মধ্যমগ্রাম ট্রলি-কাণ্ডে দোষী মা-মেয়ের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ আদালতের
প্রমাণ লোপাট মামলায় সাতবছরে কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক ৷ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা জানালেন আসামীপক্ষের আইনজীবী ৷

Published : November 3, 2025 at 9:19 PM IST
বারাসত, 3 নভেম্বর: মধ্যমগ্রামের হাড়হিম করা ট্রলি-কাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত মা ও মেয়েকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা ঘোষণা করল বারাসত আদালত ৷ দীর্ঘ শুনানির পর সোমবার বারাসতের সপ্তম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতের বিচারক প্রজ্ঞাগার্গী ভট্টাচার্য (হুসেন) দোষীদের এই সাজা শুনিয়েছেন ৷
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি এদিন মধ্যমগ্রামে সুমিতা ঘোষের খুনের মামলায় তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ফাল্গুনী ঘোষ ও তাঁর মা আরতি ঘোষকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের সাজা শুনিয়েছেন বিচারক ৷ তবে, যাবজ্জীবন সাজার আগে দোষী ওই দু'জনের সাত বছরের সাজা শুরু হবে জানিয়েছেন সরকারি আইনজীবী ৷
উল্লেখ্য, চলতি বছরের 23 ফেব্রুয়ারি মধ্যমগ্রামের দক্ষিণ বীরেশ পল্লির বাড়িতে সুমিতা ঘোষকে নৃশংসভাবে খুন করার অভিযোগ ওঠে তাঁরই দুই আত্মীয় ফাল্গুনী ও আরতির বিরুদ্ধে ৷ খুনের একদিন পর সুমিতার খণ্ড-খণ্ড দেহ ট্রলিতে ভরে গঙ্গার ঘাটে ফেলতে গিয়ে স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ে যান খুনি মা ও মেয়ে ৷
হাড়হিম করা সেই খুনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে যায় রাজ্যজুড়ে ৷ প্রথমে কলকাতা উত্তর বন্দর থানার পুলিশ এই খুনের ঘটনার তদন্ত শুরু করলেও, পরে সেই তদন্তভার যায় মধ্যমগ্রাম থানার পুলিশের হাতে ৷ তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে ধৃত ফাল্গুনী ও তাঁর মা আরতি, সুমিতার সোনাদানা এবং সম্পত্তির লোভে তাঁকে পরিকল্পনা করে হত্যা করেছিলেন ৷ খুনের পর মা ও মেয়ে দু'জনেই মধ্যমগ্রামের একটি সোনার দোকান থেকে গয়নাও কিনেছিলেন ৷ সেই গয়নার টাকা মেটানো হয়েছিল মৃত সুমিতা ঘোষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকেই ৷ সেই তথ্যও উঠে এসেছিল তদন্তকারীদের হাতে ৷

বিবাহবিচ্ছিন্না সুমিতা ঘোষ অসমে ভাইয়ের বাড়িতে থাকতেন ৷ তাঁর ভাইপোর সঙ্গেই ফাল্গুনীর বিয়ে হয় ৷ কিন্তু, বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে অশান্তি হওয়ায় ফাল্গুনী তাঁর মা আরতির কাছে ফিরে আসেন ৷ মা ও মেয়ে মধ্যমগ্রামের দক্ষিণ বীরেশ পল্লির একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন ৷
তবে, পিসি শাশুড়ি সুমিতার সঙ্গে ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল ফাল্গুনী'র ৷ চলতি বছরের 11 ফেব্রুয়ারি সুমিতা মধ্যমগ্রামে ফাল্গুনীর বাড়িতে আসেন ৷ কলকাতায় বোন শিপ্রা ঘোষের বাড়িতেও যান তিনি ৷ ভাঙা সংসার জোড়া লাগাতে পিসি শাশুড়িকে নিয়ে ফাল্গুনী তাঁর প্রাক্তন স্বামীর বর্ধমানের সমুদ্রগড়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন ৷ সঙ্গে মা আরতি ঘোষও ছিলেন ৷
ফিরে আসার পর 23 ফেব্রুয়ারি তাঁদের মধ্যে অশান্তি হয় ৷ অশান্তির সময় ফাল্গুনী ভারী কিছু দিয়ে সুমিতার মাথায় আঘাত করেন বলে অভিযোগ ৷ তারপর মা ও মেয়ে মিলে তাঁকে শ্বাসরোধ করে খুন করেন ৷ ওই দিন গভীর রাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে সুমিতার মুণ্ডু কেটে দেহ থেকে আলাদা করে দেয় বলে অভিযোগ ৷ খুনের পর সুমিতার দেহ থেকে সমস্ত সোনার গয়না খুলে নেয় মা ও মেয়ে ৷ পরে সেগুলি মধ্যমগ্রামের একটি সোনার দোকানে তাঁরা 2 লক্ষ 59 হাজার টাকায় বিক্রি করে আসেন ৷

