ভোটার কার্ড-তালিকায় পদবিতে ভুল, কুমারগঞ্জে 'SIR আতঙ্কে' নিজেকে শেষ করলেন বৃদ্ধ
তৃণমূল ও পরিবারের দাবি, মৃত বৃদ্ধ এসআইআর আতঙ্কে কয়েকদিন ধরেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাড়ি বাড়ি ঘুরছিলেন । সব সময় ওই নিয়েই চিন্তা করতেন ।

Published : November 11, 2025 at 5:11 PM IST
কুমারগঞ্জ, 11 নভেম্বর: এবার এসআইআর আতঙ্কে জীবন শেষ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠল দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় । মৃতের নাম ওছমান মণ্ডল (65) । তিনি দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জ থানার আগাছা এলাকার বাসিন্দা ৷
মৃতের পরিবার এবং তৃণমূলের দাবি, এসআইআর চালু হওয়ার পর থেকেই আতঙ্কে ছিলেন তিনি ৷ তার জেরেই চরম পদক্ষেপ করেন বৃদ্ধ ৷ পালটা বিজেপির দাবি, তৃণমূল এসআইআরকে হাতিয়ার করে মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করছে ৷
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওছমানের ভোটার কার্ডে পদবি ছিল মণ্ডল ৷ তবে ভোটার তালিকায় ওছমান মোল্লা রয়েছে ৷ যা নিয়ে তিনি মানসিকভাবে অস্থিরতা ও আতঙ্কে ছিলেন । এই সমস্যার সমাধান করতে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন । সকলে আশ্বাস দিলেও তিনি নিজে আশ্বস্ত হতে পারেননি ৷ যার কারণে তিনি সোমবার গভীর রাতে চরম পদক্ষেপ করেন বলে পরিবারের দাবি ৷
মৃতের আত্মীয় গোলাম মণ্ডল বলেন, "এসআইআর আতঙ্কেই তিনি মারা গিয়েছেন । তাঁর ভোটার কার্ডে মণ্ডল থাকলেও ভোটার তালিকায় মোল্লা রয়েছে । এই আতঙ্কেই গতকাল গভীর রাতে তিনি জীবন শেষ করে দেন ।"
আরেক আত্মীয় মহাসনা বিবির কথায়, "ওছমান মণ্ডল আমার মামাতো ভাই হয় । ওর ভোটার তালিকায় মোল্লা পদবি ছিল ৷ এদিকে আধার কার্ড ও ভোটার কার্ডে মণ্ডল রয়েছে । এই কারণে পাঁচ বছর ধরে সে আতঙ্কেই ছিল । কেউ বোঝালেও সে বুঝতো না, সব সময় সেটা নিয়েই চিন্তা করত । গতকাল রাতে উঠে সে গিয়ে চরম পদক্ষেপ করে । আমরা রাত একটার দিকে জানতে পারি ।"
এদিকে, বিষয়টি জানতে পেরেই ঘটনাস্থলে আসেন স্থানীয় তৃণমূল নেতারা ৷ তাঁরা পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন । স্থানীয় তৃণমূল অঞ্চল সভাপতি আনিসুর রহমান বলেন, "আমি সকালবেলা সংবাদ পাই ডাঙ্গারহাট আগাছাতে একজন বয়স্ক মানুষ মারা গিয়েছেন । এসআইআর আতঙ্কেই উনি জীবন শেষ করে দিয়েছেন । মোল্লা ও মণ্ডল পদবি নিয়ে তার মধ্যে একটা আতঙ্ক ছিল । কাগজ নিয়ে তিনি খুব দৌড়াদৌড়ি করতেন । কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর ধারণা হয়তো হয়েছে আমার কাগজ আর হবে না । তার জন্যই আজকের এই ঘটনা ।"
তিনি আরও বলেন, "2002 সালের ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম রয়েছে এরকম অনেকেই এসআইআর ফর্ম ফিলাপ করতে গিয়ে সঠিকভাবে বিষয়টি বুঝতে পারছেন না । সম্পর্কের জায়গায় কী লিখবেন বা বিয়ের আগের পদবি ও পরের পদবি পরিবর্তন হয়, সেখানে কী লিখবেন ? কিংবা পার্ট নাম্বার কী লিখবেন ? কারণ একটা ভুল হয়ে গেলেই তার দায় বর্তাবে তাঁদের উপরেই । সেই কারণেই সাধারণ মানুষ প্রত্যেকেই ভয়ে রয়েছে । তারা ফর্ম নিচ্ছে কিন্তু এখনও ফিলাপ করেনি । আমরা সাধারণ মানুষকে ক্যাম্প করে বোঝানোর চেষ্টা করছি ।"
তাঁর কথায়, "আমরাও চাই এসআইআর হোক ৷ মৃত মানুষের নাম বাদ যাক । যারা এখানে বসবাস করছে সেটা হিন্দু হোক বা মুসলমান প্রত্যেকেই নাগরিক । কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে কেন্দ্র সরকার । এর ফলেই আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে । আজকে একজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো এর দায় সুকান্ত মজুমদার ও শুভেন্দু অধিকারীকে নিতে হবে ।"
তৃণমূলের প্রাক্তন জেলা চেয়ারম্যান নিখিল সিংহ রায় বলেন, "এসআইআর নিয়ে পশ্চিমবাংলায় একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে । মৃত ব্যক্তি এসআইআর আতঙ্কে কয়েকদিন ধরেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাড়ি বাড়ি ঘুরছিলেন । আশ্বাস দেওয়ার পরেও উনি নিজের প্রতি ভরসা রাখতে পারেননি । গতকাল উনি এই আতঙ্কেই জীবন শেষ করেছেন । এসআইআর করার জন্য বছর খানেক সময় প্রয়োজন । সেখানে কেন্দ্রীয় সরকার চাপ সৃষ্টি করে তড়িঘড়ি এসআইআর করায় মানুষের মধ্যে একটা ভীতির সঞ্চার হচ্ছে ।"
যদিও তৃণমূলের অভিযোগ অস্বীকার করেন বিজেপির জেলা সাধারণ সম্পাদক বাপি সরকার ৷ তিনি বলেন, "যে কোনও মৃত্যু খুবই দুঃখজনক ৷ যিনি মারা গিয়েছেন তাঁর প্রতি আমাদের সমবেদনা রয়েছে । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে প্রতিদিনই নানান কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে । কিন্তু যেখানেই মৃত্যু ঘটছে সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস এসআইআর বলে চালানোর চেষ্টা করছে, বদনাম করার চেষ্টা করছে । যে মারা গিয়েছে তার নিজেরও নাম আছে পরিবারের সকলের নাম আছে ভোটার তালিকায় । আজ তৃণমূল কংগ্রেস ভারতের সর্বত্র মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করছে ৷ এটা নিয়ে খুব বেশি লাভ হবে না । তবে কী কারণে মৃত্যু তা খতিয়ে দেখা দরকার ৷"
বৃদ্ধর দেহটি ময়নাতদন্তে পাঠানোর পাশাপাশি পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখছে কুমারগঞ্জ থানার পুলিশ । এদিকে এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যুর খবর জানাজানি হতেই জেলার রাজনীতিতে জোর তরজা শুরু হয়েছে ।

