মদ্যপ তরুণীকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিলেন ক্যাবচালক, সেই রাতে কী হয়েছিল দেখুন
তরুণীকে নিয়ে সফর করার সময় ভয় কাটাতে তাঁর সঙ্গে গল্প করেন, তাঁর মাকে ফোনে আশ্বস্ত করেন, বাড়ির দরজা পর্যন্ত তাঁকে পৌঁছে দিয়ে আসেন ক্যাবচালক ৷

Published : January 3, 2026 at 8:07 PM IST
কলকাতা, 3 জানুয়ারি: আরজি কর, দক্ষিণ কলকাতা আইন কলেজ-সহ শহরে পরপর বেশ কয়েকটি নারী নির্যাতনের ঘটনা সবার মনে নতুন করে ফের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে - নারীদের জন্য আদৌ কি নিরাপদ কল্লোলিনী কলকাতা ? দিনের আলো পেরিয়ে রাত নামলেই শহরের রাস্তায় মাথাচাড়া দেয় আতঙ্ক ৷ তিলোত্তমায় চলাফেরা করতে গিয়ে নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে সংশয়ে থাকেন বহু নারী ৷ এই উদ্বেগের আবহেই এক টুকরো ঠান্ডা বাতাস বয়ে আনলেন শহরেরই এক ক্যাবচালক ৷ তাঁর মানবিক আচরণ আলোড়ন ফেলে দিয়েছে সমাজমাধ্যমে ৷
ঠিক কী করেছেন ওই ক্যাবচালক ? সাংঘাতিক কিছু নয় ৷ তাঁর যেটা কাজ, সেটাই করেছেন ৷ তবে সেই কাজটুকুই তিনি করেছেন অত্যন্ত দায়িত্ব ও কর্তব্যের সঙ্গে ৷ যা তাঁকে খবরের শিরোনামে এনে দিয়েছে ৷ বর্ষবরণের উৎসবের আবহে ভরপেট মদ্যপান করে গভীর রাতে তাঁর ক্যাবে উঠেছিলেন এক তরুণী ৷ তাঁকে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন ওই ক্যাবচালক ৷ শুধু তাই নয়, ওই তরুণীকে নিয়ে সফর করার সময় ভয় কাটাতে তাঁর সঙ্গে গল্পগুজব করেন, তাঁর মাকে ফোনে আশ্বস্ত করেন এবং তারপর বাড়ির দরজা পর্যন্ত সেই কন্যাকে পৌঁছে দিয়ে আসেন ক্যাবচালক ৷
সেই ঘটনার ভিডিয়ো বর্তমানে সমাজমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে । ভিডিয়োতে দেখা যায়, তরুণীটি ক্যাবে ওঠার সময়ই চালককে জানান যে তিনি মত্ত অবস্থায় রয়েছেন এবং নিরাপদে বাড়ি পৌঁছতে চান । সেই অনুরোধকে গুরুত্ব দিয়ে পুরো যাত্রাপথে তাঁর সঙ্গে স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মধ্যে দিয়ে তাঁকে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছে দেন ক্যাবচালক ৷ তিনি তরুণীর ওই পরিস্থিতির কোনও সুযোগ নিতে চাননি, বরং একজন যাত্রী ও নাগরিকের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য ।
সেই রাতের গোটা ঘটনার বিবরণ সরাসরি তাঁর মুখে শুনতে সেই ক্যাবচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইটিভি ভারত ৷ প্রথমেই তাঁর পরিচয়টা জানাই ৷ পূর্ব বর্ধমানের এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মুন্না আজিজ মল্লিক । 2012 সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে পড়াশোনার জন্য তিনি কলকাতায় আসেন । স্নাতক স্তরে পড়াশোনা শুরু করলেও নিজের খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়েছে । তাই পড়াশোনার পাশাপাশি নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করেন মুন্না । একইসঙ্গে চলতে থাকে সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি ।

2014 সালে তিনি টেট পাশ করেন । কিন্তু তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী ডিএলএড প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক ছিল ৷ 2022 সালে ডিএলএড-ও সম্পূর্ণ করেন মুন্না । অথচ আইনি জটিলতার কারণে আজও থমকে রয়েছে তাঁর শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন । মুন্না বলেন, "যোগ্যতা ও পদ থাকা সত্ত্বেও আমরা কাজ করতে পারছি না । নানা আইনি জটিলতা চলছে । কিন্তু পেট তো সবারই আছে, বাঁচতে হবে । তাই এখন ক্যাব চালাই ৷"
নিজের জমানো অর্থ এবং কিছু মানুষের সহায়তায় একটি গাড়ি কিনেছেন মুন্না । সেই গাড়িই আজ তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন । যাত্রীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি তিনি নিজের নিরাপত্তার কথাও ভেবেছেন তিনি । তাই গাড়ির সামনে ও পিছনে ড্যাশক্যাম লাগানো রয়েছে । প্রতিটি যাত্রাপথ রেকর্ড হয় ক্যামেরায় । মুন্নার কথায়, "ক্যাব চালালে অনেক সময় আগেই দোষী ধরে নেওয়া হয় । তাই কোনও অভিযোগ উঠলে এই ক্যামেরাই আমার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ।"
এই ক্যামেরাতেই ধরা পড়েছে মানবিক মুন্নার সেই রাতের কাহিনি ৷ তবে এই ঘটনা মুন্নার কাছে নতুন কিছু নয় । তাঁর গাড়িতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যিনিই ওঠেন, সবার সঙ্গেই তিনি একটি স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন । এর নেপথ্যে রয়েছে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি । মুন্না জানান, বহু মহিলা যাত্রী গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবারের কাছে যাত্রাপথের বিবরণ পাঠিয়ে দেন বা কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলতে থাকেন । একজন পুরুষ হিসেবে এই দৃশ্য তাঁকে বারবার ভাবায় । তাঁর কথায়, "45 মিনিটের যাত্রাতেও যদি একজন মহিলা নিজেকে নিরাপদ মনে না-করেন, তাহলে আমাদের সমাজের অবস্থান কোথায় ?"
আক্ষেপের সুরে মুন্না বলেন, সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় সমাজে পুরুষদের উপর থেকে বিশ্বাসটাই হারিয়ে গিয়েছে ৷ এটাই তাঁর কাছে যন্ত্রণার ৷ সেই বিশ্বাসটুকু ফেরাতেই তিনি সর্বদা সচেষ্ট থাকেন বলে জানালেন ৷ মুন্নার মতে, বর্তমান সময়ে নারীদের নিরাপত্তা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব । তাঁর কথায়, "এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে যদি আমি অন্তত কয়েকজন মহিলাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারি, তাহলেই নিজের মনে শান্তি পাই ।" রাতের কলকাতায় এমন নীরব দায়িত্ববোধই হয়তো ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনবে হারিয়ে যাওয়া ভরসাকে ।

