ETV Bharat / state

বোবা গাছের আর্তনাদ শুনছেন শিক্ষকরা, রুক্ষ শিল্পাঞ্চলে সবুজ বিপ্লবকে কুর্নিশ জনতার

ঝড়ের দাপটে গাছ উপড়ে পড়লে, তাদের বাঁচাতে ছুটে যাচ্ছে একদল মানুষ ৷ ফের প্রাণ সঞ্চার করছে ৷ রিপোর্ট ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি তারক চট্টোপাধ্যায়ের ৷

Tree Saving Initiative
আসানসোলে মৃতপ্রায় গাছ বাঁচানোর কাজে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : August 29, 2026 at 6:27 PM IST

|

Updated : August 29, 2026 at 6:44 PM IST

7 Min Read
Choose ETV Bharat

আসানসোল, 29 অগস্ট: ঝড়-বৃষ্টিতে মাটি থেকে উপড়ে পড়েছে বিশাল বট গাছ ৷ কিন্তু তখনও প্রাণ আছে ৷ মাটির সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্ক ছিন্ন হলেও স্পন্দন আছে ৷ সেই ক্ষীণ প্রাণের আর্তনাদ শুনতে পেয়েছিলেন কয়েকজন শিক্ষক ৷ খবর পেয়ে তড়িঘড়ি গাছ বাঁচাতে ঘটনাস্থলে ছুটে যান তাঁরা ৷

কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত 'ছন্নছাড়া' কবিতায় যেমন লিখে গিয়েছেন- "প্রাণ আছে, প্রাণ আছে, -শুধু প্রাণই আশ্চর্য সম্পদ" ৷ ছাল-বাকলহীন মৃতপ্রায় গাছকে জীবন দিতে শুরু হয় যজ্ঞকাণ্ড ৷ উপড়ে পড়া গাছটিকে ফের প্রাণ দেওয়ার কাজ চলে বেশ কিছুদিন ধরে ৷ সার দিয়ে জল ঢেলে শিকড়ের সঙ্গে মাটির নতুন সম্পর্ক তৈরি করে দেন তাঁরা ৷ গাছ তো কথা বলতে পারে না ৷ কিন্তু তিন সপ্তাহ পর বৃষ্টির জলে গাছের ডাল সুবজ পাতা কিশলয়ে ভরে গিয়েছে ৷ হ্যাঁ, 'এক ক্ষয়হীন আশা'কে সঙ্গী করে স্বেচ্ছাসেবীর দল গাছটিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে পেরেছে ৷

উপড়ে যাওয়া গাছের শুশ্রুষা করে বাঁচিয়ে তোলার দায়িত্ব নিয়েছেন এই কয়েকজন (ইটিভি ভারত)

পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোলে রুক্ষ শিল্পাঞ্চলের বুকে সবুজ ফিরিয়ে আনছে এমনই এক সবুজ বাহিনী ৷ পেশায় শিক্ষকদের এই দলটি শহর জুড়ে গাছ লাগিয়ে বেড়ান ৷ শুধু গাছ লাগানো নয়, তারপর থাকে পরিচর্যার পালা ৷ সেসব করার দায় স্বেচ্ছায় নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন এই শিক্ষকরা ৷ তাই শহরে জখম হওয়া গাছেদের বাঁচাতে ডাক পড়ে এই 'ছন্নছাড়া' দলের, যাঁরা নীরব প্রাণের স্পন্দন শুনতে পান ৷

শুরু হয়েছিল করোনা কালেই

অতিমারির সময় আসানসোলের স্কুল বন্ধ থাকায় কয়েকজন শিক্ষক বাড়িতে রান্না করে ফুটপাতবাসী, ভবঘুরেদের জন্য রোজ খাবার পৌঁছে দিতেন । পরে শিল্প শহরের সবুজয়ানের কথা মাথায় আসে তাঁদের ৷ আসানসোল জুড়ে গাছ লাগানোর কাজ শুরু করেন শিক্ষকের দল ৷ তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন অন্যান্য পেশার মানুষরাও ৷ সংগঠনের নাম দেওয়া হয় 'গ্রিন হেভেন' ৷ শুধু গাছ লাগানো নয়, সংগঠনের স্লোগান 'গাছ বাঁচানো' ৷

Saving Uprooted Trees in Asansol
উপড়ে পড়া গাছটিকে মাটিতে পুনঃস্থাপন করা হয়েছে (ইটিভি ভারত)

