'হুজুর ছেলের খুনিদের সাজা দিন', বরুণ বিশ্বাসের 92 বছরের বাবার করুণ আর্তি আদালতে
প্রতিবাদী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসের খুনের ঘটনায় বাবা জগদীশ বিশ্বাসের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হল বনগাঁ ফাস্টট্র্যাক কোর্টে। বিচারক চেয়ার ছেড়ে জগদীশবাবুর সামনে এসে তাঁর কথা শোনেন।

Published : September 1, 2026 at 12:41 PM IST
বনগাঁ, 1 সেপ্টেম্বর: মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস খুনে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। সেই মামলায় নিহত শিক্ষকের বাবা 92 বছরের বৃদ্ধ জগদীশ বিশ্বাস আদালতে দাঁড়িয়ে বিচারকের কাছে ছেলের খুনিদের সাজার দাবি করলেন। সোমবার মামলার 38তম সাক্ষীর হিসাবে তিনি বনগাঁ মহকুমা আদালতে হাজির হয়েছিলেন।
আদালতে ছিলেন বরুণের দাদা অসিত বিশ্বাসও। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আবেগপ্রবণ হয়ে জগদীশবাবু কেঁদে ফেলেন। বিচারককে তিনি বলেন, "ছেলের খুনের পর পুলিশ ও সিআইডি তাঁকে কোনও সহযোগিতা করেনি। এমনকী তাঁকে নিজের কথা বলতেও দেওয়া হয়নি।"
এদিন বনগাঁ, ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের বিচারক দুর্গাশঙ্কর রানার এজলাসে বরুণ বিশ্বাসের মামলার শুনানি হয়। নির্ধারিত সময়ে নিহত শিক্ষকের বাবা জগদীশ বিশ্বাস এজলাসে দাঁড়িয়ে বিচারকের কাছে ছেলের খুনিদের শাস্তির দাবি করেন। তিনি একা আদালতে দাঁড়াতে পারছিলেন না। দু'জন তাঁকে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিচারক চেয়ার ছেড়ে জগদীশবাবুর সামনে এসে তাঁর কথা শোনেন। কথা বলতে বলতে জগদীশবাবু কেঁদে ফেলেন।
সরকার পক্ষের বিশেষ আইনজীবী দেবরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "নিহত শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসের বাবা জগদীশ বিশ্বাসের অনেক বয়স হয়েছে। তাঁকে দু'জন ধরে দাঁড় করিয়েছিলেন। বিচারক সেটা মেনে নিয়েছেন। জগদীশবাবু ভালো করে কথা বলতে পারছিলেন না। বিচারক তাঁর চেয়ার ছেড়ে নীচে নেমে এসে তাঁর কথা শুনে। জগদীশ এই ঘটনায় রাজ্যের এক প্রাক্তন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। ওই প্রাক্তন মন্ত্রীর ষড়যন্ত্রেই তাঁর ছেলে খুন হয়েছে বলে বিচারককে বলেছেন। তিনি ছেলে খুনের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি করেছেন।"
উত্তর 24 পরগনার গাইঘাটার বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া সুটিয়া গ্রাম বাম জমানায় দুষ্কৃতীদের মুক্তরাজ্য ছিল। গ্রামের অসংখ্য কিশোরী ও গৃহবধূ দুষ্কৃতীদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিলেন। দুষ্কৃতীদের মাথায় রাজনৈতিক নেতাদের আশীর্বাদের হাত থাকায় পুলিশ সে সময় কিছু করেনি। সুটিয়ার বাসিন্দা কলকাতার শিয়ালদা মিত্র ইস্টিটিউশনের শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মঞ্চ গড়ে তোলেন। গ্রামের নৈরাজ্যের কথা জানিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে তিনি চিঠি লিখেছিলেন।
পত্রপাট রাজ্য মহিলা কমিশনের প্রতিনিধি দল গ্রামে ছুটে গিয়েছিল। 2002 সাল গাইঘাটা থানায় মোট 33টি ধর্ষণের মামলা লিপিবদ্ধ হয়েছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নির্দেশে তৎপর হয়েছিল পুলিশও। ধর্ষকরা একে একে গ্রেফতারও হয়েছিল। সেই সময় প্রতিবাদী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসের কিছু হয়নি।
বরুণ বিশ্বাস খুন হন 2012 সালের 5 জুলাই। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে গোবরডাঙা রেলস্টেশনে দুষ্কৃতীরা তাঁকে গুলি করে খুন করেছিল। তখনও একটা পরিবর্তনের সরকার। পুলিশ ক'য়েকজনকে গ্রেফতার করেছিল। কিন্তু, নিহত শিক্ষকের পরিবারের অভিযোগ ছিল, মূল অভিযুক্তকে আড়াল করতে অন্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তৃণমূল সরকার বরুণ বিশ্বাস খুনের মামলায় সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দেয়। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, তদন্তকারীরা একবারের জন্যও তাঁদের সঙ্গে কথা বলেননি।
নিহত শিক্ষকের দিদি প্রমীলা বিশ্বাস বারবার অভিযোগ করেছেন, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকই বরুণের হত্যাকাণ্ডের মূল ষড়যন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু পুলিশ বারবার তাঁকে আড়াল করার চেষ্টা করেছে। সম্প্রতি, রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসের খুনের মামলায় নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। রাজ্য পুলিশকে তিনি সিট গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন। সিটের আধিকারিকরা ইতিমধ্যে সুটিয়া গ্রামে গিয়ে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছেন।

