'লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পেতাম, ভোট দিয়েছি দু'বার', সীমান্তে অপেক্ষারত বাংলাদেশি প্রৌঢ়ার স্বীকারোক্তি
পশ্চিমবঙ্গে এসে সব ঠিকঠাক ছিল ৷ এমনকী বাংলাদেশি মহিলাদের অনেকে রাজ্যের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকাও পেতেন ৷ এসআইআর আতঙ্কে দেশ ছাড়তে হচ্ছে তাঁদের ৷

Published : November 20, 2025 at 7:21 PM IST
স্বরূপনগর (উত্তর 24 পরগনা), 20 নভেম্বর: রাজ্যে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন অর্থাৎ এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া শুরু হতেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভিড় জমিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা ৷ জিনিসপত্র বোঝাই বড় ট্রলি, ব্যাগ নিয়ে পুশব্যাকের অপেক্ষা করছেন দিনভর ৷ বিএসএফ তাঁদের সীমান্তের ওপারে পুশব্যাক করে পাঠিয়ে দিচ্ছে ৷ কখন সেই ডাক আসবে ? অপেক্ষায় থেকে থেকে অনেকে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিচ্ছেন ৷ শিশু থেকে তরুণ, মহিলা, পুরুষ, প্রৌঢ়, প্রৌঢ়া- সব বয়সিরা দেশে ফেরার জন্য অধীর ৷
এখানে অপেক্ষারত এই বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকে এই রাজ্যে ভোট দিয়েছেন ৷ তাঁদের আধার-ভোটার কার্ডও আছে ৷ এমনকী তৃণমূল সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকাও পেয়েছেন বহু বাংলাদেশি মহিলা ৷ কিন্তু 2002 সালের শেষ এসআইআর-এর পর সংশোধিত ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম নেই ৷ তাই ভয়ে দেশে ফিরছেন ৷
তেমনই একজন প্রৌঢ়া রোকেয়া বিবি ৷ রুটি-রুজির টানে 10 বছর আগে বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে চোরাপথে ভারতে এসেছিলেন তিনি ৷ সঙ্গে ছিলেন পরিবারের বাকি সদস্যরা ৷ কলকাতার সংলগ্ন সল্টলেকের প্রত্যন্ত এলাকায় সংসার থুড়ি, ঝুপড়ি বেধে বাস করছিলেন তিনি ৷ স্বামী, সন্তান নিয়ে এদিক-ওদিক কাজ করে দিন চলছিল ৷ বাধ সাধল ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া ৷ তাই বাংলাদেশে চলে যেতে হচ্ছে ৷
2021 সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যে মহিলাদের ক্ষমতায়নে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার চালু করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ পরে প্রকল্পে দেয় টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করেছেন তিনি ৷ এই সুবিধা পেয়েছেন রোকেয়া বিবি এবং তাঁর মতো আরও অনেক বাংলাদেশ থেকে আসা মহিলারা ৷ তাঁরা এখানে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন ৷ সেই অ্যাকাউন্টে নিয়মিত জমা পড়েছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা ৷
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রৌঢ়া রোকেয়া বলেন, "এদেশে আসার পর কলকাতার কাছে সল্টলেক সেক্টর ফাইভে থাকতে শুরু করি ৷ মাঠের পাশে ঝুপড়ির ঘরে পরিবার নিয়ে থাকতাম ৷ লোকের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে দিন গুজরান হত ৷ বেশি রোজগারের জন্য কখনও কখনও কাগজ কুড়িয়েছি ৷ এদেশের আধার, ভোটার কার্ড আছে ৷ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল ৷ প্রথম দিকে মাসে মাসে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পাঁচশো টাকা করে পেতাম ৷ পরের দিকে কয়েক মাস হাজার টাকা করেও পেয়েছি ৷" রোকেয়া বিবি পরিষ্কার বলেন, "ভোট দিয়েছি দু-দু'বার ৷" প্রৌঢ়া জানালেন, তাঁর বাড়ি বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানা এলাকায় ৷ এখন স্বরূপনগরের হাকিমপুর সীমান্তে অপেক্ষা করছেন তিনি ৷
কেন ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছেন ? এই প্রশ্ন করতে রোকেয়া বলেন, "2002-র সংশোধিত ভোটার তালিকায় নাম নেই ৷ সবাই ভয় দেখাচ্ছে ৷ যদি কোনও সমস্যা হয় ৷ তাই দেশে ফিরে যাচ্ছি ৷ বয়স হয়েছে ৷ আর ভারতে আসব না ৷ বাকি জীবনটা দেশেই থাকব ৷" রাজ্যে আধার ও ভোটার কার্ড পেলেন কী করে ? টাকার বিনিময়ে ? এই বিষয়টি অস্বীকার করে গিয়েছেন বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা প্রৌঢ়া ৷
সীমান্তের বিএসএফ চেকপোস্টের সামনে বুধবার থেকে ঠাই বসে রয়েছেন রোকেয়া এবং তার মতো আরও অনেক বাংলাদেশি নাগরিক ৷ কখন তাঁদের বাংলাদেশে 'পুশব্যাক'-এর ডাক আসবে ৷ বিএসএফ সূত্রে খবর, নথিপত্র মিলিয়ে দেখার পর প্রতিদিন গড়ে 200 জন করে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে 'পুশব্যাক' করে ফেরত পাঠানো হচ্ছে ৷
প্রায় প্রতিদিনই হাকিমপুর সীমান্তের বিএসএফ চেকপোস্টের সামনে উপচে পড়ছে ভিড় ৷ এসআইআর শুরু হওয়ায় তাঁরা এখন বাংলাদেশে ফিরে যেতে মরিয়া ৷ হাকিমপুর সীমান্তে বিএসএফের চেকপোস্টের সামনে লোটা-কম্বল, বড় বড় ট্রলি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে বসে রয়েছেন রোকেয়া বিবির মতো আরও বহু বাংলাদেশি ৷ বিএসএফ কখন বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠিয়ে দেবে, অপেক্ষা শুধু ধাক্কা খাওয়ার ৷

