বাইরে খরচ লক্ষাধিক, বিনামূল্যে বহু শিশুর 'ক্লাবফুট' নিরাময় করছে আসানসোল জেলা হাসপাতাল
শিশুর বাঁকা এবং বিকৃত পাকে বলা হয় 'ক্লাবফুট' ৷ আসানসোল জেলা হাসপাতালে ইতিমধ্যে প্রায় 300-র বেশি রোগীর সফলভাবে অস্ত্রোপচার করে সুস্থ হয়েছে ।

Published : March 4, 2026 at 6:14 PM IST
তারক চট্টোপাধ্যায়
আসানসোল, 4 মার্চ: একসময় সচেতনতার অভাবে মফঃস্বলের মানুষজন যে রোগকে কার্যত 'অভিশাপ' বলে চিহ্নিত করত, সেই রোগের চিকিৎসাতেই নজির সৃষ্টি করেছে আসানসোল জেলা হাসপাতাল । জন্মের পরে অনেক শিশু বাঁকা পা নিয়ে জন্মায় । চিকিৎসার পরিভাষায় যাকে বলা হয় 'ক্লাবফুট' (Clubfoot) ।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পনসেটি মেথডে (Ponseti Method) এই 'ক্লাব ফুটে'র চিকিৎসা আসানসোল জেলা হাসপাতালে বিনামূল্যে হয় । গত 10 বছরে প্রায় সাড়ে তিনশো শিশুর বাঁকা এবং বিকৃত পা সোজা করেছে ওই হাসপাতাল । যাদের আর বিশেষভাবে সক্ষমদের জন্য যে শংসাপত্র তা নিতে হয়নি ।
কী এই 'ক্লাবফুট'?
'ক্লাবফুট' রোগ আসলে একটি জন্মগত পায়ের বিকৃতি । জন্মের সময় শিশুর এক বা দুই পা ভেতরের দিকে বেঁকে থাকে । সময়মতো চিকিৎসা না-হলে ভবিষ্যতে হাঁটা-চলা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে সমস্যা তৈরি হয় । সারাজীবন ওই বাঁকা পা নিয়েই চলতে হয় তাদের । এই রোগীদের বিশেষভাবে সক্ষম হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হয় ।
কিন্তু আসানসোল জেলা হাসপাতালের অস্থি বিভাগের চিকিৎসকদের চ্যালেঞ্জ ছিল, জন্মের পর 'ক্লাবফুটে' আক্রান্ত শিশুদের বিশেষভাবে সক্ষম শংসাপত্র নয়, বরং সঠিক চিকিৎসায় তাদের ফেরাতে হবে স্বাভাবিক জীবনে । আসানসোল জেলা হাসপাতাল অর্থোপেডিক সার্জন নির্ঝর মাজি বলেন, "প্রতি হাজার নবজাতকের মধ্যে অন্তত 1–2 জন এই সমস্যায় আক্রান্ত হয় । পনসেটি মেথডেই আসানসোল জেলা হাসপাতালে এই রোগের চিকিৎসা চলছে গত 10 বছর ধরে ।"
কী এই পনসেটি মেথড?
আন্তজার্তিক অস্থি বিশেষজ্ঞ ইগনাসিও পনসেটি এই চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করেছিলেন । তাই এই চিকিৎসা পদ্ধতিকে পনসেটি মেথড বলে । আসানসোল জেলা হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, জটিল বড় অস্ত্রোপচার ছাড়াই ধাপে ধাপে এই রোগের চিকিৎসা করা হয় । নবজাতকের পা বাঁকা দেখার পরেই এই চিকিৎসা খুব দ্রুত শুরু করতে হয় । সাধারণত পাঁচ সপ্তাহ ধরে নিয়মিত প্লাস্টার পরিবর্তন করা হয় । অর্থাৎ বারবার প্লাস্টার করা হয় ।

