জাতীয় গানের সার্ধশতবর্ষ, বন্দে মাতরমে সুরের অদল-বদল
জাতীয় গানের সার্ধশতবর্ষ উদযাপনে প্রধানমন্ত্রী ৷ বন্দে মাতরমের অজানা ইতিহাস তুলে ধরনের ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি পলাশ মুখোপাধ্যায় ৷

Published : November 7, 2025 at 9:18 PM IST
চুঁচুড়া, 7 নভেম্বর: দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে 'বন্দে মাতরম'-এর সার্ধ শতবর্ষ । শুক্রবার জাতীয় গানের 150 বছর পূর্তি উপলক্ষে দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠান অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৷ 'বন্দে মাতরম' দেশের জনগণের চেতনা এবং ঐক্যের প্রতীক হিসেবে অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও। তবে এই বন্দে মাতরম নিয়ে নানা বিভ্রান্ত রয়েছে মানুষের মধ্যে।
সকলেই জানেন গানটি রচনা করেছিলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার বাসিন্দা। ইংরেজ আমলে বিভিন্ন জেলায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব সামলেছেন । সেইসঙ্গে 'সাহিত্যসম্রাট' উপাধি পেয়েছিলেন। 1875 সালে নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার এই বাড়িতেই বন্দে মাতরম গানটি লিখেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। দিনটি ছিল অক্ষয় নবমী। পরে 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে গানটিকে ব্যবহার করেন লেখক। 1881 সালে 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এই গানই হয়ে ওঠে স্বাধীনতার মন্ত্র। বঙ্কিমচন্দ্র রচিত উপন্যাসগুলির মধ্যে অন্যতম আনন্দমঠ ও বন্দে মাতরম স্তোত্রটি। সঠিক এই স্তোত্রটি কবে লেখা হয়েছিল সেটা নিয়েও অনেকের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
এদিন নয়াদিল্লিতে জাতীয় গানের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে বর্ষব্যাপী উদযাপন অনুষ্ঠানের সূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৷ এই উপলক্ষে একটি স্ট্যাম্প এবং মুদ্রার প্রকাশ করে তিনি বলেন, "ভারতের ঐক্যের প্রকৃত প্রতীক বন্দে ভারতম ৷ বহু প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে ৷ বন্দে মাতরমের 150 বছর উপলক্ষে আমাদের এই অনুষ্ঠান নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগাবে, ভারতবাসীকে নতুন ভাবে উদ্বুদ্ধ করবে ৷ বন্দে মাতরম' দেশের জনগণের চেতনা এবং ঐক্যের প্রতীক হিসেবে অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও।
গবেষকদের দাবি
নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার বঙ্কিম ভবন গবেষণা কেন্দ্রের গবেষকদের দাবি, 1874 সালে বন্দে মাতরম লেখা হয়েছিল। তবে ঋষি অরবিন্দর লেখা অনুযায়ী গানটি লেখা হয় 1875 সালে। পরে হুগলির ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন আনন্দমঠ রচনা করেন বঙ্কিম। সেখানেই বন্দে মাতরমকে সংযুক্ত করা হয়। তাঁর সঙ্গীত গুরু যদুনাথ ভট্টাচার্য প্রথম সুর দিয়েছিলেন এই গানের। একাধিক লেখা থেকে সেই তথ্য মিলেছে।

রবীন্দ্রনাথের সুরকেই প্রাধান্য দিয়েছেন সাহিত্যিক বঙ্কিম
চুঁচুড়ার কনকশালীর অক্ষয়চন্দ্র সরকার আনন্দমঠের পাণ্ডুলিপি দেখেছিলেন। তা নিয়ে বর্তমান চুঁচুড়ার বন্দে মাতরম ভবনে (তৎকালীন ভাড়া বাড়িতে) রীতিমতো আলোচনা বসত। সেইখানেই আসতেন চুঁচুড়ার আরেকজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষেত্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে বন্দে মাতরম গানের সুর দেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের সুরকেই প্রাধান্য দিয়েছেন সাহিত্যিক বঙ্কিম। তিনি আনন্দমঠের তৃতীয় সংস্করণে রবীন্দ্রনাথের স্বরলিপি প্রকাশ করেছেন।
বন্দে মাতরম উজ্জীবিত করেছিল সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের
গবেষকদের মতে, বন্দে মাতরম প্রথম প্রকাশ পায় আনন্দমঠের উপন্যাসেই। বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে 1881 সালে বিভিন্ন সংখ্যায় তা প্রকাশ করা হয়। পরবর্তী কালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হাওড়ায় ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন 1882 সালে কলকাতার জনশন প্রেসে প্রথম আনন্দমঠ বই হিসাবে প্রকাশ পায়। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন হুগলির উমাচরণ বন্দোপাধ্যায় ৷ লক্ষী নারায়ণ দাস ছিলেন মুদ্রণে । এরপর তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন সাহিত্যিক। তারপরই বন্দে মাতরম গান জনপ্রিয় হয়ে উঠে প্রতিটি বাঙালির মুখে মুখে। এই গানই উজ্জীবিত করেছিল সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের।

