওয়া আসন হিসাবে দেখতে নারাজ শুভেন্দু । বরং উন্নয়নের খতিয়ান, পুরনো সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি- সব মিলিয়ে নন্দীগ্রামের মাটিতে নিজের রাজনৈতিক উপস্থিতি আরও এক বার স্পষ্ট করে দিতে চাইলেন তিনি ।
ভোট দেন-না ঠিক আছে, আমি তো সবার মুখ্যমন্ত্রী ! নন্দীগ্রামে বার্তা 'মুক্তহস্ত' শুভেন্দুর
সুপ্রিম-নির্দেশে চাকরির মেয়াদ 9 মাস বৃদ্ধির পর কী বলছেন চাকরিহারা ‘যোগ্য’ শিক্ষকরা

