'মৃত' ব্যক্তির নথি চুরি করে হিঙ্গলগঞ্জে ভোটার তালিকায় নাম তুললেন বাংলাদেশি !
'মৃত' ব্যক্তির আরও এক ছেলে ! এন্যুমারেশন ফর্ম ফিল-আপে নিজের 'বাবার' নাম দেখে চমকে গেলেন মৃতের ছেলে । বাংলাদেশির এমন কীর্তি ধরা পড়েছে হিঙ্গলগঞ্জে ।

Published : December 7, 2025 at 6:05 PM IST
হিঙ্গলগঞ্জ, 7 ডিসেম্বর: এবার 'মৃত' ব্যক্তির নথিপত্র চুরি করে এদেশের ভোটার তালিকায় নাম তোলার অভিযোগ উঠল এক বাংলাদেশির বিরুদ্ধে । এখানেই শেষ নয় । এসআইআরের ফর্ম ফিল-আপেও ওই বাংলাদেশি নিজের 'বাবা' হিসেবে দেখিয়েছেন 'মৃত' ব্যক্তিকে । আর তা দেখতে পেয়ে চমকে ওঠেন মৃত অজিত সরকারের ছেলে অসীম সরকার । ঘটনাটি উত্তর 24 পরগনার হিঙ্গলগঞ্জের রামেশ্বরপুর-বরুনহাট পঞ্চায়েতের 34 নম্বর বুথের ৷
ইতিমধ্যে অভিযুক্ত বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মৃতের ছেলে হাসনাবাদ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন । অবিলম্বে অভিযুক্তের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে ভুক্তভোগী অসীম সরকারের পরিবার । এদিকে, ওই বাংলাদেশি নিজের দোষ স্বীকার করলেও এ নিয়ে সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করেছেন । নিজের বাবার নামের সঙ্গে মৃত ব্যক্তির নাম-পদবি মিলে যাওয়ায় তিনি এই বেআইনি কাজ করেছেন বলে দাবি করেছেন ।
আর গোটা ঘটনায় শাসক ও গেরুয়া শিবিরের মধ্যে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর । তৃণমূল বিজেপির বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ করলেও পালটা এ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভারতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগ এনেছে পদ্ম শিবির । অভিযোগ, পালটা অভিযোগ ঘিরে রাজনীতির হাওয়া-ও গরম হতে শুরু করেছে হিঙ্গলগঞ্জ বিধানসভা এলাকায় ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত বাংলাদেশির নাম বিভূতি সরকার । বছর 30 আগে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেন এই বাংলাদেশি ব্যক্তি । এরপর থেকে পাকাপাকিভাবে তিনি বসবাস করতে শুরু করেন হিঙ্গলগঞ্জের রামেশ্বরপুর এলাকায় । শুধু সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দাই হননি । অভিযোগ, অসৎ উপায়ে এদেশের ভোটার এবং আধার কার্ডও তৈরি করেছেন বিভূতি । কিন্তু সেই অসৎ কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রতিবেশী অসীম সরকারের 'মৃত' বাবাকে নিজের 'বাবা' হিসেবে দেখিয়েছেন ।

এমনকি হিঙ্গলগঞ্জ বিধানসভার 34 নম্বর বুথের যে সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে সেখানেও দেখা যাচ্ছে বিভূতি সরকারের 'বাবা' হিসেবে রয়েছে অজিত সরকারের নাম । অথচ,অজিত সরকার মারা গিয়েছেন তাও কয়েক বছর আগে । সেই 'মৃত' ব্যক্তিকেই এসআইআরের এন্যুমারেশন ফর্মে নিজের 'বাবা' হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বাংলাদেশি এই ব্যক্তি ।
আর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে এলাকায় । হতবাক হয়ে গিয়েছেন মৃত অজিত সরকারের ছেলে অসীম-ও । বিপদের আশঙ্কায় তড়িঘড়ি তিনি দ্বারস্থ হয়েছেন পুলিশের । অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তথ্য কারচুপির অভিযোগও দায়ের করেছেন হাসনাবাদ থানায় । সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নেমেছে পুলিশ । তবে,এখনও অবধি তাঁকে আটক কিংবা গ্রেফতার কিছুই করা হয়নি বলে দাবি পরিবারের । প্রশাসন অবশ্য বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ পদক্ষেপ করার আশ্বাস দিয়েছে ।
মৃত অজিতের পুত্রবধূ শুক্লা সরকার বলেন, "অজিত সরকার আমার শ্বশুরমশাই । উনি মারা গিয়েছেন অনেক আগেই । অথচ তাঁর ডকুমেন্ট চুরি করে ভোটার হয়েছেন বিভূতি সরকার নামে ওই ব্যক্তি । উনি আমাদের পরিবারের কেউ হন না । আমরা চাই পুলিশ এর বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিক ।"

এদিকে, অজিত সরকারের নথি কীভাবে গেল বিভূতি সরকারের কাছে? সেই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে অভিযুক্ত বাংলাদেশি ব্যক্তি বলেন, "1996 সালে বাংলাদেশ থেকে এদেশে আসার পর ভোটার লিস্টে নাম তোলার জন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছিল না । এরপর কম্পিউটার থেকে ভোটার লিস্ট ঘাঁটতে গিয়ে দেখতে পাই, আমার বাংলাদেশি বাবা অজিত সরকারের সঙ্গে ভারতের বাসিন্দা অজিত সরকারের নাম-পদবির হুবহু মিল রয়েছে । উনি আমার আসল বাবা নন । ও'র তথ্য কারচুপি করেই ভোটার লিস্টে নাম তুলেছি । এই বিষয়ে পঞ্চায়েত সদস্যও সহযোগিতা করেছে আমাকে । শুনলাম আমার নামে অভিযোগ হয়েছে । কিন্তু, পুলিশ আমাকে এখনও অবধি থানায় যোগাযোগ করতে বলেনি ।"
অন্যদিকে, বিপদ বুঝে 'বাংলাদেশি' বিভূতি সরকারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা করেছেন তৃণমূলের স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য বিশ্বজিৎ নাথ । তাঁর দাবি, "বিভূতি সরকার কোনও ব্যক্তিকে আমি চিনি না । তবে, এটুকু জানি মৃত অজিত সরকারের একমাত্র ছেলে অসীম । অভিযুক্ত কীভাবে ভোটার লিস্টে নাম তুললেন বলতে পারব না । যদি কোনও বেআইনি কাজ হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখবে । বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করছে । এসব করে বিশেষ কোনও লাভ হবে না, এটুকু বলতে পারি ।"
এ নিয়ে পালটা শাসক দলের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে গেরুয়া শিবির । স্থানীয় বিজেপি নেতা রাজেন্দ্র সাহা বলেন, "আমরা তো বারবারই বলে আসছি সীমান্তবর্তী বসিরহাট মহকুমা এলাকায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের আধার ভোটার কার্ড তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে টাকার বিনিময়ে । এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে মদত রয়েছে শাসক দলের নেতা, পঞ্চায়েত সদস্য থেকে বিধায়কদেরও । এই ঘটনায় আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেল আমাদের অভিযোগ কতটা সত্য । আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে শুধু অভিযোগই জানাচ্ছি না । তার সঙ্গে এটাও বলব ভুয়ো আধার, ভোটার-কাণ্ডে ইডি-সিবিআইয়ের তদন্ত হওয়া উচিত । যাতে বাংলাদেশিদের রক্ষা করার জন্য শাসকদলের নেতারা সাজা পায় ।"