আঞ্চলিক ইতিহাসবিদ সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "বন্দে মাতরমকে স্লোগান করে স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্ম বলিদান দিয়েছেন। সেই বন্দে মাতরমের দেড়শো বছর উদযাপন করছে কেন্দ্রীয় সরকার। বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের ছোট ভাই পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বঙ্কিম জীবনীতে লিখে গিয়েছেন, 1876 সালে হুগলিতে বদলি হয়ে আসেন তিনি। তৎকালীন সময়ে এখান থেকে কাঁঠালপাড়ায় নৌকা পারাপার করে যাতায়াত করতেন। পরের বছর সপরিবার তিনি এখানে কাশেম মল্লিকের বাড়ি ভাড়া হিসাবে নেন।"
বন্দে মাতরমের সুর পরবর্তীতে অদল বদল করে স্বীকৃতি দেওয়া হয়
তিনি আরও বলেন, "এখানেই তিনি বিভিন্ন লেখালেখি নিয়ে ব্য়স্ত থাকতেন ৷ আনন্দমঠ রচনার মধ্যেই এই বন্দেমাতরম গান সংযোজিত হয়। 1882 খ্রিস্টাব্দে আনন্দমঠ প্রকাশিত হয় চুঁচুড়া থেকে। চুঁচুড়ার অক্ষয় চন্দ্র সরকার তিনি তাঁর লেখায় লিপিবদ্ধ করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেই আর একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন তিনি ক্ষেত্রনাথ মুখোপাধ্যায় ৷ তিনিই 'বন্দে মাতরম'কে সুর দেন। বন্দে মাতরমের সুর পরবর্তীতে অদল বদল করে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপরও বন্দে মাতরমে একাধিক সুরে দেওয়া হয়েছে ৷"
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই ক্ষোভ
কাঁঠালপাড়ার বঙ্কিম ভবন গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ডঃ রতন কুমার নন্দী বলেন, "আমরা মনে করি 1874 থেকে 75 সালের মধ্যে বন্দে মাতরম স্তোত্র'র রচনা করেছিলেন বঙ্কিম। বঙ্কিমচন্দ্রের দুই আত্মীয় শচীশচন্দ্র এবং পূর্ণচন্দ্র তাঁদের লেখা থেকে তা পাওয়া গিয়েছে। বঙ্গদর্শন পত্রিকার কিছু লেখা কম পড়েছিল ৷ তাই বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে বঙ্গদর্শন প্রেসের ম্যানেজার রামচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বাকি লেখা চেয়ে আবেদন করেছিলেন ৷ সংস্কৃত ও বাংলায় মেশানো লেখা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ক্ষুণ্ণ হন।"
বন্দে মাতরমের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন বঙ্কিম
তিনি সেইসময় বলেছিলেন 25 বছর পর এই গানের কী গুরুত্ব তা বুঝতে পারবে তোমরা। সেই সময় বঙ্গদর্শনে বন্দে মাতরম লেখাটি প্রকাশিত হয়নি। পরবর্তীকালে আনন্দমঠ উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে বন্দে মাতরম-এর প্রকাশ ঘটে। 1875 সালে বন্দে মাতরম লেখা হয়েছিল কি না, তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর দুই আত্মীয় ও ঋষি অরবিন্দের লেখা অনুসারে প্রমাণ হয় যে, 1874 ও 1875 সালের মধ্যেই এই উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল। আনন্দমঠ প্রথম ছাপা হয়েছিল কলকাতার জনশন প্রেসে 1882 সালের 15 ডিসেম্বর ।

