মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা, কমছিল দৃষ্টি! পিটুইটারি টিউমারের জরুরি অস্ত্রোপচারে সুস্থ 70-এর রবীন্দ্রনাথ
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, পিটুইটারির টিউমারের রক্তক্ষরণের যে এই পরিস্থিতি তৈরি হয় ৷ একে বলে ‘পিটুইটারি অ্যাপোপ্লেক্সি’ ৷ সৌমিতা ভট্টাচার্যর প্রতিবেদন ৷

Published : August 28, 2026 at 10:28 PM IST
কলকাতা, 28 অগস্ট: হঠাৎ শুরু হয়েছিল তীব্র মাথাব্যথা । তার কিছুক্ষণের মধ্যেই ডান চোখের পাতা ঝুলে পড়ে । চোখ খুলতেই পারছিলেন না । পরে চোখ খুললেও ঝাপসা দেখছিলেন । দ্রুত কমতে শুরু করে দৃষ্টিশক্তি । এমন পরিস্থিতিতে ভয় পেয়ে যান কলকাতার 70 বছর বয়সি বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ দাস । তাঁকে দ্রুত সল্টলেকের একটি বেসরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয় । প্রাথমিকভাবে চোখের সমস্যা মনে হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সামনে আসে আরও গুরুতর কারণ । দেখা যায়, তাঁর পিটুইটারি গ্ল্যান্ডে একটি বড় টিউমার রয়েছে এবং সেই টিউমারের ভিতরেই হয়েছে রক্তক্ষরণ ।
চিকিৎসকদের মতে, এই অবস্থাকে বলা হয় ‘পিটুইটারি অ্যাপোপ্লেক্সি’ । পিটুইটারি গ্ল্যান্ড মস্তিষ্কের নীচের দিকে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি, যা শরীরের বিভিন্ন হরমোন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় । কোনও পিটুইটারি টিউমারের ভিতরে আচমকা রক্তক্ষরণ হলে টিউমারটি খুব দ্রুত ফুলে উঠতে পারে । এর ফলে আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু এবং দৃষ্টিশক্তির সঙ্গে যুক্ত অংশের উপর চাপ পড়ে । সেই কারণেই হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পাতা ঝুলে পড়া, চোখ খুলতে না পারা এবং দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে ।
রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে । তীব্র মাথাব্যথার পাশাপাশি তাঁর ডান চোখের সমস্যা এবং দৃষ্টিশক্তির দ্রুত অবনতি হচ্ছিল । সঙ্গে হৃদ্যন্ত্র সংক্রান্ত কিছু উপসর্গও ছিল । পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দ্রুত এমআরআই করা হয় । রিপোর্টে পিটুইটারি টিউমারের ভিতরে রক্তক্ষরণের বিষয়টি ধরা পড়ে । এরপর আর দেরি না করে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা । 20 অগস্ট ওই হাসপাতালেই তাঁর অস্ত্রোপচার হয় ।
নিউরোসার্জন ড. অরিজিৎ চক্রবর্তী এবং কনসালট্যান্ট অটোরাইনোল্যারিঙ্গোলজিস্ট ড. দেবায়ন তরফদারের নেতৃত্বে যৌথভাবে অস্ত্রোপচারটি করা হয় । চিকিৎসকরা ‘ফোর-হ্যান্ড টেকনিক’ ব্যবহার করেন । অর্থাৎ, নিউরোসার্জারি এবং এন্ডোস্কোপিক টিমের দুই বিশেষজ্ঞ একই সময়ে সমন্বয় রেখে অস্ত্রোপচারে অংশ নেন ।
এ ক্ষেত্রে বড় কোনও কাটা দাগের প্রয়োজন হয়নি । নাকের ভিতর দিয়ে এন্ডোস্কোপ ঢুকিয়ে স্ফেনয়েড সাইনাসের পথ ব্যবহার করে টিউমারের কাছে পৌঁছন চিকিৎসকরা । এরপর মিনিমালি ইনভেসিভ এন্ডোস্কোপিক এন্ডোনেজাল পদ্ধতিতে টিউমারটি অপসারণ করা হয় । চিকিৎসকদের দাবি, কোনও বড় জটিলতা ছাড়াই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে ।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হল, অস্ত্রোপচারের পর খুব দ্রুত রবীন্দ্রনাথের অবস্থার উন্নতি শুরু হয় । মাত্র দু’দিনের মধ্যেই তাঁর দৃষ্টিশক্তিতে উন্নতি লক্ষ্য করেন চিকিৎসকরা । অস্ত্রোপচারের আগে যে তীব্র মাথাব্যথা তাঁকে কষ্ট দিচ্ছিল, সেটিও অনেকটাই কমে যায় । বর্তমানে তিনি ভালো আছেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর দৃষ্টিশক্তিও ফিরে আসছে ।
ড. অরিজিৎ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘এই ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর রোগীর সাড়া পাওয়াটাই সবচেয়ে আশার বিষয় । তাঁর তীব্র মাথাব্যথা অনেকটাই কমে গিয়েছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁর দৃষ্টিশক্তি প্রায় 70 শতাংশ উন্নত হয়েছে । আমরা আশাবাদী, আগামী কয়েক সপ্তাহে তাঁর শারীরিক কার্যক্ষমতা আরও উন্নত হবে । তবে হঠাৎ তৈরি হওয়া চাপের কারণে আক্রান্ত স্নায়ুগুলির সম্পূর্ণ সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে । তাই নিয়মিত ফলো-আপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।’’
অস্ত্রোপচারে দুই ধরনের বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. দেবায়ন তরফদার বলেন, ‘‘জটিল স্কাল-বেস সার্জারির ক্ষেত্রে নিউরোসার্জিক্যাল এবং এন্ডোস্কোপিক টিমের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ফোর-হ্যান্ড টেকনিকের মাধ্যমে দুই বিশেষজ্ঞ একসঙ্গে কাজ করতে পারেন এবং অস্ত্রোপচারের সময় নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারেন । এই ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর রোগীর উন্নতি, বিশেষ করে দ্রুত দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসা, অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ।’’
অন্যদিকে, নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ দাস বলেন, ‘‘হঠাৎ মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা এবং ডান চোখের সমস্যা হওয়ায় আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম । ঠিকমতো চোখ খুলতে পারছিলাম না এবং চোখ খুললেও সবকিছু ঝাপসা দেখছিলাম । আমার দৃষ্টিশক্তির কী হবে, তা নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলাম । অস্ত্রোপচারের আগে স্বাভাবিক ভাবেই উদ্বিগ্ন ছিলাম । তবে চিকিৎসকরা খুব শান্ত ভাবে আমাকে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছিলেন এবং আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিলেন । অস্ত্রোপচারের পর মাথাব্যথা অনেকটাই কমে যায় এবং দৃষ্টিশক্তিরও স্পষ্ট উন্নতি লক্ষ্য করি ।’’