অর্থোপেডিক সার্জন নির্ঝর মাজি বলেন, "এক্ষেত্রে ছোট শিশুর পায়ে বারবার প্লাস্টার করা বেশ কঠিন কাজ । কিন্তু তা সত্ত্বেও এই পদ্ধতিতে প্লাস্টার করতেই হবে । সেক্ষেত্রে বাবা-মায়েরও একটা দায়িত্ব থাকে । শিশুটির কোনোরকমের কষ্ট বা প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে কি না, তা নজর রাখা । এই মুহূর্তে আমরা সমস্ত চিকিৎসকদের ফোন নম্বর শিশুর বাবা-মাকে দিয়ে রাখি । যাতে কোনোরকমের কিছু অসুবিধা মনে হলে আমাদের সঙ্গে তারা দ্রুত ও সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন ।"
তিনি আরও বলেন, "এরপরেই একটি ছোট টেনোটমি করা হয় । লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া দিয়েই শিশুটির পায়ের পেছনে শিরার উপর অস্ত্রোপচার করা হয় । কারণ, এই শিরাটি প্রচণ্ড টান হয়ে থাকে এই শিশুদের । সেটাকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসা হয় । পরিশেষে পা সোজা করতে বিশেষ ব্রেস বা জুতো দেওয়া হয় পরানোর জন্য । এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে বেশ কয়েকমাসের মধ্যেই শিশু পা ধীরে ধীরে সোজা হতে শুরু করে । আসানসোল জেলা হাসপাতাল এই রোগের চিকিৎসার সফলতা নজরকাড়া ।"
প্রাইভেটে চিকিৎসার খরচ কেমন ?
আসানসোল জেলা হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন নির্ঝর মাজির কথায়, "বাইরেই চিকিৎসা করাতে গেলে বিভিন্ন হাসপাতাল বিভিন্ন রকমের চার্জ নেয় । প্রাথমিকভাবে দেখলে প্রায় লক্ষাধিক টাকা খরচ আছে এই চিকিৎসায় । কারণ, প্রতিবার প্লাস্টার করতে ছ’হাজার টাকা খরচ হয় । দু’টি পায়ে পাঁচবার প্লাস্টার করলে সেখানেই 30 হাজার টাকা খরচ হয়ে যায় । অস্ত্রোপচারের কারণে 30-35 হাজার টাকা খরচ হয় । এছাড়া লাগে জুতো । জুতো জোড়ার দাম তিন হাজার টাকা । প্রতি দু'মাস অন্তর এই জুতো পালটাতে হয় । অর্থাৎ প্রায় লাখখানেক টাকা খরচ হয়ে যায় বাবা-মায়ের । আসানসোল জেলা হাসপাতালে এই চিকিৎসা একেবারেই বিনামূল্যে হয় । বর্তমানে একটি সেচ্ছাসেবী সংস্থা ক্লাব ফুটে আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ জুতো প্রদান করছে । ফলে সেটাও বিনামূল্যে শিশুরা পাচ্ছে ।"
দক্ষিণবঙ্গের ভরসা আসানসোল জেলা হাসপাতাল
এমনিতেই আসানসোল জেলা হাসপাতালে উপরের উপরে প্রচণ্ড রোগীদের চাপ । আসানসোল মহকুমা তো আছেই । এর সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম বর্ধমান পুরো জেলা পাশাপাশি দামোদর এবং অজয় নদ বরাবর বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং বীরভূমের প্রান্তিক এলাকা থেকে প্রচুর রোগী আসানসোল জেলা হাসপাতালে আসে । শুধু তাই নয়, পার্শ্ববর্তী রাজ্য ঝাড়খণ্ডেরও প্রচুর রোগী এই হাসপাতালের উপরে ভরসা রাখে । 'ক্লাবফুট' চিকিৎসায় মফঃস্বলের নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষজন আসানসোল জেলা হাসপাতালেকে যেন বন্ধুর মতো করে পেয়েছে ।

আসানসোল জেলা হাসপাতালের সুপার নিখিলচন্দ্র দাস বলেন, "ক্লাবফুটের চিকিৎসায় আসানসোল জেলা হাসপাতাল নজিরবিহীন সাফল্য পেয়েছে । এই সাফল্য মানুষজনের ভরসা বাড়িয়েছে হাসপাতালের উপরে । আগামিদিনে আমরা আরও ভালো করে এই রোগের চিকিৎসা করতে চাই ।"
অর্থোপেডিক সার্জন নির্ঝর মাজি বলেন, "ক্লাবফুট কোনও অভিশাপ নয় । জন্মের পর যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, ততই ভালো ফল পাওয়া যায় । পনসেটি পদ্ধতিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপারেশন ছাড়াই শিশুর পা স্বাভাবিক করা সম্ভব । আমাদের হাসপাতালে গত 10 বছরে বহু শিশুর সফল চিকিৎসা হয়েছে, এবং পরিষেবাটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে ।" চিকিৎসকদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে আরও বেশি শিশু সময়মতো চিকিৎসার আওতায় আসবে ।