পিসি শাশুড়ির মৃতদেহ ঘরে রেখে 24 ফেব্রুয়ারি প্রথমে ফাল্গুনী ও আরতি কলকাতায় গিয়েছিলেন ৷ বড়বাজারে থেকে ট্রলি কিনে তাঁরা বউবাজারে একটি সোনার দোকানে গিয়েছিলেন ৷ ওই দোকান থেকে ফাল্গুনী 1 লক্ষ 63 হাজার টাকার সোনার গয়নার অর্ডারও দিয়েছিল ৷ গয়নার অর্ডারের বিল নিহত সুমিতার নামেই করা হয়েছিল ৷ নিহতের মোবাইল থেকে অনলাইনের মাধ্যমে ফাল্গুনী 50 হাজার টাকা আগাম পরিশোধ করেছিলেন ৷ অভিযোগ ওঠে, কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরে হাতুড়ি দিয়ে পিসি শাশুড়ির দু’টো পা ভেঙে ট্রলিতে দেহ ঢুকিয়ে, তা গঙ্গা ফেলে দিতে গিয়েছিলেন ফাল্গুনী এবং তাঁর মা ৷
25 ফেব্রুয়ারি ভোরে মা ও মেয়ে ভাড়া বাড়ি থেকে ভ্যানে করে সুমিতার দেহ মধ্যমগ্রামের দোলতলা পর্যন্ত নিয়ে যায় ৷ সেখান থেকে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে কলকাতার গঙ্গার ঘাটে চলে আসেন ৷ ট্রলি বের করে কুমোরটুলি গঙ্গায় ফেলার আগেই স্থানীয়দের সন্দেহ হয় এবং তারা পুলিশে খবর দেয় ৷ উত্তর বন্দর থানার পুলিশ ট্রলি খুলতেই সুমিতার দেহ বেরিয়ে পড়ে ৷ ফাল্গুনী ঘোষ ও আরতি ঘোষকে গ্রেফতার করে পুলিশ ৷
গত আট মাস ধরে মধ্যমগ্রামের এই খুনের মামলাটি চলে বারাসত আদালতের সপ্তম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারকের এজলাসে ৷ আদালতে গত মে মাসে পুলিশ ফাল্গুনী ও আরতির বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেয় ৷ মামলায় মোট 32 জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে ৷ প্রায় আট মাস মামলা চলার পর শুক্রবার সুমিতা ঘোষকে খুনের অভিযোগে ধৃত ফাল্গুনী ও আরতি ঘোষকে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা আইনের 103(1) ও 238/3(5) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে বারাসত আদালত ৷ সোমবার তাঁদের সাজা ঘোষণা করলেন বিচারক ৷
এই বিষয়ে সরকার পক্ষের আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় বলেন, "এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামিকে আগে সাত বছর কারাগারে কাটাতে হবে তথ্যপ্রমাণ লোপাটের জন্য ৷ তারপর তাঁদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড শুরু হবে ৷ অর্থাৎ, আজীবন দু'জনকে কারাগারেই কাটাতে হবে ৷ আমরা বিচারকের কাছে ফাঁসির দাবি জানিয়েছিলাম ৷ কিন্তু, বিচারক এই মামলাটি বিরলের মধ্যে বিরলতম মনে করেননি ৷ সেই কারণে যাবজ্জীবন সাজার নির্দেশ দিয়েছেন ৷ দু’টি ধারাতে আসামিদের দেড় লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে ৷ ফরেনসিক, টেকনিক্যাল-সহ পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ খুনিদের সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ৷"
এই রায়ের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আসামী পক্ষের আইনজীবী তারকচন্দ্র দাস ৷ তবে, সাজা ঘোষণার পর মা ও মেয়ে দু'জনেই নিরুত্তাপ ছিলেন আদালতকক্ষে ৷