'গ্রিন হেভেন'-এর লাগানো 90 শতাংশ গাছই আসানসোলে বেঁচে আছে এবং বেড়ে উঠছে ৷ শুধু তাই নয়, ইটিভি ভারতের খবরে অনুপ্রাণিত হয়ে আসানসোল শহরের সর্বত্র হারিয়ে যাওয়া প্রচুর 'আসান' গাছ লাগিয়ে ছিল এই সংগঠন ৷ গাছ লাগানোর পাশাপাশি পুকুর সংস্কারেও হাত লাগিয়েছে 'গ্রিন হেভেন' । কচুরিপানায় ভর্তি হয়ে যাওয়া, নোংরায় বুজে আসা পুকুর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে সেই জল স্বাস্থ্যকর করে তোলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এই সংগঠন ৷ নিজেদের পকেট থেকে অর্থ খরচ করে শহরের পরিবেশ উন্নত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এই গ্রিন হেভেন ৷

ঝড়ে পড়ে যাওয়া মৃতপ্রায় গাছেদের বাঁচানো

সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল শহরকে সবুজ করে তোলা ৷ গত এপ্রিল মাসের শেষের দিকে এই সংগঠনের সদস্যরা খবর পায় আসানসোল জেলা হাসপাতালের ভিতর একটি 20-25 বছরের পুরনো বটগাছ ঝড়ে উপড়ে গিয়েছে ৷ একেবারে বাঁধানো বেদি-সহ গাছটি উপড়ে পড়ে রয়েছে ৷ এই গাছটির ছায়ায় স্থানীয় ও পথচলতি অনেকে বিশ্রাম নিতেন ৷ মাধুকরীরা এসে বসে থাকতেন ৷ এই খবর পেয়ে 'গ্রিন হেভেন' সংস্থার সদস্যরা মৃতপ্রায় গাছটিকে কীভাবে পুনঃস্থাপিত করা যায়, তা ভাবতে থাকেন ৷ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও তথ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন গাছটিকে বাঁচাতে ৷

Saving Uprooted Trees in Asansol
উপড়ে পড়া গাছটিকে মাটিতে পুনঃস্থাপন করার পর তাতে জল দেওয়ার কাজ চলছে (ইটিভি ভারত)

অসাধ্যসাধন

ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার এক সদস্য সরকারি স্কুলের শিক্ষক পিনাকীরঞ্জন চক্রবর্তী ইটিভি ভারতের প্রতিনিধিকে বলেন, "আমরা এই কাজে নতুন ৷ বিশেষজ্ঞরা জানান, গাছটিকে বাঁচিয়ে তুলতে প্রথমে তার ডালপালাগুলি কেটে ফেলতে হবে ৷ বড় শিকড়টি উপড়ে পড়ে যাওয়ায়, গাছটি তার ডাল পাতার খাবার সংগ্রহ করতে পারবে না ৷ তখন গাছটি শুকিয়ে যাবে ৷ আমরা নিজেরাই গাছটির বড় বড় ডালগুলিকে কেটে ফেলি ৷ তারপর জেসিবি মেশিন নিয়ে এসে বড় গর্ত তৈরি করে গাছটিকে পুনঃস্থাপিত করি ৷"

তিনি আরও বলেন, "গাছটিকে ফের মাটিতে স্থাপনের আগে সেখানে প্রচুর জৈব সার দেওয়া হয় ৷ প্রচুর জলের প্রয়োজন পড়ে এবং তখন আসানসোল পুরনিগম থেকে জলের গাড়ি ভাড়া করে আমরা নিয়মিত গাছের গোড়ায় জল দিতে থাকি ৷ তিন সপ্তাহ পর গাছটিতে নতুন পাতা বের হয় ৷ আমরা গত মে মাসে রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিনে গাছটিকে স্থাপন করেছিলাম ৷ জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে নতুন পাতা গজাতে শুরু করে ৷ এই আনন্দ বলে বোঝানো যাবে না ৷"

Saving Uprooted Trees in Asansol
উপড়ে পড়া গাছ কীভাবে বাঁচানো যায় (ইটিভি ভারত)

একটি গাছ বেঁচে উঠতেই বাড়ে আত্মবিশ্বাস

ঝড়ে উপড়ে যাওয়া একটি গাছকে বাঁচিয়ে তোলার পরই সংগঠনের আত্মবিশ্বাস অনেকটা বেড়ে যায় । এরপর আরও কয়েকটি উপড়ে পড়া গাছকে একই ভাবে বাঁচিয়ে তোলেন সদস্যরা । আসানসোলের মহিশিলাতে বটতলা বাজার এলাকাতেও ঝড়ে পড়ে যাওয়া এরকমই একটি পুরোনো গাছকে বাঁচিয়ে তুলেছেন তাঁরা ৷ বারাবনির পাঁচগাছিয়া এলাকায় আরেক একটি গাছকে বাঁচিয়ে তোলার কাজ শুরু করেছেন ৷ প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে সদস্যরা গাছের ডাল কাটা থেকে শুরু করে গাছটিকে মেশিন দিয়ে দাঁড় করানো এবং নিয়মিত পরিচর্যা ও জল দেওয়া, সার দেওয়ার মাধ্যমে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে গাছগুলিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছেন ৷

