ভবানীপুরে 44 হাজার ভোটারের নামের পাশে ‘জিজ্ঞাসা চিহ্ন’ কি চিন্তা বাড়াল শাসকের ?
2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনে কি নিজের খাসতালুকেই বড়সড় পরীক্ষার মুখে পড়তে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?

Published : December 12, 2025 at 9:06 PM IST
কলকাতা, 12 ডিসেম্বর: 2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনে কি নিজের খাসতালুকেই বড়সড় পরীক্ষার মুখে পড়তে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ? রাজনৈতিক মহলে এই প্রশ্নটি নতুন করে উস্কে দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের সদ্য প্রকাশিত ভোটার তালিকায় ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার থেকে প্রাপ্ত সাম্প্রতিক তথ্য। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, নন্দীগ্রামের পর এবার ভবানীপুরেও মমতাকে ‘প্রাক্তন’ করবেন তিনি । এতদিন একে নিছক রাজনৈতিক আস্ফালন ভাবা হলেও, SIR রিপোর্টের পরিসংখ্যান ও গত বছর লোকসভা নির্বাচনের ওয়ার্ড-ভিত্তিক ফলাফল সেই হুঙ্কারকে এক ভিন্ন মাত্রা দিতে পারে মনে করছেন অনেকেই ।
44 হাজার ‘অমীমাংসিত’ ভোটার: পরিসংখ্যানের গেরো
সম্প্রতি SIR স্ট্যাটাস রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, কলকাতা দক্ষিণ জেলার অন্তর্গত 159-ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ভোটারের সংখ্যা 2 লক্ষ 06 হাজার 295। এর মধ্যে ডিজিটাইজড বা ভেরিফায়েড হয়েছে 1 লক্ষ 61 হাজার 509 জনের তথ্য। অর্থাৎ, খাতা-কলমে প্রায় 44 হাজার 786 জন ভোটারের নামের পাশে একটি বড়সড় ‘জিজ্ঞাসা চিহ্ন’ বা পেন্ডিং স্ট্যাটাস ঝুলে রয়েছে । শতাংশের বিচারে যা মোট ভোটারের প্রায় 21.71 শতাংশ।
প্রশাসনিক পরিভাষায় একে এখনই ‘নাম বাদ’ বলা না-হলেও, এই বিপুল সংখ্যক ভোটার 'অমীমাংসিত' থেকে যাওয়াটা শাসক দলের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের । কারণ, এই 44 হাজার সংখ্যাটি ভবানীপুরের নির্বাচনী পাটিগণিতে ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে।
‘বিহার মডেল’ কি বাংলায় ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ এই পরিস্থিতির সঙ্গে বিহার বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক-পর্বের তুলনা টানছেন। বিহারে দেখা গিয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের স্ক্রুটিনি বা SIR প্রক্রিয়ার পর যেখানেই বড় সংখ্যক নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছিল বা ‘ফ্ল্যাগড’ হয়েছিল, নির্বাচনে সেখানেই বড় সুবিধা পেয়েছিল বিজেপি। ভবানীপুরেও কি তবে সেই ‘বিহার মডেল’-এর ছায়া দেখা যাচ্ছে ? যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে বিভিন্ন মিটিং মিছিলে বলছেন, "বিহার মডেল বাংলায় কাজ করবে না। কারণ বিজেপি'র চালাকি তাঁরা ধরে ফেলেছেন ।" কিন্তু এই নিরুত্তাপভাব কি বাস্তবে শেষ পর্যন্ত কাজ করবে ?
অতীতে ভবানীপুরের ফলাফল ও ৪৪ হাজারের ‘সুইং ফ্যাক্টর’
তৃণমূল কংগ্রেসের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলার জন্য 44 হাজার 786 সংখ্যাটিই যথেষ্ট, যদি 2021 সালের নির্বাচনী ফলাফলের দিকে তাকানো যায় । কারণ 2021 বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ভবানীপুরে জিতেছিলেন 28 হাজার 719 ভোটে। পরবর্তীতে উপ-নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতেছিলেন 58 হাজার 835 ভোটে।
SIR প্রক্রিয়ায় যে 44 হাজার ভোটারের ভাগ্য এখন ঝুলে আছে, সেই সংখ্যাটি শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের জয়ের ব্যবধানের (28,719) চেয়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি। এমনকী উপ-নির্বাচনে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর জয়ের ব্যবধানের (58,853) প্রায় 75 শতাংশের সমান এই পেন্ডিং তালিকা। অর্থাৎ, যদি এই 44 হাজার ভোটারের একটি বড় অংশ চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ে এবং তাঁরা যদি শাসক দলের সমর্থক হন, তবে ভবানীপুরের মাটি আর ততটা শক্ত থাকবে না। আরও একটা চিন্তার কারণ অবশ্যই আছে ৷
লোকসভা ভোটের ফলে 5টি ওয়ার্ডে পিছিয়ে পড়া: ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’
ওই নির্বাচনে ভবানীপুর বিধানসভার অন্তর্গত 8টি ওয়ার্ডের মধ্যে 5টিতেই (ওয়ার্ড 63, 70, 71, 72, ও 74) পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। মূলত অবাঙালি এবং ব্যবসায়ী অধ্যুষিত এই ওয়ার্ডগুলিতে বিজেপির প্রভাব ছিল স্পষ্ট। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরকে পাখির চোখ করেছেন মূলত এই ওয়ার্ডগুলোর ভরসাতেই।
এখন প্রশ্ন উঠছে, SIR রিপোর্টে যে 44 হাজার নাম নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে, ভৌগোলিকভাবে তাঁরা কি ওই পিছিয়ে পড়া ওয়ার্ডগুলোর বাসিন্দা, নাকি তৃণমূলের শক্তিশালী ঘাঁটি (বাকি 3টি ওয়ার্ড ও বস্তি এলাকা) থেকে এই নামগুলো উঠে এসেছে ? যদি দেখা যায়, তৃণমূলের শক্তিশালী ঘাঁটিগুলোতেই ‘ভেরিফিকেশন’-এর নামে বেশি কড়াকড়ি হচ্ছে, তবে 2026-এর লড়াই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য কঠিন হতে পারে ।
সবমিলিয়ে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, শুভেন্দু অধিকারীর হুঙ্কার, লোকসভায় 5 ওয়ার্ডে পিছিয়ে পড়া এবং এই 44 হাজার ‘অনিশ্চিত’ ভোটার—এই তিনে মিলে ভবানীপুরের সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে । শাসক দলের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হল, প্রশাসনিকস্তরে এই ভোটারদের তথ্য দ্রুত যাচাই করে তাঁদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, যাতে ‘নাম বাদ’-এর গেরোয় শাসকের ভোটবাক্সে ধস না-নামে।