খুশি এলাকার মানুষজন

ঝড়ে গাছ উপড়ে পড়া দেখে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল এলাকাবাসীর ৷ এভাবে যে গাছ বাঁচানো যায়, তা ভাবনার অতীত ছিল ৷ কিন্তু এই অসাধ্য সাধনে খুশি স্থানীয়রা ৷ তাঁরাও গাছ বাঁচানোয় হাত লাগিয়েছেন ৷ কেউ কেউ বাড়ি থেকে জল এনে গাছে দিচ্ছেন ৷ কেউ আর্থিক সহায়তা করছেন ৷

আসানসোল জেলা হাসপাতালের সীমানা প্রাচীর লাগোয়া একটি মন্দিরের সেবাইত মিলন চৌধুরী ৷ এই মন্দিরের পাশেই ছিল বটগাছটি ৷ তিনি ঝড়ে উপড়ে যাওয়া থেকে গাছটির বেঁচে ওঠার প্রতি মুহূর্তের সাক্ষী ৷

ইটিভি ভারতকে সেবাইত মিলন চৌধুরী বলেন, "এই গাছটি আমাদের বড় প্রিয় ৷ গাছের বাঁধানো বেদিতে কত মানুষ বসতেন ৷ বিশ্রাম নিতেন ৷ এপ্রিল মাসে প্রবল ঝড়ে বটগাছটি পড়ে যায় ৷ তারপর পাড়ার এই ছেলেরা যুদ্ধ শুরু করে ৷ আমরা ভেবেছিলাম, আর কি বাঁচবে ? কিন্তু এখন গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে ৷"

Saving Uprooted Trees in Asansol
মৃতপ্রায় গাছের ডালে ডালে সবুজ পাতা (ইটিভি ভারত)
সোশাল মিডিয়ায় প্রচারে ডাক পড়ছে দিকে দিকে

গ্রিন হেভেন সংস্থার এই কর্মকাণ্ড সোশাল মিডিয়ার দৌলতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে ৷ এখন এই সংস্থার সঙ্গে অনেকে যোগাযোগ করছেন ৷ যেখানে গাছ উপড়ে পড়ছে, সেখানকার মানুষ তাদের গাছ বাঁচিয়ে তুলতে ডাক দিচ্ছেন ৷ এই ধরনের একটি গাছকে বাঁচিয়ে তুলতে 3 হাজার 500 থেকে 4 হাজার টাকা খরচ হয় ৷ নিজেদের পরিশ্রম ছাড়াও বড় জেসিবি মেশিন ভাড়া করে নিয়ে আসতে হয় ৷ এর সঙ্গে নিয়মিত সার, পুরনিগমের জলের গাড়ি ভাড়া করতে হয় ৷ নিজেদের পকেট থেকে বারবার খরচ করে কত গাছ বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব !

সংস্থার আরেক সদস্য তথা শিক্ষক কুণালকান্তি মণ্ডল ইটিভি ভারতকে বলেন, "আমরা এরকম প্রত্যেকটি গাছকেই বাঁচিয়ে তুলতে পেরেছি ৷ কিন্তু এই কাজে প্রচুর টাকা খরচ হয়, তা আমরা নিজেদের পকেট থেকে দিচ্ছি ৷ এভাবে কতদিন খরচ করতে পারব ? মানুষ যদি সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন, তাহলে আমরা আরও অনেক গাছ বাঁচাতে পারব ৷"

জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বার্তা

এখন পরিবেশ সচেতনতার ফলে অনেকে গাছ লাগাচ্ছেন ৷ কিন্তু তারপর আর চারাগুলির পরিচর্যা হয় না । সংস্থার এক সদস্য সুদীপ্ত রায় ইটিভি ভারতকে বলেন, "আমরা দেখি গাছ লাগানোর সময় বহু মানুষ ছবি তুলতে আসেন ৷ 10-12 জন মিলে একটি গাছ লাগাই ৷ তারপর গাছটির দিকে আর কারও নজর পড়ে না ৷ গাছটি শুকিয়ে মারা যায় ৷ গাছটি বেড়ে ওঠার আগে অন্তত ছ'মাস পর্যন্ত নিয়মিত জল, সার, দেওয়া প্রয়োজন ৷ যাঁরা চারাগাছ রোপণ করছেন, তাঁরা দয়া করে গাছের পরিচর্যা করুন ৷ গাছ বাঁচিয়ে রাখুন ৷"

এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সৌজন্যে 'ছন্নছাড়া' কবিতার 'প্রাণই আশ্চর্য সম্পদ, এক ক্ষয়হীন আশা, এক মৃত্যুহীন মর্যাদা'- পঙক্তি এখন শহরবাসীর মুখে মুখে ৷ এই রুক্ষ শিল্পাঞ্চলেও 'প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে' ৷

Last Updated : August 29, 2026 at 6:44 PM IST